× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গন্তব্য অন্নপূর্ণা বেজ ক্যাম্প

আহসান রনি

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২২ ১৯:০১ পিএম

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২২ ১৯:০৩ পিএম

অন্নপূর্ণা বেজ ক্যাম্প

অন্নপূর্ণা বেজ ক্যাম্প

পৃথিবীর সকল পাহাড়প্রেমীদের কাছে পছন্দের ভ্রমণ তালিকায় সবার উপরে থাকে নেপাল । আর নেপালে যারা ট্রেকিং করতে যান তাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্রেকিং ডেস্টিনেশনের একটি অন্নপূর্ণা বেজ ক্যাম্প। একদম কাছ থেকে হিমালয় রেঞ্জের সবচেয়ে বড় পাহাড়গুলোর দেখা তো এখান থেকেই মিলবে! অন্নপূর্ণা ট্রেকিংয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রস্তুতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমি আগে ট্রেকিং করলেও সেই ট্রেকিংয়ের প্রস্তুতি আর সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১৩৫৫০ ফুট উপরে এবিসি'তে যাওয়ার প্রস্তুতি একদমই আলাদা। পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ও টিমের সহায়তা পেতে তাই ট্রেকিং গ্রুপ 'অলটিচিউড হান্টার'-এর সাথে যুক্ত হলাম। টিমের কাউকে আগে থেকে চিনি না; কিন্তু সবাই যেহেতু পাহাড় প্রেমী তাই এই টিমের সবার সাথে যে দারুণ সময় কাটবে তা আগে থেকেই আঁচ করে নিয়েছিলাম। 

টিম লিডার শামীম ভাইয়ের কাছ থেকে প্রস্তুতির নানা গাইডলাইন নিয়ে টিমের একটু আগেই পৌঁছে গেলাম নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডুতে। নাগারকোট, চন্দ্রগিরি, তিনটি দরবার স্কয়ারসহ কাঠমুন্ডুর আশেপাশে নানা স্থানে ঘোরার পাশাপাশি থামেল থেকে ট্রেকিংয়ের নানা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিলাম। তৃতীয়বারের মতো নেপালে, তাই নিজের পছন্দমতো ঘুরতে ও বাসে পোখারা পৌঁছাতে তেমন কোন সমস্যা হয়নি। পোখারাতে গিয়ে ফাওয়া লেকের স্নিগ্ধ সৌন্দর্য উপভোগ করলাম আর দিনের বাকি অংশ এবিসি ট্রেকিংয়ের জন্য আরও কিছু কেনাকাটা।

রাতের মধ্যেই টিমের বাকিরা চলে এলো। সকালে নাস্তায় সবার সাথে পরিচিত হয়ে নিলাম। সেদিন আমাদের গন্তব্য গান্দ্রুক, তবে তার আগে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড থেকে অনুপতিপত্র নিয়ে নিলাম। শহর থেকে গান্দ্রুকে যাওয়ার অর্ধেক পথের রাস্তা অনেক সুন্দর হলেও বাকি পথ যেন রোলারকোস্টার। পাহাড়ি এই দূর্গম রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম এবং আরও বেশি এক্সাইটেড ছিলাম সামনের কয়েকদিনের অসাধারণ সব অভিজ্ঞতার জন্য। গাড়ি গিয়ে যেখানে থামলো সেই স্থানটিকে বলতে হবে ছবির মতো। পাহাড়ের উপর সারি সারি বাড়ি দিয়ে তৈরী গোছানো দারুণ একটি গ্রাম এবং আরও দারুণ ব্যাপার হচ্ছে এখান থেকে মাচুপুছারে, অন্নপূর্ণা সাউথসহ অনেকগুলো পাহাড়ের সারি দূর থেকে দেখতে পাওয়া যায়। নতুন এলাকা, নতুন পরিবেশ বা দিনে গরম-রাতে ঠান্ডা আবহাওয়া কোনটিই যেন বাঁধা নয়; বরং নতুন অভিজ্ঞতা সংগ্রহের এক্সাইটমেন্ট তখন মনে। টিমের সকলের সাথে গাড়িতে ও সন্ধার আড্ডা দারুণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরী হয়ে গেলো। গাইড রবিনের কাছ থেকে পরের দিনের প্ল্যান শুনেও কেউ যেন রুমে ঘুমাতে যেতে চায় না। ক্যাম্পফায়ারের পাশে বসে সবাই তখন আড্ডাতে মসগুল।

