× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাংলাদেশিদের রাজত্ব বাংলা কি-বোর্ডে

রাশেদ মেহেদী

প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০৮:৩৪ এএম

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০৯:২৭ এএম

বাংলাদেশিদের রাজত্ব বাংলা কি-বোর্ডে

ডিজিটাল দুনিয়ায় রাজত্ব করছে বাংলাদেশি উদ্ভাবকদের তৈরি বাংলা কি-বোর্ড। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের ব্যক্তিগত কম্পিউটারে, ছাপাখানায় একচ্ছত্র আধিপত্য বর্তমান ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার উদ্ভাবিত বিজয় কি-বোর্ডের। আর অনলাইনে বিশেষ করে সার্চ ইঞ্জিন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে আরেক বাংলাদেশি মেহেদী হাসান খান উদ্ভাবিত অভ্র। স্মার্টফোনে রাজত্ব করছে তরুণ বাংলাদেশি প্রকৌশলী শামীম হাসনাত উদ্ভাবিত রিদমিক কি-বোর্ড। রিদমিক মূলত অভ্র কি-বোর্ডের অ্যানড্রয়েড সংস্করণ। এ ছাড়া, গুগল প্লে স্টোর এবং অ্যাপল স্টোরে আরও রয়েছে ১৬টি বাংলা কি-বোর্ড। তবে বিজয়, অভ্র আর রিদমিক কি-বোর্ড ছাড়া বাকিগুলোর ব্যবহার কম। এ মুহূর্তে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত  কি-বোর্ড গুগলের জি কি-বোর্ড। বিশ্বের প্রায় ১৫০টি ভাষাকে সমন্বিত করে তৈরি হয়েছে এ কি-বোর্ড, যার মধ্যে বাংলাও আছে। এটি বিশ্বে এখন পর্যন্ত ৫০০ কোটির বেশি ডাউনলোড হয়েছে। তারপরও বাংলাদেশি উদ্ভাবকদের তৈরি করা কি-বোর্ড ব্যবহারের দিক থেকে জি কি-বোর্ডের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই চলছে।

ডিজিটাল যন্ত্রে সবচেয়ে কার্যকর বিজয়

বাংলাদেশে গত প্রায় দুই যুগ ধরে ব্যবহৃত কম্পিউটারের ৯০ শতাংশই চলছে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে। উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের ব্যক্তিগত কম্পিউটারে প্রায় ৮৫ শতাংশ ব্যবহৃত হয় বিজয়। আর ছাপাখানার জন্য ব্যবহৃত কম্পিউটারে বিজয়ের ব্যবহার প্রায় শতভাগ। ১৯৮৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় কি-বোর্ডের প্রথম সংস্করণ এসেছিল মূলত সে সময়ে প্রচলিত অ্যাপলের ম্যাকিন্টোস অপারেটিং সিস্টেমের কম্পিউটারের জন্য। এরপর ১৯৯২ সালে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের কম্পিউটার বাংলাদেশে প্রবেশ করার এক বছরেরও কম সময়ে ১৯৯৩ সালের শুরুতেই বাজারে আসে বিজয় কি-বোর্ডের উইন্ডোজ ভার্সন। ফলে বাংলাদেশে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের ব্যবহারের যত বয়স, ঠিক তার সমান বয়স বিজয় ব্যবহারেরও।

বিজয় একমাত্র বাংলা কি-বোর্ড, যার সুতন্নি এমজেতে আছে ১১৮টি ফন্ট। যা দিয়ে খুব দ্রুতগতিতে এবং সহজে কম্পিউটারে বাংলা লেখা যায়। যুক্তাক্ষর লিখতেও কোনো সমস্যা হয় না। আবার বিজয়ে ১১৮টি স্বতন্ত্র ফন্ট এবং টাইপোগ্রাফি থাকার কারণে সাইনবোর্ড লেখার ক্ষেত্রে ইউনিকোড ব্যবহার করা যায় না। ফলে অভ্র সাইনবোর্ড লেখার ক্ষেত্রে ব্যবহার করাও সম্ভব হয় না, ব্যবহৃত হয় শুধু বিজয়। বই বা পত্রিকা ছাপার জন্য বিজয় কিংবা বিজয়ের অনুকরণে তৈরি পত্রিকাগুলোর নিজস্ব ফন্ট ব্যবহার করতে হয় দ্রুতগতিতে অনেক শব্দ লেখার জন্য। কারণ, ইউনিকোডে দ্রুতগতিতে লেখা কঠিন। ২০০৯ সাল থেকে বিজয় বায়ান্ন সংস্করণে ইউনিকোডও যুক্ত হয় এবং একমাত্র বিজয় ইউনিকোডেই আছে ১১৮টি ফন্ট ব্যবহারের সুযোগ। যে কারণে বিজয়ে লিখতে অভ্যস্ত কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের কাছে ইউনিকোডেও বিজয় সমান জনপ্রিয়। 

