রাশেদ মেহেদী, স্পেনের বার্সেলোনা থেকে
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২৩:৩৭ পিএম
আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০০:১৯ এএম
‘দরিদ্রতামুক্ত বিশ্বের জন্য মানুষকে ক্ষমতায়িত করতে আগামী দিনের প্রযুক্তি উন্মোচিত হোক আজ’- স্লোগান নিয়ে সোমবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) স্পেনের বার্সেলোনায় জমকালো উদ্বোধন হয়েছে এবারের মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসের। স্পেনের রাজা ফিলিপ প্রায় দেড় লাখ মানুষের সামনে উদ্বোধন ঘোষণা করেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রেডো সানচেজও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সকাল সাড়ে ৮টায় বার্সেলোনার আকাশে ভোরের সোনা রোদ। কিন্তু দিনের তাপমাত্রা তখনও দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস। কনকনে শীত উপেক্ষা করে বিশ্বের প্রায় ২০০ দেশের দেড় লাখ প্রযুক্তিপ্রেমী তখন সমবেত শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস সেন্টারে। রাজা ফিলিপ সবাইকে স্বাগত জানান।
তিনি আগামী দিনের জন্য প্রযুক্তির মানবিক ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমাদের প্রযুক্তির সঙ্গেই এগিয়ে যেতে হবে আরও বহুদূর। উদ্ভাবক এবং সেবাদাতাদের মনে রাখতে হবে, সেই প্রযুক্তি যেন মানুষের সভ্যতাকে মানবিকতা থেকে সরিয়ে হৃদয়হীন যান্ত্রিক না করে তোলে।
স্পেনের প্রেসিডেন্টও একই আহ্বান জানিয়ে বলেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় যেখানে প্রযুক্তির ব্যবহারে মানবকল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। অনুষ্ঠানে বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ সেবাদাতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংগঠন জিএসএমএর চেয়ারম্যান হোসে মারিয়া আলভারেজ প্যালেট লোপেজসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জিএসএমএ চেয়ারম্যান বলেন, এবারের মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসের চরিত্র আগের চেয়ে একটু আলাদা, যার প্রতিফলন মূল প্রতিপাদ্যেই আছে। এবারের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে দরিদ্রতামুক্ত বিশ্ব গড়তে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা।
প্রায় ১০ হাজার প্রতিষ্ঠানের প্রদর্শনী কেন্দ্র দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে থাকলেও সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ বিশ্বের বড় বড় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্যাভিলিয়নগুলোর দিকে। স্যামসাং, জেডটিই, হুয়াওয়ে, অরেঞ্জ, টি মোবাইল, ইনটেল, মাইক্রোসফট, অ্যাপলস, এরিকসনের প্যাভিলিয়নগুলোতে বেশ ভিড়। নতুন ধরনের ডিভাইস, নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, এমনকি আগামীতে কী ধরনের প্রযুক্তি আসছে, সে বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়েছে প্রদর্শনী কেন্দ্রগুলোতে। একেকটি প্যাভিলিয়ন যেন প্রযুক্তির একেকটি পৃথক পৃথিবী। জেডটিইর প্যাভিলিয়নে বড় আকারের স্মার্ট সিটির প্রদর্শনী সবাইকে মুগ্ধ করেছে। স্যামসাংয়ের প্রদর্শনী কেন্দ্রে কীভাবে তৈরি হয়েছে সর্বশেষ মডেলের স্মার্টফোন এস টোয়েন্টি-৩, তার পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া দেখানো হয়েছে। ইনটেল দেখিয়েছে আগামী প্রজন্মের কম্পিউটারের সম্ভাব্য প্রসেসর। অরেঞ্জ দেখিয়েছে অদূর ভবিষ্যতের স্মার্ট প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের আবেগ কীভাবে মিশে যাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জাদুস্পর্শে।
এবারের আয়োজনের আরও একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, আগামী দিনে যে স্মার্ট প্রযুক্তির দুনিয়া গড়ে তোলা হবে, তার একটি রূপরেখা ‘ভেলোসিটি’র সংযোজন। ভেলোসিটি হচ্ছে বিশ্বের প্রযুক্তি উদ্ভাবক এবং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সমন্বিত উদ্যোগ। যার উদ্যোক্তারা এবারের মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসের মূল আয়োজকের ভূমিকায় রয়েছেন। ভেলোসিটি উদ্যোগের মূল বক্তব্য হচ্ছে, চলতি বছরের শেষেই প্রায় ১০০ কোটি মানুষ যুক্ত হবে ফাইভজিতে। আগামী বছর থেকে দেশে দেশে দ্রুত দৃশ্যমান হবে স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার। কোনো দেশই যেন সেই এগিয়ে যাওয়ার পথে পিছিয়ে না থাকে, সেটাই নিশ্চিত হবে ভেলোসিটি উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। দেশে দেশে ভাষা, ঐতিহ্য, জাতিগত ভেদাভেদ থাকলেও স্মার্ট মানুষের চিন্তা, অনুভূতির ভেতরে যেন ঐকতান থাকে, স্মার্ট সিটিগুলোর চেহারায় যেন একই বিন্যাসের প্রতিফলন ঘটে, সেটাই নিশ্চিত হবে ভেলোসিটি উদ্যোগের মাধ্যমে। এজন্য মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস চত্বরে ভেলোসিটি উদ্যোগের কর্মীরা কংগ্রেসে অংশ নেওয়া প্রায় সবার কাছে যাচ্ছেন অনুদান সংগ্রহের জন্য। এই অনুদানের মাধ্যমে আগামী দিনে গৃহহীন মানুষকেও প্রযুক্তির উদ্যোক্তার ভূকিায় সম্পৃক্ত করা হবে।
এ ধরনের উদ্যোগ এখন নিছক কল্পনা মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে যুগ যুগ ধরে মানুষ তার উদ্ভাবনী চিন্তা দিয়ে স্বপ্ন দেখেছে, কল্পনা করেছে। সেই কল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে এসেছে। যেমন মানুষ পাখির মতো ওড়ার স্বপ্ন থেকে আবিষ্কার করেছে উড়োজাহাজ, চাঁদের বুড়ির গল্প শোনার দিনকে নতুন এক পৃথিবীর বাস্তবতায় বদলে দিয়েছে চাঁদের মাটিতে পা রেখে। সেভাবেই হয়তো আজকের ভেলোসিটি উদ্যোগ বাস্তবে রূপ নেবে। যেদিন নতুন ঐকতানে গড়ে উঠবে অভিন্ন চেহারার মানবিক স্মার্ট পৃথিবী।