১ম দিনের ট্রেকিং সবসময় অনেক বেশি এক্সাইটমেন্টের হয়। সকালে উঠে নেপালি নাস্তা করে রওয়ানা দিলাম চমরংয়ের উদ্দেশ্যে। পাহাড়ি রাস্তা, সাসপেনশন ব্রীজ, অগণিত সিড়ি দিয়ে উঠা নামা করতে করতে এগিয়ে চললাম। টিমের তুষার ভাই ও বোরহান ভাইয়ের সাথে দারুণ খাতির হয়ে গেলো। আড্ডা দিতে দিতে আর আশেপাশের মুগ্ধ করা পাহাড়ের সারি দেখতে দেখতে সামনের দিকে এগোলাম। প্রথম দিন বিধায় প্রচুর কষ্টও হচ্ছিলো; তবে কিছুক্ষণ পর পর টি-হাউজ (রেস্টুরেন্ট ও হোটেল) আছে; ফলে কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর ক্লান্ত হয়ে গেলে রেস্ট নেওয়ার সুযোগ আছে। টি-হাউজের সব ধরনের খাবার, পানীয় পাওয়া যায়; ফলে রেস্ট নেওয়ার সময় পানি সংগ্রহ করে নিচ্ছিলাম; মাঝে মাঝে চা-কফিও। টিমের কেউ একটু স্লো আবার কেউ ফাস্ট; কিন্তু দিনশেষে দেখা গেলো আমরা সবাই ১০-১৫ মিনিটের ব্যবধানে চমরং পৌঁছে গেলাম। দীর্ঘ ট্রেকিং শেষে ক্লান্তি, হাঁটু ব্যাথা আর ক্ষ ুধা নিয়ে যখন চমরংয়ের টি-হাউজে পৌঁছালাম; তখন দূরের পাহাড়গুলো দেখে মুগ্ধতায় সব কষ্ট যেন ভুলে গেলাম। মুগ্ধ হয়ে ছবি তুলছিলাম; কিন্তু চোখ দিয়ে দেখা সৌন্দর্যের সাথে সেই ছবির কোন তুলনা চলে না। কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে, খাবার খেয়ে, পেইন কিলার খেয়ে যখন বারান্দায় বসলাম সেখান থেকে আর উঠতেই ইচ্ছা করছিলো না, পাহাড়ি সৌন্দর্য যেন পা দুটোকে অকেজো করে দিয়েছিলো!

চমরং থেকেও পরের দিন সকাল সকাল বের হয়ে পড়লাম টিমের সবার সাথে। হাঁটুতে শুরুতে হালকা ব্যাথা থাকলেও কিছুক্ষণ হাঁটার পর ব্যাথা উধাও। প্রথম দিনের চেয়ে এদিনের ট্রেকিং অনেক আনন্দময় ছিলো; কারণ টানা ট্রেকিংয়ের ফলে শরীর চ্যালেঞ্জের সাথে মানিয়ে নিতে শুরু করেছে। পাহাড়ি সিঁড়ি দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে টিমের অনেকের সাথে নানাভাবে আড্ডা, খুনসুটি, জানাশোনা বাড়তে থাকলো। কেউ কেউ তো দুইদিনেই বন্ধু হয়ে গেলো। টিমের সকলেই একে অপরকে নানাভাবে সহায়তা করার ফলে যাত্রা আরও সহজ হয়ে গিয়েছে সবার জন্য। দিনের শেষে যখন দোভানে পৌঁছালাম তখন ফোন নেটওয়ার্ক নেই; দুদিনের গরম পরিবেশকে ছাঁপিয়ে পরিবেশ অনেকটাই ঠান্ডা হতে শুরু করেছে; পানিও প্রায় বরফের মতো ঠান্ডা। নতুন আবহাওয়াতে পাশেই বয়ে চলা ঝর্ণার পানির শব্দ দারুণভাবে মুগ্ধ করে রাখলো সবাইকে। 

