× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জেরুজালেম : তিন ধর্মের কেন্দ্রস্থল

প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২২ ০১:০৫ এএম

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২২ ১২:২১ পিএম

ছবি : জেরুজালেমে আল আকসা মসজিদ প্রাঙ্গন

ছবি : জেরুজালেমে আল আকসা মসজিদ প্রাঙ্গন

ছবি : পুরাতন শহর জেরুজালেম, আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্স

ছবি : পুরাতন শহর জেরুজালেম, আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্স

ছবি : জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদের ভিতর এই সেই পাথর। এখান থেকেই মেরাজের রাতে ইসলামের শেষ নবী বেহেশতে গমন করেন

ছবি : জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদের ভিতর এই সেই পাথর। এখান থেকেই মেরাজের রাতে ইসলামের শেষ নবী বেহেশতে গমন করেন

বাংলাদেশি দম্পতি রেজাউল বাহার ও শারমিন বাহার। ২০০৮ সাল থেকে বেড়ানো শুরু করেছেন। একসঙ্গে পৃথিবীর ৮৮টি দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন তারা। গত ১৫ বছর এই দম্পতি আমেরিকা থাকছেন। সম্প্রতি তারা ঘুরে এসেছেন ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের জেরুজালেম। সেই গল্প প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন রেজাউল বাহার। 

ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের জেরুজালেম। তিনটি ধর্মের মধ্যম এই শহর। মনে করা হয় এই শহরের খুব কাছেই ইব্রাহিম (আ.) তার ছেলেকে নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন। শহরের একটু বাইরেই জন্ম হয় যিশু খ্রিষ্টের এই শহরের পথ ধরে হেঁটে গেছেন তিনি, এখানেই তাকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়। ইসলামের নবীদের শহর এই জেরুজালেম। আল-আকসা মসজিদ, যা পরিচিত টেম্পল-মাউন্ট নামে। ইসলামে মক্কা মদিনার পরেই জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ পবিত্রতম স্থান। মক্কার আগে, এই মসজিদের দিকে ফিরেই প্রার্থনা করা হতো। ইহুদিদের বেলায় এই  আল-আকসা মসজিদের কম্পাউন্ড টেম্পল মাউন্ট নাম পরিচিত, তাদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান। এখানেই তাদের দুটি টেম্পল ছিল, যা ধ্বংস হয়ে গেছে। এখনো শোকে জর্জরিত থাকে ধর্মপ্রাণ ইহুদিরা। তাদের বিশ্বাস শেষ টেম্পল এখানেই তৈরি হবে।

মানুষে মানুষে ধর্ম নিয়ে শত সহস্র বছরের বিবাদ-যুদ্ধ। এখনও শেষ হয়নি। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যা অনেকটা শেষ হবার নয়। ক্ষমতার যুদ্ধ চলছে প্রতিনিয়ত। জেরুজালেমের ঐতিহাসিক পুরাতন শহর এখন দেয়ালে ঘেরা। কিছু গেট আছে, অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মীরা সজাগ সব সময়। এই কম্পাউন্ড-এর  মধ্যেই আছে তিনটি ভাগ। যুইশ কোয়ার্টার, খ্রিষ্টান কোয়ার্টার আর মুসলিম কোয়ার্টার। ভেতরে আল-আকসা মসজিদও দেয়ালে ঘেরা। মসজিদের কম্পাউন্ড আছে মুসলমানদের দখলে। যে কেউ নিয়ম মেনে কম্পাউন্ড-এ ঢুকতে পারবে। শুধু মুসলমানরা ঢুকতে পারবে মসজিদের ভেতরের অংশে। কম্পাউন্ড-এর পশ্চিমের দেয়ালটা বেশ উঁচু। দেয়ালের ওপাশে ধর্মপ্রাণ ইহুদিরা দিন-রাত প্রার্থনায় ব্যস্ত। পৃথিবীটা অনেক বড়। এত ক্ষুদ্র এক জায়গায় এতগুলো ধর্মের সীমাহীন টান। 

