মানালি ডায়েরি
আহসান রনি
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২২ ১৪:১৬ পিএম
আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২২ ১৯:৩৩ পিএম
ভারতের প্রতি প্রদেশেই অনেক দর্শনীয় স্থান থাকলেও মানালি সব ধরনের পর্যটকদের জন্য স্বর্গের মতো। বিশেষ করে তরুণ পর্যটকদের জন্য মানালি এখন ভারতের এক নম্বর দর্শনীয় স্থান। অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মনোরম পরিবেশ, অ্যাডভেঞ্চার অ্যাকটিভিটিস ও বরফ- মানালীকে করে তুলেছে সকলের প্রিয় একটি ডেস্টিনেশন।
ভারতের প্রাকৃতিক স্বর্ণভূমি হিমাচল প্রদেশের বিয়াস নদীর উপত্যকায় অবস্থিত একটি এলাকা মানালী। এখানে তাপমাত্রা শীতে ৩-৪ ডিগ্রীতে চলে যায়, গরমে আবার তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রীর বেশি হয় না; ফলে সারা বছরই মানালিতে ঘুরতে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে সব বয়সী পর্যটকরাই চলে আসেন। আমার মানালি যাত্রা শুরুটা হয়েছিলো শিমলা থেকে।
শিমলা ঘুরে মানালীতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হিমাচল প্রদেশের সরকারী বাসের টিকিট করলাম। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পুরো রাস্তার অপরুপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে মানালিতে যাওয়ার সেরা উপায় এটি। ঠিক সময়েই বাস ছাড়লো এবং পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে বাস এগিয়ে চলছিলো আর বাসের জানালা দিয়ে বাইরের সৌন্দর্য দেখে আমরা মুগ্ধ হচ্ছিলাম।
একের পর এক পাহাড়ের উপরে উঠছিলাম এবং আবার নিচে নামছিলাম; পাহাড়ি শহরগুলো পার হচ্ছিলাম এবং আশেপাশের পাহাড়ের সারিতে হাজার হাজার গাছ দেখে মনে হচ্ছিলো কেউ হয়তো মেপে মেপে গাছগুলো লাগিয়েছে! কাশ্মীরকে পৃথিবীর স্বর্গ যেই যেই কারণে বলা হয় তার বেশিরভাগ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ঠ্য আছে মানালিতেও; তাই তো স্থানীয়রা মানালিকেও 'সওয়ার্গ' বা স্বর্গ বলে।
শিমলা থেকে মানালির রাস্তার পাশেই সবসময় বয়ে চলে চমৎকার নদী। পাহাড়ি রাস্তাগুলো পাহাড় কেটে কেটে তৈরী করা এবং পাশেই অনেক উঁচু পাহাড় ও দুই পাহাড়ের মাঝের নদীর সৌন্দর্য সারা রাস্তা ঘুমাতে দেয়নি। রাজকুমার হিরানী পরিচালিত 'থ্রি ইডিয়েটস' সিনেমায় যে রাস্তা দেখেছি, যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখেছি এবং পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে তৈরী যে টানেল দেখেছি; সবই নিজ চোখে দেখার সুযোগ হয়েছে।
বিরতীতে পাঞ্জাবী ধাবা থেকে রুটি মাংস খেয়ে নিয়েছিলাম। রাস্তায় বিভিন্ন বিরতীতে মানালি বিখ্যাত নানা ফল খেয়েছি। মানালির আপেল সারা পৃথিবীখ্যাত। বাস দিয়ে যেতে যেতে আপেল, আনারসহ নানা ফলের বাগান দেখেছি। কুল্লু থেকে মানালির রাস্তা যেন আরও সুন্দর। বামে বিশাল পাহাড় আর ডানে স্রোতময় নদী।
নদীর ওপারের বিশাল সমতল ভূমি এবং তারপর আবার পাহাড়। কি অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য! এই রাস্তাতে যেতে যেতেই জানলাম যে এই এলাকায় মানালির বিখ্যাত অ্যাডভেঞ্চার অ্যাকটিভিটি রিভার রাফটিং ও প্যারাগ্লাইডিং করা যায়। বিকেলের আকাশে কয়েকটি প্যারাগ্লাইডিংয়ের প্যারাসুটও দেখতে পেয়েছি।
সন্ধার ঠিক আগে মানালি শহরে পৌঁছালাম। বাসস্ট্যান্ড মানালি মূল রাস্তা যা মল রোড নামে পরিচিত; তার পাশেই। ফলে বাস থেকে নেমেই আশেপাশে অনেকগুলো হোটেল দেখলাম। কয়েকটি হোটেলের সাথে কথা বলে মল রোডের পাশেই একটি হোটেলে রুম নিয়ে, ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। মল রোডের আশেপাশেই অনেকগুলো বাঙালি রেস্টুরেন্ট আছে। সেখানে গিয়ে মাছ, আলু পোস্তসহ কলকাতার বাঙালিদের নানা আইটেমের খাবার খেলাম।
