মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৬:৩০ পিএম
আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৬:৫২ পিএম
দেখার চোখ থাকলে সবই সুন্দর। প্রকৃতির রূপ-লাবণ্যের নির্যাস পেতে হলে চাই অন্তর্দৃষ্টি। কবিগুরু এজন্যই লিখেছিলেন--দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশিরবিন্দু। কবিতার কথাগুলো আমাদের দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুদের জীবনে পুরোটাই যেন সত্যি হলো এবার। বহুবার গিয়েছি নিছক আড্ডা জমাতে সাভার নামাবাজার নতুন ব্রিজ পার হয়ে ফোর্ডনগরে। অথচ খড়ারচর, ফরিঙ্গা থেকে আরেকটু এগিয়ে কাংশা যাওয়া হয়নি। সংগঠনের উদ্যোগে খড়ারচর যাওয়ার সুযোগ আসে। দে-ছুটের অ্যাডমিন লেভেলের বন্ধুরা বেশ কয়েকটি মোটরবাইকে সাতসকালেই ছুটে যাই খড়ারচর গ্রামে।
সাভারের পাশে হলেও এলাকাটি ধামরাই উপজেলায়। মায়াবী পথে ঘুরতে ঘুরতে চলে যাই মানিকগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত ধলেশ্বরী নদীর তীরের গ্রাম কাংশা। আশ্চর্য হই ঢাকার এত পাশে অথচ এখনও রয়েছে খাঁটি গ্রাম বাংলার রূপ। কাংশার প্রকৃতি দেখলে বিশ্বাসই হবে না, এখানকার দূরত্ব কোলাহলের শহর ঢাকার জিরো পয়েন্ট হতে আনুমানিক প্রায় ৩৭ কিলোমিটার মাত্র। চারপাশটা নয়নাভিরাম প্রকৃতি দিয়ে ঘেরা। নেই কোনো কোলাহল।
কাংশা ব্রিজের ওপর থেকে শান্ত ধলেশ্বরীর রূপ দেখি। একটা সময় আর লোভ সামলাতে না পেরে ঝাঁপিয়ে পড়ি নদীর বুকে। চলে ইচ্ছেমতো জলকেলি। পানির নিচের কাদা দিয়ে সারা শরীর মেখে, হারিয়ে যাই শৈশবের স্মৃতিতে। নদীর পারে বসে থেকে মাঝবয়সীদের এরকম ছেলেমিপনা উপভোগ করে আরেক মাঝবয়সী স্থানীয় মাজের আলী।
দুপুরের খাবারের জন্য চলে যাই খড়ারচর মাদ্রাসার বালাখানায়। বেশ আয়েশ করেই উদরপূর্তি চলে। খাওয়াদাওয়া শেষে যাই ফড়িঙ্গা গ্রামে। বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠের মাঝে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে এক পুরনো বটবৃক্ষ। খানিকটা সময় চলে সেখানে আড্ডা। এবার গন্তব্য বংশী নদীর তীরে কাজিয়ালকুন্ডু গ্রামে। যার বুক চিরে নতুন করা ইট, সুরকি বিছানো সড়ক চলে গেছে আরিচা মহাসড়কের ঢুলিভিটার দিকে। পথের দুপাশে সৃজন করা হয়েছে বনায়ন। বেশ চমৎকার পরিবেশ। সড়কের পাশেই বিশাল বিল। জেলেরা আপন মনে মাছ ধরে। সেইসব মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে দেখতেই ছুটি চৌঠাইল গ্রামের দিকে।

পড়ন্ত বিকালে গ্রামের পিচঢালা সরু পথে, মোটরবাইকে চড়ে বেড়ানোর মজাই আলাদা। বাইকার আর সাইক্লিস্টদের রাইডের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় একটা জায়গা এই পথ। অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাই চৌঠাইল। এপাশটায় ধলেশ্বরী সরুখালের রূপ ধারণ করে আছে। সম্ভবত নদীখেকোদের শকুনি দৃষ্টি পড়েছে। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখনও অসাধারণ। সবুজ ফসলের ক্ষেত, বাঁশবাগানে নানান পাখির কিচিরমিচির,দিগন্তজোড়া সরষেক্ষেত। যতদূর চোখ যায় শুধু হলদে রাঙা ফুল। গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোর অনুসন্ধানী জিজ্ঞাসা। ঘুরে ঘুরে সব মিলিয়ে ভ্রমণের নির্যাস নিতে নিতে একসময় দেখি, তেজোদীপ্ত লাল সূর্যটা সেদিনের জন্য নানান রঙের আভার ছটা ছড়িয়ে পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। দেরি না করে জসিম ও হানিফ ধলেশ্বরীর তীরে তাঁবু টানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
জোছনার আলোয় আনমনে বিড়বিড় করে গেয়ে উঠি, আমি একবার দেখি/বারবার দেখি/দেখি বাংলার মুখ। সত্যিই বাংলার রূপ-লাবণ্য দেখার জন্য দূরে কোথাও নয়, সাভারের পাশে নামাবাজার ব্রিজ পার হয়ে ধামরাই উপজেলার রূপনগর, খড়ারচর, ফড়িঙ্গা এবং সিঙ্গাইর উপজেলার কাংশা ব্রিজ পর্যন্ত গেলেই হবে। নামাবাজার/ফোর্ডনগর ব্রিজের ওপর থেকে দেখা বংশী নদীটার সৌন্দর্যও বিমোহিত করার মতো।
প্রবা/জিকে/এমজে