যে কারণে তিন ধর্মের কাছেই জেরুজালেম গুরুত্বপূর্ণ

বিজ্ঞানের তথ্য অনুসারে পৃথিবীতে আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষের আবির্ভাব প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে। আফ্রিকা মহাদেশেই তখন তার অবস্থান। প্রায় ৬০ থেকে ৯০ হাজার বছর আগে খরা আর খাদ্যের সংকটেই আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে পরে কিছু মানুষ। তখন মধ্যপ্রাচ্য সবুজে ঢাকা, খাদ্যের সন্ধানেই এদিকটাতে আসা। আল-আকসা মসজিদের নির্মাণ সময় ও ইতিহাস নিয়ে আছে ভিন্নমত। প্রায় ৩৬ একর জায়গার ওপর আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্স। কমপ্লেক্সে কয়েকটা মসজিদ আছে। মূল মসজিদ আল-আকসা বা হারাম আল-শরীফ। বুরাক এবং মারওয়ানি নামেও আরো দুটি মসজিদ। এর একটি মাটির নিচে। মসজিদ ও তার আঙিনায় প্রায় ৪০০ হাজার মুসলমান একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারে। আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্সে সবচেয়ে গুরুর্ত্বপূর্ণ স্থাপনার নাম--ডোম অব দি রক (গোল্ডেন গম্বুজ), এই স্থাপনার ভেতরে ঢুকলেই দেখা যাবে খোলা পাথর। এখন থেকেই মিরাজের রাতে ইসলামের শেষ নবী বেহেশতে গমন করেন, যাওয়ার আগে এখানেই তার সঙ্গে দেখা হয় আগের সব নবীর, এখানেই তাঁর পেছনে নামাজ আদায় করেন অন্য নবীরা। পাথরের নিচেই আছে ছোট একটা গুহা। খুব অল্প কজন একসঙ্গে এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। আমাদের ভ্রমণে আমরা আল-আকসার এই ডোম অব দি রক এখানে এসেছিলাম খুব সকালে। ছোট সেই গুহায় আমি তখন একা প্রার্থনায় দাঁড়ালাম। কেউ নেই, সঙ্গে ছিল আমার স্ত্রী, শাম্মী একটু দূরে। ঘুরে ঘুরে উন্মুক্ত সেই পাথর দেখলাম। এই সেই পাথর যা তিন ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু। ইহুদিরা মনে করেন এখানেই তৈরি হয়েছিল তাদের প্রথম মন্দির, যার নির্মাতা সোলেমান (আ.), পরে তা ধ্বংস করা হয়। দ্বিতীয় মন্দির তৈরি হয় দুই হাজার বছর আগে, তৈরি করেন রাজা হেরোড দি গ্রেট। সেটাও ধ্বংস হয় যিশুর মৃত্যুর পরে। দ্বিতীয় মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ হিসেবে বাকি আছে আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্সের পশ্চিম পাশের উঁচু দেয়াল, এই দেয়ালের গোড়াতেই দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করে ধর্মপ্রাণ ইহুদিরা। আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্সকেই ইহুদিরা বলে থাকে টেম্পল মাউন্ট। ইতিহাসের পাতায় পেছনে তাকালে দেখতে পাওয়া যাবে এই মসজিদকে ঘিরেই ঘটে গেছে যুদ্ধ-বিবাদ। এখনো ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের সমস্যার কেন্দ্রে আছে আল-আকসা মসজিদ, যা টেম্পল মাউন্ট ইহুদিদের জন্য। যিশুর মৃত্যুর সাজা ঘোষণা করা হয় এই আল-আকসা মসজিদের গা ঘেঁষেই। এই ছোট শহরেই যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়। যিশুর সমাধিস্থানও এখানেই।

যিশুর মৃত্যু ঘোষণার পর তাকে ক্রুশ কাঁধে নিয়ে পথ চলতে হয়েছে। যিশুর প্রতি ঘটনা জেরুজালেমের পথে পথে মার্ক করা আছে। চার্চ তৈরি হয়েছে ঘটনাস্থলে। এর প্রতিটা স্থান আমি নিজ হাতে ছুঁয়ে এসেছি। ছুঁয়েছি যিশুর জন্মস্থান। ছুঁয়েছি তাঁর সমাধি। এই ঘটনাগুলো পৃথিবীতে ঘটে গেছে, অনেক অনেক আগে। এখন সেই জায়গায় তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টানদের সমাগম, নীরবতা আর প্রার্থনা।  চার্চের ভেতরটাকে মনে হয় এইতো গত সন্ধ্যায় যিশুকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে রক্তাক্ত ক্রুশ থেকে। যে পাথরের ওপরে ক্রুশ বসানো ছিল, সেই পাথর আমি ছুঁয়ে দেখে এসেছি। 

অপেক্ষার যখন অবসান 

আমাদের ভ্রমণ ছিল এবার ইসরায়েল-জেরুজালেম-ফিলিস্তিন। বাংলাদেশের সঙ্গে ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের কূটনীতিক সম্পর্ক নেই, দেশের পাসপোর্টে বলা আছে সব দেশে যাওয়া যাবে, শুধু ইসরায়েল নিষিদ্ধ। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে একদিন আমি দেশ ছেড়ে চলে এসেছি পশ্চিমা দেশে। বিদেশি পাসপোর্ট থাকার কারণেই আমার ইসরায়েল যাওয়ার অনুমতি আছে। অনুমতি থাকলেও এয়ারপোর্টে কিছুটা ঝামেলা হলো। ইসরায়েলি অফিসিয়ালরা মুসলিম নামের কারণে ইমিগ্রেশনে বসিয়ে রাখল সাড়ে চার ঘণ্টা। শাম্মীসহ (আমার স্ত্রী)  আমরা একসঙ্গে ভ্রমণ করেছি ৮৮টি দেশ। কোথাও এমন আচরণ দেখিনি, মেনে নিতে হয়েছে ইমিগ্রেশনে দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা।

ইসরায়েলের তেল-আবিব থেকে ট্যাক্সি করে জেরুজালেম, সময় লাগে এক ঘণ্টার একটু কম। পুরাতন জেরুজালেমের দেয়ালে ঘেরা, ঢোকার গেট আছে ৮টি। পূর্ব দিকে একটি গেট, যা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে নিরাপত্তার কারণে। সেই গেটের নাম গোল্ডেন গেট। মুসলমানদের কাছে এটা পরকালে যাওয়ার দরজা, খ্রিষ্টানরা মনে করে যিশু এখান দিয়েই প্রবেশ করেছেন। ইহুদিরা মনে করে তাদের শেষ নবী বা নেতা যে ভবিষ্যতে তাদের রক্ষা করার জন্য আসবে সে আসবে এই গেট ধরে এবং তার শেষ মন্দির তৈরি করে দেবে আল-আকসার গোল্ডেন ডোমের স্থানে যেখান থেকে ইসলামদের শেষ নবী মেরাজের রাতে গমন করেছেন।

জেরুজালেমের পুরাতন শহর মাত্র এক বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে। এরই মাঝে সব। আছে ইহুদি  খ্রিষ্টান ও মুসলিমলের অংশ। জেরুজালেমের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন ইসরাইলিদের হাতে। অলিতে-গলিতে কিছুদূর গেলেই দেখা যাই ভারি অস্ত্র হাতে ইহুদি সৈন্যরা।  আল-আকসা মসজিস কমপ্লেক্সের কন্ট্রোল জর্ডানিয়ানদের হাতে। মসজিদ প্রাঙ্গণে ঢোকার জন্যও আছে গেট। সেখানে থাকে ইহুদি ও ফিলিস্তিনের সম্মিলিত নিরাপত্তাকর্মীরা। সব গেট দিয়ে দিনের যেকোনো সময়ে মসজিদ প্রাঙ্গণে ঢোকার অনুমতি শুধু মুসলমানদের। শুধু পশ্চিমের একটি গেট যা ইহুদিদের অংশের সঙ্গে যুক্ত তা খুলে দেওয়া হয় ট্যুরিস্টদের জন্য। সীমিত সময়ের জন্য ট্যুরিস্টরা ইসলামিক নিয়মে পোশাক পরে মসজিদ প্রাঙ্গণে আসতে পারে। মসজিদের ভেতরে ঢোকা বা মসজিদ প্রাঙ্গণে অন্য ধর্মের প্রার্থনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আমাদের মুসলিম নামের কারণেই ভেতরে যাতায়াতটা ছিল সহজ। গেটে প্রশ্নের জবাব দিতে হয়। মূল উদ্দেশ্য যাচাই করে নেওয়া যারা ঢুকছে তারা মুসলমান ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছে কি না। অনেকেই মিথ্যা বলে ঢোকার চেষ্টা করে। আল-আকসা মসজিদে বা গোল্ডেন ডোমের ভেতরে ঢোকাটা ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মের মানুষের কাছে এক স্বপ্নের মতো। তাদের ইতিহাস এবং ধর্ম অনুযায়ী এই স্থান তাদের জন্যও পবিত্র। তারাও স্বপ্ন দেখে এখানে এসে প্রার্থনা করার। 

জীবনের এপারে যেকোনো কারণেই হোক, আমরা বিভক্ত। এবং আমরা সবাই সবার জায়গায় নিজস্ব সত্যকে ধারণ করে আছি। যুদ্ধ-বিবাদ ছাড়া কি বেঁচে থাকা যায়? হয়তো যায়। কিন্তু হাজারো বছরের ইতিহাসে এখনো তা ঘটেনি। ধর্মে-বিশ্বাসে সহনশীলতা প্রয়োজন। এই সহনশীলতার একমাত্র উপায় মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা যে, সব ধর্ম সমানভাবে সত্য।

প্রবা/কেবি/এমজে

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা