বিপিএল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৪৯ পিএম
‘মৃতেরা এ পৃথিবীতে ফেরে না কখনও।/ মৃতেরা কোথাও নেই; আছে?/কোনো কোনো অঘ্রানের পথে পায়চারি-করা শান্ত মানুষের/ হৃদয়ের পথে ছাড়া মৃতেরা কোথাও নেই বলে মনে হয়;’ (‘১৯৪৬-৪৭’, জীবনানন্দ দাশ)।
মহাভারতের পঞ্চ পাণ্ডবদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ভাই যুধিষ্ঠির, শকুনির সঙ্গে পাশাখেলায় বাজি রেখেছিলেন পরিজন, স্বভূমি, এমনকি নিজেকেও। কারণ ‘তিনি জানতেন কেউ কারও নয়, তিনি নিজেও তার নন।’ তাই হয়তো জীবনের প্রতিটি মাধুর্যমণ্ডিত মুহূর্তেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরম মমতায় মৃত্যুর অনিবার্য শূন্যতাকে উপলব্ধি করে ছিন্নপত্রাবলীতে লিখেছিলেনÑ‘ইচ্ছে করে জীবনের প্রত্যেক সূর্যোদয়কে সজ্ঞানভারে অভিবাদন করি এবং প্রত্যেক সূর্যাস্তকে পরিচিত বন্ধুর মতো বিদায় দিই।’ আর জীবনের এই মহত্ত্বকে ধারণ করেই কর্মবীরেরা যুগে যুগে কর্মচঞ্চলতার মাঝেই মৃত্যুকে স্বাগত জানাতে পারেন।
‘মাঠের মানুষ মাঠেই শেষ বিদায়’ শিরোনামে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত সংবাদটি হঠাৎই ছন্দপতন ঘটায়, সব ওলটপালট করে দেয়। এই আকস্মিক মৃত্যুর খবরটি আমাদের বিহ্বল করে, জমতে থাকে শোকবার্তা। চলে শোকের ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা। জানা যায়, সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গত শনিবার ম্যাচ শুরুর আগে গা গরমে বা ওয়ার্ম আপ করায় ব্যস্ত ছিলেন দুই দলের ক্রিকেটাররা। তখন হঠাৎ মাঠে পড়ে যান কোচ মাহবুল আলি জাকি। পরে আর তিনি উঠে দাঁড়ালেন না। মাঠে ও হাসপাতালে সবার প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে অভিজ্ঞ এই কোচ পাড়ি জমালেন পরপারে। বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের বিশেষজ্ঞ পেস বোলিং কোচ বিপিএলে কাজ করেছিলেন ঢাকা ক্যাপিটালসের সহকারী কোচ হিসেবে। তার বয়স হয়েছিল ৫৯।’ এভাবে একজন কর্মবীরের বিদায় হৃদয়কে বেদনায় ভারাক্রান্ত করে। মৃত্যু স্বাভাবিক হলেও এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া পরিবারের জন্য তো বটেই, অন্যদের পক্ষেও কঠিন। এই কষ্টের সমান বেদনা আমরা অনুভব করি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।
দেশের ক্রিকেটে মাহবুল আলি জাকি পরিচিত মুখ। বিশেষ করে পেস বোলিং কোচ হিসেবে নিজের আলাদা পরিচিতি তিনি গড়েছেন। তাসকিন আহমেদের অ্যাকশনের সমস্যা শোধরানো থেকে শুরু করে দেশের অনেক পেসারের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি নিবিড়ভাবে। দেশের অনেক পেসারের ‘মেন্টর’ ছিলেন তিনি। ২০২০ যুব বিশ্বকাপজয়ী দলেও তিনি ছিলেন সহকারী কোচ। খেলোয়াড়ী জীবনে তিনি ছিলেন পেসার। জাতীয় দলে খেলতে না পারলেও জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে খেলেছেন কুমিল্লা জেলার হয়ে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন আবাহনী, ধানমন্ডির মতো ক্লাবে। খেলা ছাড়ার পর তিনি নাম লেখান কোচিংয়ে। বিসিবির সঙ্গে তার সম্পর্কের শুরু ২০০৮ সালে হাই-পারফরম্যান্স কোচ হিসেবে। ক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন দেশের প্রধান পেস বোলিং কোচদের একজন।
পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কুরআনের সূরা আলে-ইমরানে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ এটি সর্বজনীন সত্য কোনো প্রাণীই মৃত্যু থেকে মুক্তি পাবে না, জীবনের অনিবার্যতাকে তুলে ধরে সবাইকেই একদিন ফিরে যেতে হবে। এই মৃত্যুর কোনো স্বাধীনতা নেই। আমাদের বেঁচে থাকা আর মৃত্যুর মধ্যে মৃত্যুই চরম দুর্জ্ঞেয়, রহস্যময়। এই রহস্যময়তার পাঠ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ থেকে বলি, ‘পৃথিবীতে যাহা আসে তাহাই যায়। এই প্রবাহেই জগতের স্বাস্থ্যরক্ষা হয়। কণামাত্রের যাতায়াত বন্ধ হইলে জগতের সামঞ্জস্য ভঙ্গ হয়। জীবন যেমন আসে জীবন তেমনি যায়। মৃত্যুও যেমন আসে মৃত্যুও তেমনি যায়। তাহাকে ধরিয়া রাখিবার চেষ্টা কর কেন?...ছাড়িয়া দাও, তাহাকে যাইতে দাও; জীবনমৃত্যুর প্রবাহ রোধ করিয়ো না। হৃদয়ের দুই দ্বারই সমান খুলিয়া রাখো। প্রবেশের দ্বার দিয়া সকলে প্রবেশ করুক, প্রস্থানের দ্বার দিয়া সকলে প্রস্থান করিবে।’
খেলার মাঠে আগেও এমন মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আমরা এসব ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে আরও সচেতন হতে বলি। মাহবুল আলি জাকি খেলার মাঠে বুকে ব্যথা নিয়ে পড়ে যাওয়ার পরই তাকে সিপিআর দেওয়া হয়েছে। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এজন্য কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ। অলঙ্ঘনীয় নিয়মের কাছে তিনি পরাজিত হয়েছেন। তবে আমরা প্রত্যাশা করি, প্রতিটি মাঠেই যেন প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকে। দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানোর সুব্যবস্থা থাকে। যেন অবহেলা, অব্যবস্থাপনায় কোনো দুঃসংবাদ আমাদের বহন করতে না হয়। কারণ অকালে জীবন ঝরে গেলে পরিবারে-সমাজে আপাত স্থিতির ভারসাম্য নড়ে যায়।