মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২২ ১০:০৭ এএম
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২২ ১২:১৯ পিএম
ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ
পরের দিন শুক্রবার মানেই বৃহস্পতিবার রাতের ঘুম হারাম। রাতভর এপাশ-ওপাশ করতে করতেই ভোর ৪টা থেকে সাড়ে ৪টা। এর মধ্যেই দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের পাগলু জসিম/হানিফের ফোন চলে আসে। আর ওমনি বিছানা ছেড়ে, শুরু হয় বের হওয়ার কসরত। ঠিক তেমনি এক শুক্রবার মোটরবাইকে নবনির্মিত সিংগাইর সড়ক ধরে মিতরা, ঝিটকা পেরিয়ে হরিরামপুর উপজেলার আন্ধারমানিক নৌঘাট। ও হ্যাঁ, নতুন সড়কের বর্ণনা না দিলেই নয়। ধল্লা ব্রিজ পার হওয়র পর থেকেই দুচোখ আটকে যাবে পথের দুধারের নৈসর্গিক সব প্রাকৃতিক দৃশ্যে। আনমনেই হয়তো গেয়ে উঠবেন, পিচঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি।
মানিকগঞ্জ যাওয়ার নতুন সড়কটিতে, এখনো ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল তেমন চোখে পড়েনি। যে কারণে মোটরবাইকে ইচ্ছেমতো গতিতে রাইড দেওয়া যায়। ঘাটে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে, যাত্রীবাহী ট্রলার ছাড়ার সময় হলো। চা দোকানিকে অনুরোধ করে,তার দোকানের পাশেই বাইক রেখে-ট্রলারে চড়ি। ঢেউ তোলা আষাঢ়ের প্রমত্তা পদ্মা নদী। ঝলমলে তপ্ত রোদে ছাউনিবিহীন ট্রলার। কিছুক্ষণ চলার পরেই, আকাশে কালোমেঘের ঘনঘটা। হঠাৎ তুফান উঠলে কী হতে পারে, সেদিকে খেয়াল নেই কারও। বরং রোদের ঝাঁঝ কমে যাওয়ায় মহাখুশি সবাই। আসলে পাহাড়-সমুদ্রে অ্যাডভেঞ্জার করা দে-ছুট এর দামালেরা,পদ্মাকে গোনাতেই ধরলা না। প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা পর ট্রলার ভিড়ল লেছড়াগঞ্জ ঘাটে। যাত্রী দেখে ভাড়ায় খাটা বাইকারদের হাঁকডাক। কিন্তু আমাদের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।
আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। সবুজে ঘেরা মেঠো পথ। খানিকটা দূরেই একজনের নেটের মতো ব্যাগে কিছু একটা দেখতে পেয়ে তাকে থামালাম। ব্যাগ খুলেই দেখি সাপের মতো কিছু একটা। প্রবল উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই বলল, এটা বাউস মাছ। সর্প আকৃতির বিশাল মাছটি হাতে নিয়ে, ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিতেই প্রচুর লাইক-কমেন্ট। বিভিন্ন জনের নানা মন্তব্যের মাধ্যমেই জানা গেল, এর সঠিক নাম-বামবুউইশ। সচারচর ধারা পড়ে না। খেতেও নাকি দারুণ স্বাদ। মাছ নিয়ে ফটোশুট শেষে, গ্রামের দিকে এগোতে থাকি। এবার চোখে পড়ল ভুট্টা ক্ষেতের দৃশ্য। কৃষক-কৃষাণী সমানতালে গাছ থেকে ছিঁড়ে ভুট্টা জমা করছে। তাদের সঙ্গে আমরাও যোগ দিয়ে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা অর্জন করি। ভ্রমণ মানেই হলো বিনোদনের পাশাপাশি যাপিত জীবনের শিক্ষা। এরপর লেছড়াগঞ্জ চরের পাটগ্রামের