দ্য ভ্যালি অব গড
সাফকাত ফারুক
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২২ ১৬:৩৫ পিএম
আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২২ ১৭:১৬ পিএম
একজন ফরাসি নাগরিক নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং (নিম)-এ ট্রেনিং নিতে এসে নিমকে ভ্যালি অব গড কথাটি দ্বারা আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, প্রথমত নিম হচ্ছে মাউন্টেনিয়ারিং প্রশিক্ষণের আঁতুড়খানা এবং এখান থেকে এর চারপাশের মাউন্টেইনগুলোর বেস ক্যাম্পে যেতে একই সময় লাগে।
নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানটিকে উত্তর কাশীর মধ্যমণি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উত্তর কাশী থেকে নিমে যাবার পথে এই দিন আমাকে সঙ্গ দিয়েছিল অবাধ প্রকৃতি। কখনও ভাগীরথী, কখনও পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা গ্রাম, আবার কখনও বিশাল বনভূমি, যার নাম ‘লাদারী রিজার্ভ ফরেস্ট’। পাহাড়ি চড়াইয়ে ৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এসে যখন ভ্যালি অব গডের দরজায় পৌঁছাই তখন মধ্যদুপুর। চারদিক একবার ভালো করে দেখে নিলাম, এটাই হতে যাচ্ছে আমার আগামী ২৮ দিনের বাসস্থান। ট্রেনিংয়ের প্রথম দিন ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ থাকলেও এর পরেই শুরু হয় হার্ড ওয়ার্কিং। স্পোর্টস ক্লাইম্বিংয়ের পাশাপাশি চলতে থাকে রক ক্লাইম্বিং। স্পোর্টস ক্লাইম্বিং ও রক ক্রাফট শেষে আমাদের জন্য ছিল ম্যাপ রিডিং। মজার ব্যাপার হলো, ম্যাপ রিডিংয়ের প্রাকটিক্যাল সেশনে ২০টি রোপের মধ্যে আমাদের ১১ নম্বর রোপ থার্ড হয়েছিল। মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে ৬টি কন্টোর খুঁজে বের করেছিলাম। এর পরদিনই শুরু হয় মাউন্টেনের উদ্দেশে যাত্রা। এবারের বেসিক কোর্সে মোট ট্রেইনি সংখ্যা ১৫০ জন যারা ২০টি রোপে বিভক্ত। আমার রোপ নম্বর ১১। এত জনের এই বিশাল বাহিনী পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছে মাউন্টেনের দিকে। উঁচু-নিচু এবড়ো-থেবড়ো রাস্তা পার হতে গিয়ে দেখা মিলেছে রডোডেনড্রনের। কী অপূর্ব সুন্দর দেখতে!
আজ আমাদের গন্তব্য টেলা ক্যাম্প। টেলায় (৮,২০০ ফিট) পৌঁছে তাঁবু গেড়ে ক্যাম্পিং করলাম। প্রতি তাঁবুতে ১০ জনের থাকার ব্যবস্থা। সেদিন বিকেলে এক্লিমাটাইজেশন ওয়াকের জন্য ৫০০ ফিট উপরে গিয়ে আবার ফিরে আসি। পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলে বাইরে বেরিয়ে দেখি সূর্যের আলো সবেমাত্র আসি আসি করছে। ভোরের প্রথম সূর্যরশ্মি দূরের বরফচূড়ায় পড়ার সাথে সাথে এক অপার্থিব সুন্দরের ঢেউ খেলে গেল। আমি মুগ্ধ চোখে সেই সৌন্দর্য দেখে নিলাম কতক্ষণ। এরপর চা পান করে নাস্তা সেরে নিয়ে তাবু গুটিয়ে শুরু হল আবার পথচলা। আজকের গন্তব্য গুজ্জার হাট। গুজ্জার হাটে যাওয়ার পথটা অনেক বেশি কঠিন। অনেক চড়াই উতরাই পাড়ি দিতে হয়েছে এদিন। কয়েকটি পাথুরে ঝিরি পথ পার হতে হয় গাছের সাঁকোয় পা রেখে রেখে। মোট আট ঘন্টা ট্রেকিং শেষে গুজ্জার হাট (১১,১৫০ ফিট) পৌঁছাই আমরা। এই দিনই প্রথম বারের মত বরফের দেখা পাই। মন যখন সাদা পাহাড়ের চূড়া দেখার স্বপ্নে বিভোর তখন আমাদের আজকের মতো ট্রেকিংয়ের সমাপ্তি টানতে হলো। গুজ্জার হাটে রাত্রি যাপন শেষে কালকের গন্তব্য বেসক্যাম্প।
