ভ্রমণ ডেস্ক
প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২২ ১৪:৩৬ পিএম
আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২২ ১৭:৪৯ পিএম
ফিলিস্তিন ভ্রমণে লাল-সবুজ পতাকা হাতে নাজমুন নাহার
ফিলিস্তিন ভ্রমণে নাজমুন নাহার
বাংলাদেশি পাসপোর্টে ১৫৭তম দেশ ভ্রমণ করার মাইলফলক অর্জন করেছেন নাজমুন নাহার। এবার তিনি কঠিন সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছে গেছেন ফিলিস্তিনে।
নিজের ফেসবুক আইডিতে ফিলিস্তিন ভ্রমণ নিয়ে গত রবিবার একটি পোস্ট করেন। ফিলিস্তিন ভ্রমণের বিস্তারিত জানিয়ে সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, জেরুজালেমের আকাশে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। আমি দামাস্কাস গেট থেকে বাসে চড়ে রওনা হলাম ফিলিস্তিনের রামাল্লা শহরের উদ্দেশে। বাসস্টেশনে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে পরিচয় হলো। তারা জেরুজালেম এবং ফিলিস্তিনের সঙ্গে যে সেপারেশন ওয়াল রয়েছে, তার ওপারের শহরগুলোতে বসবাস করে, কিন্তু প্রতিদিনই এই বর্ডার সিকিউরিটি পোস্ট ক্রস করে জেরুজালেমে স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসে। কী নিদারুণ! তাদের প্রত্যেকেরই আইডি কার্ড শো করতে হয় সিকিউরিটি পোস্টে ইসরাইলি সেনাদের সামনে। যাই হোক, ২০ মিনিট ড্রাইভ করার পরই বাস এসে পৌঁছালো সিকিউরিটি কন্ট্রোল এরিয়াতে।
জেরুজালেম বর্ডার কন্ট্রোল থেকেই শুরু হয়েছে বিশাল বড় সেপারেশন ওয়াল, অনেক উচ্চতাসম্পন্ন বেথলেহেম শহর এবং জেরুজালেমের মধ্যেই অনেক অংশজুড়ে দেখতে পেলাম এই ওয়াল। আমি বর্ডার সিকিউরিটি ক্রস করলাম সোলজারদেরকে নানা ধরনের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে। যাই হোক ফিলিস্তিনিদের জন্য জীবন মানে কতটা যুদ্ধ তা আমি এখান থেকেই টের পেলাম। অবশেষে বাসটি যখন পাহাড়ের উঁচু-নিচু বাঁক বেয়ে রওনা হলো রামাল্লার উদ্দেশে, আমি তখন জানালা খুলে নিঃশ্বাস নিতে থাকলাম।

নতুন এক বিস্ময় আমার দু'চোখজুড়ে। একদম সাহস করে আমি রওনা দিলাম। তবে ওপারের অনেক ট্যুরিস্ট বেশ হিসাব-নিকাশ কষে চিন্তাভাবনা করে তারপর রওনা হয়। আমার পাশের সিটেই বসলেন সীমান্তবর্তী শহরের এক কলেজ টিচার। পরিচয়ের প্রথমে উনি তার কষ্টের কথাগুলো বলতে থাকলেন। শহরগুলো যেন অভিভাবকহীনভাবে পড়ে আছে। দেখভাল করার মতো কেউ নেই। তারপর আবার আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকলাম দূরের পাহাড়ের দিকে। কোথাও ক্ষতবিক্ষত পাহাড়গুলো যেন বহন করছে বোমা-বারুদের ক্ষত। কিছু কিছু পাহাড় এতই অপূর্ব, উঁচু-নিচু রাস্তাগুলোর মাঝে যেন এক ঐশ্বরিক লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। দেশটির মধ্যে একটু ভিন্নরকম সৌন্দর্য বহমান। প্রায় আড়াই ঘণ্টা বাস জার্নি শেষে ডেড সি‘র পাশের রাস্তা ঘেঁষেই এক সময় আমি রামাল্লা শহরে পৌঁছলাম।