দিকে আগাতে থাকি। যেতে যেতে বাজার পেরিয়ে আরেক নদীর ধারে। নদীর তীর, আশপাশ পরিবেশ আর সচ্ছ পানি দেখে সেখানেই বসে পড়লাম। মানিকগঞ্জ নিবাসী বন্ধু মেহেদিকে ফোন দিয়ে নদীর নাম জিজ্ঞেস করতেই জানাল ইছামতী। যে যার মতো দ্রুত হ্যামোক টানিয়ে, পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। আহ সেই মজা। যেন ফিরে গিয়েছিলাম সেই শৈশবের টলটলে বুড়িগঙ্গা নদীর জলে। ডুব সাঁতার, উল্টো সাঁতারসহ ইচ্ছেমতো ইছামতীর পানিতে দাপাদাপি করে ছুটি জুমা আদায়ে। নামাজ শেষে হেঁটে ও ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের গ্রামগুলো ঘুরে ঘুরে দেখি। চড়জুড়ে ভুট্টার বাম্পার ফলন। প্রচুর গাছগাছালিতে নানান পাখির কলতান। তাল গাছগুলোতে সারিসারি বাবুই পাখির বাসা। এত বাসা সাধারণত আজকাল কোথাও তেমন চোখে পড়ে না। চরের বাসিন্দারাও বেশ বন্ধুবৎসল। রয়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্পেরও বসতঘর।
সাধারণ বর্ষায় লেছড়াগঞ্জর জমিতে পানি থাকে ছুঁইছুঁই। কিন্তু বন্যা হলে চরের বাসিন্দাদের সরে যেতে হয়। নির্ভুল তথ্যের জন্য দায়িত্বশীল কাউকে না পাবার কারণে, চরের আয়তন ও জনসংখ্যা সম্পর্কে জানা হয়নি। যেটুকুন জেনেছি তা হলো, প্রতি বছরই পদ্মায় লেছড়াগঞ্জর চর একপাশে বিলীন হয়। আবার আরেকপাশে জমি জেগে ওঠায় সঠিক আয়তন রেকর্ড করা যায় না। এ কূল ভাঙে-ও কূল গড়ে, এইতো নদীর খেলা। নদীভাঙন এলাকার মানুষের মুখে মুখে এই কষ্টের বুলি যুগযুগান্তর ধরে চলে আসছে। বিদ্যুৎবিহীন নিঝুম চরাঞ্চলের নয়নাভিরাম নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে দেখতে বেলা গড়াল অনেক। তাই আর দেরি না করে, নাড়ির টানে ফিরতি ট্রলার ধরি।
যেভাবে যাবেন : মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ যাওয়ার জন্য মোটরবাইক। ঢাকা থেকে সাভারের হেমায়েতপুর হয়ে সিংগাইর-ঝিটকা সড়কে হরিরামপুরের আন্ধারমানিক বাজার। সেখান থেকে প্রতি ঘণ্টায় ট্রলার ছেড়ে যায় লেছড়াগঞ্জ ঘাট। সেখান হতে মোটরবাইকে/ঘোড়ার গাড়িতে পাটগ্রাম। তবে হেঁটে যাওয়ার আনন্দ ভ্রমণে ভিন্ন মাত্রা যোগ হবে। এ ছাড়া গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাস মানিকগঞ্জ রুটে চলাচল করে থাকে।
খাবার : লেছড়াগঞ্জ মানিকগঞ্জ জেলার অন্তর্গত হলেও, জায়গাটা দুর্গম চরাঞ্চল। সুতরাং শুকনো খাবার সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।
বাস ও ট্রলার ভাড়া : যেকোনো বাহনে চড়ার আগেই ভাড়া নির্ধারণ করে নিতে হবে।
সতর্কতা : প্রমত্তা পদ্মা নদী পারি দিতে হয়। তাই অবশ্যই লাইফজ্যাকেটসহ নিজ নিজ নিরাপত্তার বিষয়টা প্রথমেই মাথায় রাখুন।
খোঁজখবর : লেছড়াগঞ্জ-পাটগ্রাম সব মৌসুমেই তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ডালি মেলে ধরে। তাই ভ্রমণ পরিকল্পণার আগে নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে যাচাই করে নিন।
প্রবা/জিকে /এসআর