মল রোডে এক বিশেষ ছোট ছোট গোলাপ জামুন পাওয়া যায়, সেটিও টেস্ট করে দেখেছি। দারুণ! মল রোডের মাঝে বা পাশের বেঞ্চে বসে থাকলেও ভালো লাগবে; কারণ সারা ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষরা এই রাস্তায় সবসময় ঘোরাফেরা করতে থাকে।
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করেই বের হয়ে পড়লাম মল রোডের পাশেই অবস্থিত তিব্বতী বুদ্ধিস্ট মনেস্ট্রি দেখতে। তিব্বতীদের এই দারুণ মনেস্ট্রিতে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আমরা বিখ্যাত হিড়িম্বা দেবী মন্দির দেখতে গেলাম। মল রোড থেকে প্রায় ২ কি মি দূরে পাহাড়ের উপরে অবস্থিত এই বিখ্যাত মন্দিরটি। ১৫৫৩ সালে মহাভারতের পৌরাণিক চরিত্র ভিমের স্ত্রী হিড়িম্বাকে উৎসর্গ করে এই মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়।
আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন পরের দিন এই মন্দিরের বাৎসরিক বলি'র প্রস্তুতি চলছিলো, যা এই মন্দিরের একটি নিয়মিত রীতি। ফলে নতুন একটি অভিজ্ঞতা হলো। মন্দিরের আশেপাশে ঘিরে আছে লম্বা লম্বা পাইন গাছের দারুণ বন। স্থানটির নাম বন বিহার। নিরিবিলি সময় কাটানোর জন্য বন বিহার দারুণ এক জায়গা। আমরা বনের মধ্যে অনেকক্ষণ আড্ডা দিলাম এবং খাবার খেয়ে নিলাম।
হিড়িম্বা দেবী মন্দির থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিলো ভাসিষ্ঠ মন্দির ও এর পাশে অবস্থিত গরম পানির কূপ। এই কূপে আসা পানি পাহাড় থেকে ঝর্ণার মাধ্যমে আসে গরম অবস্থায় এবং কথিত আছে এই পানিতে গোসল করতে শরীর বিভিন্ন রোগ সেরে যায়। ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা আলাদা কূপ আছে। দারুণ ব্যাপার হলো সারা পৃথিবী থেকে ট্রাভেলাররা মানালিতে আসেন এই কূপে গোসল করার জন্য।
এই পানি প্রচন্ড গরম হলেও এখানে গোসল করলেও শরীরে ফোস্কা পড়া বা পুড়ে যাওয়ার কোন ঘটনা ঘটে না। কূপ এলাকা থেকে ফিরে আসতেই আমাদের রাত হয়ে গেলো। ফলে মল রোডে কিছুক্ষণ ঘুরে, রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরের দিন আমাদের প্ল্যান হিমাচল প্রদেশ ট্যুরিজমের বাসে বারালাসা লা পাস ভ্রমণ। গরম কালসহ সারা বছরই এখানে বরফ পাওয়া যায় এবং এটি সমূদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৮৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। সকালে রওয়ানা দিয়ে অসাধারণ প্রকৃতির মধ্য দিয়ে সবার আগে আমরা গেলাম মানালি থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে রয়েছে অবস্থিত সোলাং ভ্যালীতে। শীতের সময় অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের জন্য এখানে থাকে প্যারাগ্লাইডিং, স্কেটিং, বাঞ্জি ও জীপ লাইনের মতো নানা রকম অ্যাডভেঞ্চারের আয়োজন।
কিন্তু গরমকাল বিধায় তেমন আয়োজন ছিলো না। তাই আমরা এগিয়ে গেলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য অটল টানেলে। ৯ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ এই টানেলটি ১০,০০০ ফুট উপরে অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম টানেল। পাহাড় খনন করে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে কাজ চলার পর এটি ২০২০ সালে খুলে দেওয়া হয়েছে।