ভোরে চা নাস্তা করার পর আমরা রওনা করি বেসক্যাম্পের দিকে। এবারের কাজ লোড ফেরি। আজকের সকালটা বেশ রোদ ঝলমলে। স্বচ্ছ পরিস্কার নীল আকাশ। সামনে উত্তুঙ্গ সাদা পাহাড়। যদিও এতদূর থেকে কেবল রিজ বা ধার দেখেই তৃপ্ত থাকতে হয়। দুই ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে বেসক্যাম্পে পৌঁছে আবার ফিরে আসলাম। এবার পুরোপুরি শিফটের পালা। ক্যাম্পে পৌঁছে তাবু খাটিয়ে যে যার মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে চারপাশটা দেখতে লাগলাম। আগামী কয়েকদিন এটাই আমাদের নতুন ঠিকানা। বেসক্যাম্পে হঠাৎ একদিন সন্ধ্যার পরপরই তুষারপাত হল। তখনো রাতের খাবার খাওয়া হয়নি কারো। প্রচুর তুষারপাত হচ্ছে, এর মধ্যেই সবাই খাবারের জন্য তাবু ছেড়ে বের হলাম, এবং লাইন ধরে খাবার নিয়ে বাহিরে দাঁড়িয়েই খেয়ে নিলাম। এরপর জমে থাকা তুষারের ছবি তুলে সেদিনের মত ঘুম। কারণ সারাদিনের ক্লান্তি শেষে খাবার পেটে পড়লেই দুই চোখের পাতায় রাজ্যের ঘুম এসে ভর করে। বেসক্যাম্পে প্রথম দিন শুধুই থিওরি ক্লাস আর সেই সাথে টেকনিক্যাল গিয়ার চেক করা ছিল। যদিও বেসক্যাম্পে প্রতিদিনই দুপুরের পর কোন না কোন থিউরি ক্লাস থাকতই, হোক সেটা হিমালয়, বা ফার্স্ট এইড কিংবা অলটিটিউট সংক্রান্ত। বেসক্যাম্পের দ্বিতীয় দিন থেকে আইস ক্রাফট ক্লাস শুরু। প্রথমেই থিওরি ও ডেমো ক্লাস, বাকী তিনদিন প্রাকটিস। যে গ্লেশিয়ারে আমরা আইস ক্রাফট করতে যাই তার নাম ‘ডোকরানিবামক’ গ্লেশিয়ার’ এবং এর বিস্তৃতি পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত। একই নিয়মে স্নো ক্রাফটও হয়েছে। একদিন থিওরি ও ডেমো ক্লাস, বাকি দুইদিন প্রাকটিস।

এত উপরে এসে এমন হাড়ভাঙা খাঁটুনি, মাঝে মাঝে মনে হত কেন যে এখানে আসতে গেছি! কিন্তু কোন একটা ধাপ সফলতার সাথে শেষ করার পর কি যে আনন্দ হত বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আইস ক্রাফট এবং স্নো ক্রাফট শেষে ১২ তম দিনে আমরা ‘মাছাধার’ (১৫,৬০০ফিট) আসি হাইট গেইনের জন্য। এটা মূলত একটা রিচ বা ধার। এখানে উঠার পর মনে হল মাউন্টেইনের দিনগুলো এবার সত্যিই ফুরিয়ে এসেছে। উপরে উঠে “মাউন্ট জনলি, মাউন্ট ড্রোপাদি কা ডান্ডা-১ এবং ড্রোপাদি কা ডান্ডা-২” আরো স্পস্টভাবে চোখে ধরা দিল। এত কাছ থেকে মাউন্টেইনের এমন সৌন্দর্য দেখে অ্যাডভান্স কোর্সের চিন্তাটা মনের ভেতর আরো জোড়ালো হল। প্রায় আধাঘন্টা সময় আমরা এখানে কাটিয়ে বেসক্যাম্পে নেমে আসি। ছোট্ট একটা ধার পর্যন্ত গেলেও বেসক্যাম্পে টিচাররা অভিনন্দন জানালেন। আজ রাতটা বেসক্যাম্পে কাটিয়ে কাল শুরু হবে