আগের তিনদিনের যাত্রা আর পরের দিনের যাত্রা সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ এদিন ২৩৪০ মিটার উচ্চতা থেকে যাত্রা শুরু করে ৩৭০০ মিটারে গিয়ে মাছুপুছারে বেজ ক্যাম্প (এমবিসি) পৌঁছাতে হবে এবং সেখানে রাত কাটাতে হবে। যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরেই অপরুপ এক ভ্যালির দেখা পেলাম। দুপাশেই রয়েছে একের পর এক পাহাড়ের সারি; যেন পাহাড়গুলোকে পাশাপাশি সাজিয়ে রাখা হয়েছে! মাঝের ভ্যালি দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট্ট পানির ধারা, আশেপাশে তুলার মতো ছড়িয়ে রয়েছে বরফ। আরও কিছু সামনে এগোতেই পুরোপুরি বরফের মধ্যে ঢুকে গেলাম আমরা। চারিপাশ যেন বরফ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। বরফের পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে, পিচ্ছিল ও শাক্ত বরফের উপর দিয়ে সাবধানে এগিয়ে যেতে থাকলাম। রাস্তার মাঝেই একটি জায়গায় কয়েকজন তো বরফের মধ্যে ডুবে গেলো, অন্যরা সবাই মিলে তাদেরকে বরফের মধ্য থেকে তোলা হলো এবং আবার সকলে সামনে এগিয়ে গেলো। সন্ধার ঠিক আগে পৌঁছালাম এমবিসিতে; ফিশটেল টি হাউজে যখন পৌঁছালাম তখন পাহাড়ে হালকা অন্ধকার নামতে শুরু করেছে; আর দূর থেকে হালকা চাঁদের আলোার দেখাও মিলছে। চারপাশের বিশাল বিশাল পাহাড়গুলো থেকে শুরু করে প্রতি কোণা সাদা বরফের চাদর মুড়ি দিয়ে আছে। আর রাতে চাঁদের আলোতে বিশাল বিশাল পাহাড়গুলোকে যেন এক একটি দৈত্যের মতো লাগছিলো। কিন্তু অপরুপ যে সৌন্দর্য ও আবহ তৈরী হয়েছিলো তা এই রাতটিকে জীবনের একটি স্বরণীয় রাত বানিয়ে দিয়েছে।

এমবিসি-তে রাত কাটিয়ে পরের দিন ভোর ৪টার দিকে আমরা এবিসির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম, উদ্দেশ্য এবিসিতে গিয়ে সূর্যোদয় দেখা। অন্ধকার রাতে পাহাড়ের ভয়ঙ্কর রাস্তা ধরে এগিয়ে যাওয়ার অ্যাডভেঞ্চারও এই ট্রেকিংয়ের একটি স্বরণীয় ঘটনা। ভোর হয়ে হালকা আলোতে দূর থেকে যখন একদম কাছ থেকে হিমালয়ের সারিতে ৭-৮টি পাহাড় দেখতে পাচ্ছিলাম তখন শরীরে এক আলাদা অনুভূতি অনুভব করেছি; আর চোখ যেন প্রকৃতির এই অপরুপ সৌন্দর্য প্রকাশের কোন ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলো না। যখন মাচুপুছারের পাহাড়ের উপর দিয়ে সূর্যের আলো এসে বিশাল বিশাল পাহাড়ের উপর এবং ভ্যালিতে সাদা বরফের উপর পড়ে চকচক করছিলো তখন নিজেকে সৌভাগ্যবান একজন মনে হচ্ছিলো। অন্নপূর্ণা বেজ ক্যাম্পে পৌঁছে শুরুতেই সাইনবোর্ডের সামনে ফটোশ্যুট করলাম সবাই। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ট্রাভেলারদের সাথেও নানারকম কথা হলো, তাদের কয়েকজনের সাথে আড্ডাও দেওয়া হলো। এবিসি'র একটি টি হাউজে সকালের নাস্তা করে নিলাম। আশেপাশে ঘুরে চারপাশে একই সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা অন্নপূর্ণা সাউথ, হিনচুলি, অন্নপূর্ণা-১, গঙ্গাপূর্ণা, অন্নপূর্ণা-৩, মাচুপুছুরে বা ফিশটেইল অর্থাৎ সারা পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু কয়েকটি পাহাড়ের দেখা পাওয়া যায়। এরমধ্যে সবচেয়ে উঁচু ৮০৯১ মিটারের অন্নপূর্ণা-১। হিমালয়ের এই পাহাড়ের সারির সৌন্দর্যকে লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করা সত্যিই সম্ভব নয়!

অন্নপূর্ণা বেজ ক্যাম্প বা এবিসি'র ৪১৩০ মিটারে গিয়ে হিমালয়কে এতো কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা যেকোন পাহাড়প্রেমীর জন্য অবশ্য গন্তব্য বলে আমার মনে হয়েছে। সত্যিই যদি পাহাড় ভালোবাসেন তাহলে আর দেরি না করে টাকা জমানো শুরু করুন এবং দ্রুতই প্ল্যান করে ঘুরে আসুন এবং নিজের জীবনের সেরা কয়েকটি দিন কাটিয়ে আসুন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা