ভ্রমণ ডেস্ক
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৩ ১৭:১৩ পিএম
আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৩ ১৭:৪৪ পিএম
দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে ভ্রমণে নাজমুন নাহার
১৫৯তম দেশ ভ্রমণ করার মাইলফলক অর্জন করেছেন নাজমুন নাহার। এবার তিনি ভ্রমণ করেছেন দুর্গম রহস্যময় দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে। নিজের ফেসবুক আইডিতে দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে নিয়ে এক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন,
কেপ ভার্দে নামক দেশটি খুবই অপূর্ব সুন্দর একটি দেশ যেটি আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝে লুকিয়ে থাকা এক রহস্যময় স্বর্গ। দেশটি দশটি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত। এর ভৌগোলিক সীমারেখা পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু পশ্চিম আফ্রিকার ল্যান্ডলক ভূমি থেকে পুরোই বিচ্ছিন্ন পানির মধ্যে আটলান্টিক মহাসাগরে স্বচ্ছ স্পটিক পানির মধ্যে অবস্থিত এবং সেনেগাল থেকে প্রায় সাড়ে ৬০০ কিলোমিটার দূরে। ইউরোপ থেকেও বিমানে প্রায় সাত থেকে আট ঘণ্টার জার্নি করতে হয়। তবে স্পেনের গ্র্যান্ড কেনারিয়া দ্বীপ থেকে বিমানে তিন ঘণ্টার জার্নি করতে হয় কেপ ভার্দের যেকোনো দ্বীপে পৌঁছতে হলে।
১৬ ডিসেম্বর ২০২২ জার্মানির ডুসেলড্রপ এয়ারপোর্ট থেকেই আমি পাড়ি দিয়েছিলাম কেপ ভার্দের উদ্দেশে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্লেনের ঝাঁকি খেতে খেতে যখন আটলান্টিক পাড়ি দিচ্ছিলাম চারদিকে অথৈ সমুদ্রের মাঝে বিমানের জানালা থেকে দেখতে পেলাম একখণ্ড জমিন, যার চারদিকে নীল রঙের জলরাশি আছড়ে পড়ছে। তার চারপাশে ঢেউগুলো যেন জলতরঙ্গের এক অপরূপ লীলাভূমিতে পরিণত করেছে কেপ ভার্দের সালদ্বীপকে। প্রকৃতির নয়নাভিরাম ওয়াইল্ড ন্যাচারের মাঝে বিমানটি যখন ল্যান্ড করল তখন মনে হলো আমি ভিন্ন কোনো জগতে এসে পৌঁছেছি।
মাথায় কড়া দুপুরের রোদ আর হালকা বাতাসের ছোঁয়া এসে লাগল শরীরে। ইমিগ্রেশনের সব কাজ সেরে ১৫৯তম দেশ কেপ ভার্দের মাটিতে তখন আমি পা রাখলাম। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই লাল সবুজের পতাকাটা উড়িয়ে দিলাম আকাশে। সাল দ্বীপের বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার আউরল আমাকে রিসিভ করার জন্য আসলেন। আমি আউরলের গাড়িতে বসে জানালা দিয়ে বিস্ময়কর নয়নে এদেশের খানিক নৈসর্গ দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম ডাউনটাউনের পেদোনাল স্ট্রিটে। তারপর আমি স্ট্রিটের শেষ মাথায় কাসা ব্লু হোস্টেলে পৌঁছলাম পায়ে হেঁটে।
হোস্টেলে কোনোরকম ব্যাগ প্যাক রেখে বেরিয়ে গেলাম, পেটে তখন রাজ্যের ক্ষুধা। আওরল আমার জন্য বাইরে অপেক্ষা করছে। আমরা একসাথে একটি লোকাল রেস্টুরেন্টে খাওয়ার জন্য হাঁটতে থাকলাম ডাউনটাউন স্ট্রিট থেকে ভিন্ন গলি ধরে। কোনো নতুন দেশে এলে ডানে বামে আমার চোখ ঘুরতে থাকে। নতুন সবকিছু যেন এক অসাধারণ অনুভূতি আমার ভেতরে এনে দেয়।
হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পেলাম শহরের রাস্তায় অনেক ট্যুরিস্টের আনাগোনা আশপাশে বুটিক, সব রেস্টুরেন্ট, দেয়ালের গায়ে গায়ে রঙের ছবি আঁকা, সব মিলিয়ে মনে হলো যেন এক ভিন্ন রঙমাখা শহরে আমি হারিয়েছি, যেখানে তিল পরিমাণ আবর্জনা নেই। তারপর লোকাল রেস্টুরেন্টে এসে পৌঁছলাম। খেতে বসলাম লোকাল খাবার ক্যাচুপা। ক্যাচুপা একটি স্টু, কেপ ভার্দের জাতীয় খাবার; যার মধ্যে রয়েছে ভুট্টা, পেঁয়াজ, সবুজ কলা, ম্যানিওক, মিষ্টি আলু, স্কোয়াশ ও ইয়াম। ক্যাচুপা খেতে অনেকটা খিচুড়ি টাইপ। কোনো দেশে ভ্রমণে গেলে আমি সেখানকার লোকাল খাবার খাওয়ার চেষ্টা করি। । এর মধ্যে ফুটবলের আমেজ। দোকানে দোকানে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার উচ্ছ্বাস। কেউ মেসি, কেউ এমবাপ্পে গ্রুপ। সেদিন আমি শান্তা মারিয়া এলাকা পুরোপুরি হেঁটে দেখে ফেললাম।

পরের দিন ভোর হলো কেপ ভার্দের সাংবাদিক সিমনের কলে। আমি সকালে ওদের টেলিভিশনে ইন্টারভিউ শেষ করেই একটা গ্রুপ টুরের সাথে রওনা হলাম পুরো সাল দ্বীপের আনাছে কানাছে ঘোরার জন্য। কাইট বিচ, ব্লু আই, লায়ন মাউন্টেন, সার্ক বে, পালমিরা টাউন, এসপারাগস, তেরা বোয়া, মনতে কুরালসহ বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে ঘুরে দেখলাম। সার্ফিয়ের জন্য এই সালদ্বীপ খুবই বিখ্যাত।
ইতোপূর্বে আমি সড়ক পথে পশ্চিম আফ্রিকার ল্যান্ডলক সকল দেশ ভ্রমণ করেছি। তবে এই দেশটি একটু ভিন্ন বৈচিত্র্য বহন করছে। এখানকার সবকিছু ওয়াইল্ড খোলামেলা, হালকা বসতি এবং খোলা জায়গার মধ্যে কোথাও কোথাও একেকটা রক দেখা যায়। এরপর একে একে আমি দেশটির পাঁচটি আন্তদ্বীপ ভ্রমণ করেছি।
কেপ ভার্দের বিভিন্ন দ্বীপে বছরব্যাপী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু, নির্জন সৈকত, অসামান্য পাহাড়ের প্রাকৃতিক দৃশ্য, মাছ, সামুদ্রিক খাবার এবং কেপ ভার্দিয়ান মানুষের হাসিমাখা স্বাগতিক সুন্দর আচরণ পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে ভিন্ন করা যায়, যেটি আটলান্টিক মহাসাগরের ভেতর এক মানবিক স্বর্গ হিসেবে বিবেচিত। অথচ এখানে রয়েছে আফ্রিকান মানুষের কালো অধ্যায়ের করুণ ইতিহাস। আজও সেই দাসপ্রথার স্মৃতিচিহ্নজুড়ে রয়েছে ব্যথার গ্লানি, যা আফ্রিকান কৃষ্ণ মানুষদের বুকের ভেতর বেদনার সৃষ্টি করে। শত বছরের ইতিহাসকে ভুলে তারা আজ সারা পৃথিবী থেকে আগত অতিথিদেরকে ওয়েলকাম করে ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু নিয়ে তারা এই স্বর্গের মাঝে যেন সুখেই আছে।
প্রাকৃতিক সুন্দর আবহাওয়ার কারণে কেপ ভার্দেকে বছরব্যাপী ছুটির গন্তব্য বলা হয়। স্বচ্ছ জলে সার্ফিং এবং ডাইভিং উপভোগ করার মতো দৃশ্য এখানে দেখা যায়। এ ছাড়া এখানকার নরম বালিতে কিছুক্ষণ হাঁটলে সমুদ্রের বাতাস খেতে খেতে শরীর ও মন হালকা হয়ে যায়। এসব দ্বীপের জেলেরা দিনের বেলা মাছ ধরে নিয়ে আসেন এবং মহিলারা মাছ বিক্রি করেন।
এসব দিপির কিছু আশ্চর্যজনক স্থান আমাকে মুগ্ধ করেছে। তার মধ্যে প্রিয়া ডি শ্যাভেস–বোয়া ভিস্তা দ্বীপ যেখানে আমি কচ্ছপ এবং তিমি দেখেছি। এ ছাড়া পেড্রা ডো লুম সল্ট ক্রেটার যেটি একটি পুরোনো লবণের খনি, যা একটি আগ্নেয়গিরির গর্তের ভেতরে অবস্থিত এবং সালের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। এ লবণের খনির মধ্যে কিছু কূপ রয়েছে, যেখানে গোসল করা যায়। আর ব্লু আই হলো সাল দ্বীপের আরেকটি দুর্দান্ত আকর্ষণ। এটি ফিরোজা রঙের পানির একটি প্রাকৃতিক পুল এবং আগ্নেয়গিরির শিলায় আছড়ে পড়া তরঙ্গের ফলে কয়েক মিটার গভীর জলের নিচের গুহা যেটি আটলান্টিক মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত। সেই গুহার ভেতর নীল চোখের মতো দেখা যায়। এ ছাড়া সান্টো আন্তো সবচেয়ে পশ্চিমের, এবং সবচেয়ে সুন্দর কেপ ভার্দিয়ান দ্বীপপুঞ্জগুলোর মধ্যে একটি। পাহাড়, উপত্যকা নিয়ে এটি ট্রেকিংয়ের জন্য এটি অন্যতম জায়গা।
এদেশের প্রতিটি দ্বীপ এক কথায় অসাধারণ। সবমিলিয়ে স্বর্গের টুকরো প্রতিচ্ছবি হৃদয়গেঁথে আমি ফিরে এসেছি। পৃথিবীর মাঝে ভিন্ন ভিন্ন ভূখণ্ডে ভিন্ন বৈচিত্র্যের মাঝে আমি শিখেছি জেনেছি অনেক অজানাকে। সকল কষ্টকে হাতের মুঠোয় নিয়ে পাড়ি দিয়েছি এক দেশ থেকে আরেক দেশে। জীবন আমার কাছে এগিয়ে চলার, থেমে যাবার নয়।