নিমের উদ্দেশ্যে যাত্রা। বেসক্যাম্পে শেষ রাতটা কাটিয়ে পরদিন ভোরে বের হই টেলা ক্যাম্প এর উদ্দেশ্যে। দুপুর ১টায় টেলা ক্যাম্পে পৌঁছার আগে পার হয়ে আসি গুজ্জার হাট। আমাদের মধ্যে একজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে স্ট্রেচারে করে নামিয়ে আনা হয়। আজকে রাতটা টেলায় কাটাতে হবে আমাদের। টেলায় আজ আমাদের জন্য এমন সারপ্রাইজ খাবার অপেক্ষা করছে জানতে পারিনি। বিকেলে জিলাপি, রাতে চাওমিন ও ফ্রাইড রাইছ! আহা কতদিন পর এমন মুখরোচক খাবার। গত ২০/২২ দিনে প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম খাবারের এমন বাহারি স্বাদ।
যাই হোক, সব ভালোর পর কিছু মন্দও থাকে বোধহয়। আর তারই ফল স্বরুপ রাতে সে কী বৃষ্টি! ফেরার আনন্দে তাবুর চারপাশে নালা করার কথা কাররই মাথায় ছিল না। ফলাফল সবকিছু ভিজে চপচপে অবস্থা। রাতটা কোন রকম পার করে ভোরে নামা শুরু করি বুকির উদ্দেশ্যে। বুকি পৌঁছে আমাদের জন্য অপেক্ষারত বাসে চড়ে চলে আসি নিমে। পরেরদিন চলে যাই রিভার ক্রসিং এ। ঠিকঠাক রিভার ক্রসিং শেষ করে এবার অপেক্ষা গ্রাজুয়েশনের জন্য। ১৭ এপ্রিল আমাদের গ্রাজুয়েশন প্রোগ্রাম। নিমের নির্ধারিত ড্রেস পড়ে সকাল সকাল সবাই হাজির হই অডিটরিয়ামে। অনুষ্ঠান শুরু হলে প্রিন্সিপাল স্যার আমাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বললেন এবং পরবর্তী দিনগুলোর জন্য শুভকামনা জানালেন। এরপর তিনি একে একে সবাইকে বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্সের ব্যাচ পড়িয়ে দিলেন। এরপর সবাই মিলে গ্রুপ ছবি তোলার জন্য চলে আসি পাইন বলে। ছবি শেষে চলে খাবার পর্ব। আর এর মাধ্যমেই শেষ হল প্রায় মাসখানিকের জার্নি। ট্রেনিং তো শেষ হল, কিন্তু অ্যাডভান্স কোর্সের যে সুপ্ত বাসনা মনের ভেতরে ছিল তা প্রিন্সিপাল স্যারের কথায় মাথা চারা দিয়ে উঠলো। মনে একটা দ্বিধা কাজ করছিল যে দুটো কোর্সের ধকল একসাথে নিতে পারব কিনা! কিন্তু উনি যখন আমাকে নির্দিধায় অনুমতি দিলেন আমিও সিদ্ধান্ত নিলাম ৭ টা দিন অতিরিক্ত থেকে কোর্সটা করেই যাই। ১৭ তারিখ গ্রাজুয়েশনের পর নিম মোটামুটি ফাঁকা। আমিও হোস্টেল ছেড়ে নিমের গেস্ট হাউজের ‘আশি গঙ্গা’ নামক রুমে উঠে গেলাম। যদিও দুদিন পরেই প্রিন্সিপাল স্যার নিজে আমাকে তাদের অতিথি সম্বোধন করে হোস্টেল রুমে থাকার ব্যাবস্থা করিয়ে দিয়েছিলেন এবং বিনা ফি তে স্পোর্টস ক্লাইম্বিং করার অনুমতি দিয়েছেন। একাকী এই সাতদিনে আমার রুটিন ছিল, সকালে ঘুম থেকে উঠে পাহাড়ি পথে দৌঁড়ানো, তারপর নাস্তা করে স্পোর্টস ক্লাইম্বিং এর জন্য গায়েন হলে গিয়ে প্রাকটিস করা। এছাড়া প্রায়ই বিকেল কাটতো পাহাড়ী নদী, দূরের গ্রাম, ছোট ছোট ঘাসফুল আর বানরের দলের বাঁদরামি দেখে দেখে।
