ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ৪ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৪ ঘণ্টা আগে
প্রবল বর্ষণে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় দেখা দিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বর্ষার শেষভাগে টানা ভারী বৃষ্টিতে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। ইতোমধ্যে কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসে অন্তত ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র আগামী শনিবার পর্যন্ত চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের ১৫ জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানান, টানা বৃষ্টির পাশাপাশি উজানের ঢলে দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এরই মধ্যে কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজার জেলার অন্তত ৩৫টি ইউনিয়ন পানিতে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে মোট ২৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
উত্তাল সাগরের কারণে টানা সাত দিন ধরে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে যাত্রীবাহী ট্রলারসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার-মহেশখালী ও পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথেও নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় হাজারো মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে।
বান্দরবানের লামা উপজেলায় পাঁচ দিনের টানা বর্ষণে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়ায় পাহাড়ধসে দুই পরিবারের পাঁচ সদস্য, যার মধ্যে শিশুও রয়েছে, নিহত হয়েছে। বন্যার পানিতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সাত উপজেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, জেলার সাতটি উপজেলাই কমবেশি বন্যাকবলিত। তিনটি স্থানে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং সেগুলো সচল করতে ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে।
অন্যদিকে রাঙামাটিতে টানা বর্ষণে জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৬০টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে এবং বহু বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য প্রাণহানি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত জেলার ৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ হাজার ১৬৬ জন আশ্রয় নিয়েছে।
শেরপুরেও দুই দিনের টানা বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে জেলার প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে চেল্লাখালী নদীর পানি বিপদসীমার ১১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নালিতাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং শেরপুর-নালিতাবাড়ী সড়কের কয়েকটি অংশ পানির তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার পাহাড়ি নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়ছে। উপজেলা প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত দেশের ছয়টি নদীর ১০টি স্টেশনে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সাঙ্গু নদীর বান্দরবান পয়েন্ট, কুশিয়ারা, মনু, ধলাই ও খোয়াই নদী। তিস্তার ডালিয়া পয়েন্ট, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর বিভিন্ন স্থানে পানি বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদ জানিয়েছেন, দেশের উত্তরাঞ্চলে শনিবার পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, উড়িষ্যা উপকূলের লঘুচাপটি পূর্ব দিকে সরে বর্তমানে মধ্যপ্রদেশ অঞ্চলে অবস্থান করায় রংপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও ঢাকাসহ উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বড় ধরনের দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা না থাকলেও সাময়িকভাবে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক পানি আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, এ ধরনের বন্যা বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় মানুষ স্বাভাবিক মৌসুমি বন্যার অভিজ্ঞতা কিছুটা ভুলে গেছে। তিনি বলেন, গত ১৫ দিন ধরেই আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছিল। মেঘালয়, আসাম ও ত্রিপুরায় ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিমিটার বৃষ্টির কারণে সীমান্তঘেঁষা রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তার মতে, আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দিয়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।