ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৫ ১০:০৬ এএম
পর্যটকদের কাছে নতুন এক সৌন্দর্যময় স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে রাজনগর উপজেলার করিমপুর চা-বাগানের ১৬ নম্বর টিলা
সবুজ অরণ্য আর হাওর-বাঁওড়বেষ্টিত চায়ের রাজধানী খ্যাত জেলা মৌলভীবাজার। সমতল আর উঁচু-নিচু পাহাড়-টিলার এ জেলায় রয়েছে মোট ৯২টি চা-বাগান। এসব চা-বাগানের একেকটির সৌন্দর্য একেক রকম। কোনো কোনো চা-বাগান সুউচ্চ টিলাময় আবার কোনো কোনো চা-বাগান টিলা ও সমতলের সম্মিলনে প্রাকৃতিকভাবে গঠিত। তবে পর্যটকদের কাছে চা-বাগান মানেই অবারিত সবুজের মেলা। চা-বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই হাজারও পর্যটক এ জেলা ভ্রমণ করেন। জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার এমআর খান চা-বাগানের দার্জিলিং টিলা দেশ-বিদেশের ভ্রমণপ্রিয়দের কাছে যেন একটি স্বর্গোদ্যান। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে জেলার রাজনগর উপজেলার করিমপুর চা-বাগানের ১৬ নম্বর টিলা পর্যটকদের কাছে নতুন এক সৌন্দর্যময় স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। নয়নাভিরাম পাহাড়ি এ টিলায় লোকজনের সমাগমে গড়ে উঠছে জেলার নতুন এক পর্যটন স্পট। এখানে প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে ওঠা সৌন্দর্যময়ী পাহাড়ি টিলার চারপাশে রয়েছে মনোমুগ্ধকর সবুজ আর সতেজ চাগাছ। এ টিলার চূড়ায় আরোহণ করার পর ভাগ্য সহায় থাকলে দেখা পাওয়া যাবে শত শত বানরসহ বন্য প্রাণীদের বিচরণ। যা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য হতে পারে আনন্দদায়ক।
মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের উপজেলা রাজনগরের ৩ নম্বর মুন্সিবাজার ইউনিয়নের করিমপুর চা-বাগানের অপার সৌন্দর্যময় ১৬ নম্বর টিলা। টিলাটির উচ্চতা প্রায় ৭০০ ফুট। মূল ১৬ নম্বর টিলার চারদিকে ছোট ছোট আরও কয়েকটি টিলাভূমি যেন মূল টিলাটির সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। টিলাটি শতবর্ষের হলেও এতদিন ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এ টিলাটি ছিল অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে। কারণ করিমপুর চা-বাগানের কার্যালয় থেকে টিলাটির অবস্থান অনেকটা গহিন এলাকায়। ফলে বাগানবাসী ও স্থানীয়দের কাছে সুউচ্চ অপার সৌন্দর্যময় টিলাটি অনেক দিনের পরিচিত হলেও পর্যটক ও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এটি গত দুই বছর আগেও তেমন পরিচিত ছিল না। তবে সাম্প্রতিককালে এ টিলাটি পরিচিত হয়ে ওঠার ফলে এখন প্রায় প্রতিদিনই পর্যটক ও ভ্রমণপিপাসু নারী-পুরুষ এখানে ভিড় করছেন।
সম্প্রতি টিলাটিতে গিয়ে দেখা গেছে, মৌলভীবাজারের পর্যটন শিল্পে নতুন সংযোজিত দৃষ্টিনন্দন ও অপরূপ সৌন্দর্যময় এ টিলার চারপাশের সবুজ প্রান্তরে ভিড় করেছেন নারী-পুরুষ-শিশুসহ অসংখ্য ভ্রমণপিপাসু মানুষ। প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালে করিমপুর চা-বাগানের শ্রমিক সুমন ভুঁইয়া বলেন, ‘আমাদের বাগানের (করিমপুর চা-বাগান) ১৬ নম্বর টিলাটি খুবই সুন্দর। এটি দেখতে অনেকে আসছেন বাগানে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক বন্ধের দিনে, ঈদ ও পূজার ছুটিতে এখানে মানুষের ঢল নামে। মানুষ আসছেন, দেখছেন আমাদের
ভালো লাগে।’
প্রবাসী মো. মুয়িজুর রহমান মিঠু বলেন, ‘অনেক বছর পরে আমি ঈদের ছুটিতে দেশে এসেছি। এসে জেলার বিভিন্ন স্থান ভ্রমণের পর করিমপুর চা-বাগানের ১৬ নম্বর টিলা দেখতে যাই। অসাধারণ জায়গা এ টিলাটি। প্রবাসে ফেরত যাওয়ার আগে আবার আসব এখানে। চেষ্টা করব সারাদিন এ প্রকৃতির মাঝে কাটিয়ে যেতে।’
সমাজকর্মী মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক সুন্দর জায়গা, দেখে খুব ভালো লাগল। এ স্থানে আসাটা কষ্টকর। তবে আসার পর সব কষ্ট নেই হয়ে যায়। জায়গাটি এতটাই সুন্দর যে, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। এক কথায় অসাধারণ।
শ্রীমঙ্গলের গণমাধ্যমকর্মী ইমরান আহমেদ বলেন, ‘এ জায়গাটি খুবই সুন্দর। টিলার চারদিক অসাধারণ। তবে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় জায়গাটি ময়লা আবর্জনায় ভরপুর। পর্যটকরা খাবারের অংশ, প্যাকেট, কার্টন, পলিথিন ফেলে গিয়েছেন। যেসব পর্যটক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় এসব স্থানগুলোতে ভ্রমণ করেন তাদের প্রতি অনুরোধ খাবারের পর যদি নিজ দায়িত্বে খাবারের অংশ, প্যাকেট, পলিথিন পর্যটন স্পটগুলো থেকে সরিয়ে না নেন তবে একসময় সবুজের মাঝে নিঃশ্বাস ফেলার জায়গাগুলোর বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠবে।’
শিক্ষক মো. আব্দুল হান্নান বলেন, ‘আসলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের সিলেট বিভাগের রাজনগর উপজেলার করিমপুর চা-বাগানে এসে আমরা মনোমুগ্ধকর এক পরিবেশ দেখেছি। এ টিলাটি দেখার মতো। চতুর্দিকে শুধু সবুজের সমারোহ। টিলার ওপরে অনেক কষ্ট করে আসতে হয়েছে। তবে চূড়ায় ওঠার পর সব কষ্ট নিমেষে নেই হয়ে গেছে। পর্যটকদের জন্য এ স্থানটি অনেক সুন্দর একটি স্থান। যারা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মৌলভীবাজার জেলা ভ্রমণে আসবেন তাদের প্রতি আহ্বান অবশ্যই করিমপুর চা-বাগানের ১৬ নম্বর টিলা দেখে যাবেন।’
রাজনগর উপজেলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তফা বকস বলেন, ‘করিমপুর চা-বাগানের প্রকৃতির দান অসাধারণ। ১৬ নম্বর টিলাটি গত ৩-৪ বছর আগেও জঙ্গলে আচ্ছাদিত ছিল। এখন কর্তৃপক্ষ পরিষ্কার করে টিলাটির পূর্বপাশে নতুন চায়ের চারা রোপণ করেছেন। বর্তমানে প্রায় ৭০০ ফুট উচ্চতার এ টিলাটি জেলার অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র। এটি দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা আসছেন এখানে। টিলাটির সৌন্দর্য উপভোগ করে তৃপ্ত হৃদয়ে ফিরে যাচ্ছেন।’