জানা-অজানা নিম দেখতে দেখতে ২৫ তারিখ চলে আসলো এবং অ্যাডভান্স কোর্সের জন্য রিপোর্টিং সেরে ফেললাম। কাল থেকে কোর্স শুরু। ২৬ এপ্রিল অ্যাডভান্স কোর্সের প্রথম দিন। বেসিকের মতই দৈনন্দিন রুটিন, সকালে ঘুম থেকে উঠে ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ। এরপর চলে রোপ ভাগ পর্ব। এবারের কোর্সে মোট ৬০ জন ট্রেইনি। ৮টা রোপের মধ্যে আমার রোপ নম্বর ৫। মোট ৭ জন ট্রেইনি আমাদের রোপে। রোপ ভাগ শেষে নাস্তা করে অডিটরিয়ামে আনুষ্ঠানিকতা সেরে আমাদের ইনস্ট্রুমেন্ট দেয়া হয়। তারপর এক্সপেডিশন প্লানিং এর ক্লাস। এই ক্লাসে প্রতিটা রোপকেই একটি করে মাউন্টেইনের নাম দেওয়া হয় এক্সপেডিশন প্লান করার জন্য। আমরা পেয়েছি মাউন্ট ভাগিরতী-২। পরেরদিন আমাদের হিল ওয়াকে আবারও লাদারি ফরেস্টে নিয়ে যাওয়া হয়। ওখান থেকে ফিরে মাউন্টেইনের উপর বিভিন্ন ক্লাস এবং এক্সপেডিশন প্লানিং এর জন্য সময় দেয়া হয়। ট্রেনিংএর তৃতীয় দিন টেকলা চলে যাই রক ক্রাফটের উদ্দেশ্যে। পাঁচ দিনের রক ক্রাফটে বেসিকের পাশাপাশি নতুন করে পাঁচ ধরনের জুমারিং, এইড ক্লাইম্বিং এবং নতুন কিছু টেকনিক শেখানো হয়। রক ক্রাফটের শেষ দিনে কাঁধে ২০-২২ কেজি ওজন নিয়ে একটি বড় রক ফেসে জুমারিং এবং রেপ্লিং করি। নিম ক্যাম্পাস থেকে পাহাড়ে যাওয়ার দুদিন আগে রিভার ক্রসিং এর জন্য আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় আশীগঙ্গায়। দিন কয়েক আগেই বেসিক কোর্সে রিভার ক্রসিং শিখেছি তাই উৎসাহ টা একটু বেশিই ছিল, যদিও ঠান্ডা পানির স্রোত দেখলেই সব উৎসাহ দমে যায়। অ্যাডভান্স কোর্সে আমাদের নতুন আরও দুই ধরনের ক্রসিং শেখানো হল। তার পরের দিন স্পোর্টস ক্লাইম্বিং করে আমাদের দিন কাটল। এরপর আসল সেই কাঙ্খিত দিন, পাহাড় যাত্রার দিন। ভোরে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা সেরে দুপুরের খাবার প্যাক করে নিয়ে বাসে উঠে চলে আসলাম বুকিতে। এরপর ট্রেকিং করে চলে আসি টেলা ক্যাম্পে। টেলায় আসার পর পরই শুরু হল তুমুল বৃষ্টি। তাড়াতাড়ি ব্যাগ রেখে সবাই মিলে তাবু খাটাতে লাগলাম। বৃষ্টি শেষে পূর্ব আকাশে রঙ্গের সপ্ত সুরের মেলা। পাহাড়ের গা ভেদ করে রংধনুর সাত রং যেন নেমে আসল আমাদের সাদর সম্ভাসন জানাতে।

৬ মে সকাল ৭ টায় টেলা থেকে ট্রেকিং করে বিকেল বেলায় গুজ্জার হাট পৌঁছাই। গুজ্জার হাট পৌঁছে আমরা টেন ম্যান টেন্টের ২৪ টি তাবু এডভান্স ট্রেইনিরা ৩০ মিনিটের মধ্যে লাগিয়ে ফেলি। কারণ বেসিক টিম তখন গুজ্জার হাটে পৌঁছাইনি। ওরা এসে তাবু লাগানো দেখে খুবই অবাক হয়, এবং খুশিও হয় এই ভেবে যে এডভান্স ট্রেইনিরা আসলেই এডভান্স। পরেরদিন আমাদের লোড ফেরির বদলে ক্ষেরাতাল নিয়ে যাওয়া হয়। ক্ষেরাতাল মূলত একটি লেক। এখানে দাঁড়িয়ে এই লেক সম্পর্কে বিস্তারিত জানা হল। এরপর গুজ্জার হাটে ফিরে যারযার ব্যাগ নিয়ে আমরা বেসক্যাম্পে শিফট করি। বেসক্যাম্পে আমরা তিনদিন থেকে স্নো ক্রাফট প্রশিক্ষণ শেষে, এডভান্স বেসক্যাম্পে (১৪,২০০ ফিট) লোড ফেরি শুরু করি। এডভান্স বেসক্যাম্পে ৫ দিন থেকে বিভিন্ন ক্লাস এবং আইস ক্রাফটের প্রশিক্ষণ নিই। এখানে বেসিকের রিভিশনের পাশাপাশি নতুন আরও অনেক কিছু শেখানো হয়। যেমন - টু পিটন ক্লাইম্বিং, টিপটো ক্লাইম্বিং, এবালা হোক ইত্যাদি। এছাড়াও এডভান্স ক্যাম্পে হাই অল্টিটিউটে বিভিন্ন চুলা এবং গ্যাসের মাধ্যমে কিভাবে রান্না করতে হয় সেই প্রশিক্ষণ চলে। ১৪ই মে আমরা ক্যাম্প -১ এ লোড ফেরি করে আসি, এবং পরেরদিন আমরা সকলে ক্যাম্প -১ এ শিফট করি। ক্যাম্প-১ এ যাবার পথে অনেকগুলো ক্রেভাসের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এবং ঐদিনই আমরা 'র্যাম্বো রক' পর্যন্ত এক্লেমাটাইজেশন ওয়াকের পাশাপাশি রোপ ফিক্সড করে আসি। ১৬ তারিখ রাত ৩টার সময় আমরা 'ডি কে ডি- ২' সামিট পুশে বের হই এবং সকাল ৭ টায় চূড়ায় উঠতে সক্ষম হই। চূড়ায় উঠার পর ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল এই ভেবে যে, নাহ, আমি পেরেছি, সত্যিই পেরেছি।

এরপর চারপাশে তাকিয়ে আরো অনেক চূড়ার দেখা মিলল। এখান থেকে চারপাশ দেখতে এত মোহনীয় যে আচ্ছন্ন করে ফেলে। কিন্তু উপরে উঠলে নামাটা হতে হয় বেশি সাবধানী। তাই সেখানে ২০ মিনিটের মত অবস্থান করে আমি আমাদের লাল সবুজের পতাকা এবং বাকীরা ইন্ডিয়ান পতাকা উড়িয়ে সকলে সুস্থভাবে এডভান্স বেসক্যাম্পে নেমে আসি। ১৬ই মে সময়টা ঠিক ৩টা বেজে ২৫ মিনিট যখন এডভান্স বেসক্যাম্পের কাছাকাছি তখন দূর থেকে বেসিক কোর্সের ট্রেইনিদের দেখা গেল। আরেকটু কাছাকাছি পৌঁছালে তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনায় সিক্ত হলাম সকলে। সেদিনের রাতটা এডভান্স বেসক্যাম্পে কাটিয়ে পরদিন বেসক্যাম্পে নেমে আসি। বেসক্যাম্পে আসার পর নিচে গিয়ে কি কি করতে হবে তার একটা ব্রিফিং হল। এরপর একে একে গুজ্জার হাট, টেলা ক্যাম্প হয়ে বুকি গ্রাম এবং সেখান থেকে বাসে করে নিম ক্যাম্পাসে চলে আসি। ভেবেছিলাম এবার গ্রাজুয়েশনের পালা। কিন্তু না, পরদিন আমাদের আবারও ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ এবং ম্যাপ রিডিং এর জন্য প্রস্তুতি নিতে হল। বেসিকের তুলনায় এবারের ম্যাপ রিডিং আরো ভালো ভাবে আয়ত্তে নিতে পারলাম। এরপর শুরুতে করা এক্সপেডিশন প্লানিং প্রজেক্ট জমা দিতে হল।
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন! ২২ মে সকাল ১০ টায় গ্রাজুয়েশন প্রোগ্রামের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হল। আমরা সকলে নিমের নির্ধারিত ড্রেস পরে অডিটোরিয়ামে উপস্থিত হলাম। যদিও ড্রেস সেই বেসিকেরটাই। তাতে কিঞ্চিৎ মন খারাপ হলেও কিছু করার ছিল না। অতএব হাসিমুখে প্রিন্সিপাল স্যারের কাছ থেকে এডভান্স মাউন্টেনিয়ারিং কোর্সের ব্যাচ পরিধান করে ছবি তোলার পর্ব চুকিয়ে ফেললাম। এবার বাড়ি ফেরার পালা! প্রায় আড়াই মাস কিভাবে কিভাবে কেটে গেল ভাবলে বেশ অবাকই লাগে! একেবারে নতুন একটা পরিবেশে এসে নতুন নতুন মানুষের সাথে মেশা, তাদের সাথে একত্রে মাউন্টেনিয়ারিং এর মূল দুটো কোর্স করার অভিজ্ঞতা বেশ হৃদ্য করলো আমাকে। অনেক অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে বাড়ির পথ ধরলাম।
প্রবা/জিকে