জেরুজালেম হোস্টেল থেকে আমার সঙ্গে ভ্রমণসঙ্গী হয়েছিলেন ফ্রান্সের নেলী, যিনি ৩৫ বছর ফ্রেঞ্চ আর্মিতে কাজ করেছিলেন, এখন তিনি পৃথিবী ঘুরে বেড়ান। যেহেতু এখানে প্রায়ই গোলাগুলি, বোমা ও নানা ধরনের অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে থাকে হঠাৎ করেই, তারপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের আসতে হলো এখানে। তাই নেলী আমার সঙ্গে যুক্ত হলো ফিলিস্তিনের রামাল্লা শহর ভ্রমণ করার জন্য।
আমি আর নেলী বাস থেকে নেমেই হাঁটতে শুরু করলাম হোস্টেলের দিকে। যেতে যেতে পথে কী অপূর্ব দেওয়াল চিত্রগুলো যেন এখানকার মানুষের জীবনের কথা বলে দিচ্ছে। কোথাও দেওয়াল চিত্রে লেখা রয়েছে—মেক হুমাস, নট ওয়াল। কোথাও সাংবাদিক শিরিনের প্রতিচ্ছবি চিত্র কিংবা আবু আকলে দেয়ালজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে। আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে তুলতে হোস্টেল পর্যন্ত পৌঁছলাম। কোনোরকমে ব্যাকপ্যাক হোস্টেলে রেখেই আমরা আবার রওনা দিলাম বিকালে ইয়াসির আরাফাত স্কয়ারের উদ্দেশে। মোটামুটি বেশ কয়েকটা স্থান আমরা ঘুরে ফেললাম এরই মধ্যে।
পথে পথে অনেক ফিলিস্তিনির সঙ্গে কথা হলো। ফিলিস্তিনের মানুষগুলো ভালো। অনেক আন্তরিক। ট্যুরিস্টদের প্রতি তাদের বেশ আগ্রহ। রাস্তায় দেখা হলেই কথা বলে—কোথা থেকে এসেছো! ওয়েলকাম! ওয়েলকাম! ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কিছু। কষ্টের মাঝেও তারা হাসতে পারে ট্যুরিস্টদেরকে দেখলে। ইয়াসির স্কয়ার থেকে লায়ন স্কয়ারের দিকে আমরা আসতে থাকলাম। তারপর রামাল্লা সিটির ফাউন্ডার রাশিদ হাদাডিন ফ্যামিলি স্কয়ারে গেলাম। সেখানে উড়তে থাকলো ফিলিস্তিনের লাল-সবুজ-সাদা-কালো রঙের পতাকাটি। আমি সেখানে উড়িয়ে দিলাম বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। পুরোটা রামাল্লা শহরে আর্ট এবং কালচার বিস্তৃত রয়েছে এক মাথা থেকে অন্য মাথা পর্যন্ত। প্রতিটি দেওয়াল চিত্র যেন তাদের সংগ্রামী জীবনের কথা বলছে। তাদের স্বরচিত ভূমিকে পরিপূর্ণভাবে ফিরে পাওয়ার কথা বলছে।
রাস্তার আশপাশে তাকালে দেখা যায় সুনির্মিত পাথরের ঘর উঁচু পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে, পশ্চিমে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত এই শহরটি। আশপাশের জলপাই বাগান। পূর্বদিকে একটি কূপ আছে। কোথাও মসজিদ কোথাও গির্জা দেখা যায় রাস্তার পাশে। রামাল্লা মধ্যপশ্চিম তীরের একটি ফিলিস্তিনি শহর। এটি জেরুজালেমের ১০ কি.মি. উত্তরে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৮৬১ ফুট উচ্চতায় আল-বিরেহ সংলগ্ন জুডান পর্বতমালায় অবস্থিত। রামাল্লা শহরে তখন সন্ধ্যার আজান পড়েছে। আমি আর নেলী হাঁটতে হাঁটতে একটি রেস্টুরেন্ট খুঁজে পেলাম। যেখানে ফিলিস্তিনের ট্র্যাডিশনাল খাবার ‘মাখলুবেহ’ (ফিলিস্তিনি রাইস এন্ড গ্ল্যান্ড কাসেরোল)—খুবই সুস্বাদু মুখরোচক খাবারটি খেলাম। পৃথিবীতে যত মজার খাবার খেয়েছি তার মধ্যে এটি অন্যতম। পরেরদিন খুব ভোরে আমি রওনা হলাম রামাল্লা থেকে বেথেলহেমের সফরের উদ্দেশে।