পাহাড়ি রাস্তায় যেতে যেতে আমরা লাদাখের প্রায় সীমান্তে চলে গিয়েছিলাম, ফলে লাদাখের মতো দিগন্ত বিহীন রাস্তা দিয়ে আমরা চলছিলাম এবং অপরুপ সেই রাস্তা। মনে হচ্ছিল এই রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে এই বাস যদি কখনো না থামতো! একদিকে হেডফোন গান আর অন্যদিকে চারপাশে চোখধাধানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। বারালাসা লা পাসে পৌঁছে বাস যেখানে থামলো সমূদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উপরে তাই সবারই কিছুটা শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো। আবার এদিকে বরফের মধ্যে যেতে হলে পাহাড়ে উঠতে হবে। সাধারণ সময়ে এরকম ছোট একটি পাহাড় চড়া কারো জন্যই কষ্টের হয় না কিন্তু এই উচ্চতায় সবাই হাঁপিয়ে গেলো।
কিন্তু উপরে উঠে যখন বরফের মধ্যে লাফালাফি করলাম, বরফ ছোঁড়াছুড়ি করলাম তখন সব কষ্টের কথা ভুলে গেলাম। সারাদিন ব্যাপি এই যাত্রার প্রতিটি অংশই ছিলো মনে রাখার মতো। বেশিরভাগ সময় বাসে থাকলেও এই বাস জার্নি জীবনের অন্যতম সেরা বাস জার্নির একটি হিসেবে গণ্য করার মতো, বরফের মধ্যে লাফালাফি করা কিংবা মরুভূমির মতো বিশাল প্রান্তরের মাঝে রাস্তা দিয়ে চলা কিংবা চারপাশে পাহাড়ের মাঝে নীল পানির লেক। প্রতিটি দৃশ্যই চোখ বুজলেই চোখে ভেসে ওঠে।
পরের দিনটি আমাদের জন্য এক দারুণ এক্সাইটমেন্টের দিন ছিলো। কারণ এদিন আমরা পুরো টিম মিলে রিভার রাফটিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। হোটেলের সহায়তায় একটি কোম্পানির সাথে কথা বলে আমরা বেরিয়ে পড়লাম কুল্লুর উদ্দেশ্যে। কারণ রাফটিং করতে হলে এই স্থানটিই পারফেক্ট। বাসে করে আমরা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে প্রত্যেকের ব্যাগ, মোবাইলসহ সবকিছু অফিসে জমা রাখলাম।
আমাদের সবাইকে লাইফ জ্যাকেট ও হেলমেট দিয়ে ছোট্ট ট্রেনিং দেওয়া হলো। সবাই খুব এক্সাইটেড ছিলাম। কিন্তু সেই এক্সাইটমেন্ট আরও শতগুণ বেড়ে গেলো যখন প্রচন্ড স্রোতের মধ্যে বোট ভাসিয়ে দেওয়া হলো। প্রচন্ড আনন্দে সবাই চিৎকার করছিলাম। আমাদের বোট ড্রাইভার ও গাইড আমাদের ডিরেকশন দিচ্ছিলেন এবং আমরা তা মেনে বোট নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।
যখন প্রচন্ড স্রোতে বোট সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলো এবং স্রোতে বোটটি বাড়ি খেয়ে পানির ঝাপটা আমাদেরকে ভিজিয়ে দিচ্ছিলো; সেই অভিজ্ঞতার কথা ও এক্সাইটমেন্টের কথা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। যখন ঢেউ একটু কম ছিলো তখন ঠান্ডা পানিতে নেমে কিছুক্ষণ সাঁতারও কেটেছি। রাফটিং শেষে টিমের সকলেরই একটিই কথা ছিলো; এরকম অভিজ্ঞতা সারা জীবনে হয়নি এবং এই স্মৃতি ভোলার নয়।
মানালির আরেকটি অংশ হচ্ছে ওল্ড মানালি। মানালির ক্লাব হাউজের পাশ দিয়ে নদী বয়ে গেছে এবং এখানে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা প্রকৃতির মাঝে কাটিয়ে দিতে পারবেন। মল রোডের পাশে বা ওল্ড মানালিতে অনেক হোটেল ও হোস্টেল আছে; বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য যেমন কম খরচে থাকার ব্যবস্থা আছে তেমনি অনেক বিলাসী রিসোর্ট ও হোটেলও পাবেন।
বাংলাদেশ থেকে মানালি যেতে হলে ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে দিল্লী যেতে হবে। দিল্লীর কাশ্মীর গেট বাস স্ট্যান্ড থেকে জিং-বাসসহ সরাসরি অনেকগুলো বাস চলে যা সরাসরি আপনাকে মানালি পৌঁছে দেবে। রোহতাং পাস, সোলাং ভ্যালী, বারালাসা লা পাস বা মানালির সব স্থানগুলো ঘোরার জন্য হিমাচল ট্যুরিজমের বিশেষ ট্যুর আছে যা আপনি মল রোডের পাশেই অবস্থিত হিমাচল ট্যুরিজমের অফিস থেকে ট্যুরের একদিন আগ পর্যন্ত বুকিং করতে পারবেন।
লেখক: ট্রাভেলার ও সিইও, ট্রাভেল বাংলাদেশ
প্রবা/জিকে