বিজয় সম্পর্কে এর উদ্ভাবক মোস্তাফা জব্বার বলেন, আসলে যন্ত্রে বাংলা লেখার জন্য প্রথমে লে-আউট তৈরি করেছিলেন মুনীর চৌধুরী, যার নাম ছিল অপটিমা মুনীর। কিন্তু তিনি তৈরি করেছিলেন টাইপরাইটারের জন্য, যেটা অ্যানালগ যন্ত্র। ডিজিটাল যন্ত্র হিসেবে কম্পিউটার চলে আসায় মুনীর অপটিমা সেখানে ব্যবহারের সুযোগ থাকল না। প্রয়োজন হলো, ডিজিটাল কম্পিউটারে ব্যবহার উপযোগী বাংলা লেখার একটি সফটওয়্যার এবং লে-আউট। মুনীর অপটিমা অ্যানালগ টাইপরাইটারের উপযোগী হওয়ার কারণে সেখানে ইংরেজি কি-বোর্ডের ২৬ বোতামে বাংলা লেখা ছিল কষ্টকর। ৫২টি বোতামের প্রয়োজন হয়, আর যুক্ত অক্ষর প্রায় লেখাই যেত না। কারণ, সিসার হরফে যে লেখা হতো, সেখানে ৪৫৪টি অক্ষর ছিল যুক্তাক্ষর লেখার জন্য। আর ডিজিটাল যন্ত্রে লেখার ক্ষেত্রে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জটাই দূর করে বিজয়। কারণ, বিজয়ে ২৬ বোতামেই সবগুলো বাংলা অক্ষরে লেখা সম্ভব হলো সব ধরনের যুক্তাক্ষরসহ। ফলে, কম্পিউটারে বাংলা লেখার গতি বহু গুণ বেড়ে গেল। এখনও দ্রুতগতিতে বেশি শব্দ লেখার জন্য বিজয়ের বিকল্প নেই। 

বইমেলায় যত বই দেখা যায় সেটা কোনো না কোনোভাবে বিজয়ের কোনো ফন্টেই। বিজয় উদ্ভাবনের সময় ইউনিকোড কেন করেননি জানতে চাইলে মোস্তাফা জব্বার বলেন, ১৯৮৮ সালে যখন বিজয় আসে, তখন অনলাইনে আজকের মতো লেখার প্রচলন ছিল না, স্মার্টফোনও ছিল না। এ ছাড়া বাংলাদেশ সে সময়ে অ্যাপল পরিচালিত ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামেও যোগ দেয়নি। বরং সম্প্রতি বাংলাদেশ এ কনসোর্টিয়ামে যোগ দিয়েছে। ফলে এখন পর্যন্ত ইউনিকোডে বাংলা ফন্টের কোনো বিশেষত্ব নেই। খেয়াল করলে দেখা যাবে, গুগলের কোনো অ্যাপ্লিকেশন সেটা জিমেইল কিংবা ব্রাউজার হোক না কেন, কিংবা মেসেঞ্জারে বা হোয়াটসঅ্যাপে লিখতে গেলে একটা ডিফল্ট ফন্টেই লিখতে হয়। ওয়ার্ড ফাইলে লেখার ক্ষেত্রে কিছু ফন্ট আছে কিন্তু অনলাইনে ডিফল্ট ফন্টের বাইরে বাংলা লেখার সুযোগ নেই। ইউনিকোডে বাংলা ফন্ট উন্নয়নের জন্য সত্যিকার অর্থে এখন পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি। বরং যারা বিজয় ইউনিকোড ব্যবহার করেন তারাই শুধু কম্পিউটারে এবং স্মার্টফোনেও বিজয়ের সেই ১১৮টি ফন্ট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন।

 অভ্র দিয়ে শুরু অনলাইনে বাংলা লেখার নতুন যাত্রা

অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জনপ্রিয় হতে থাকলে বাংলায় লেখার জন্য প্রয়োজন হয় ইউনিকোডের। সেই প্রয়োজন থেকেই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ছাত্র মেহেদী হাসান খান ২০০৩ সালের ২৬ মার্চ ইংরেজি হরফে বাংলা লেখার  কি-বোর্ড অভ্র সফটওয়্যার প্রদর্শন করেন। এই  কি-বোর্ডে ইংরেজি হরফে বাংলা শব্দ বানান করে লিখলে সেটা বাংলায় দেখা যায়। যারা অনলাইনে চ্যাট করতে চান, সার্চ ইঞ্জিনে কিছু একটা লিখে সার্চ করতে চান, তাদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয় অভ্র।

অভ্র উদ্ভাবনের একটি গল্প প্রচলিত আছে। গল্পটি হচ্ছে, ২০০৩ সালের বইমেলায় ‘বাংলা ইনভেনশন থ্রু ওপেন সোর্স’ বা বায়োস নামের একটি সংগঠন বাংলা লিনাক্স নামে একটি প্রযুক্তির প্রদর্শন করে। এই প্রযুক্তিতে কম্পিউটারে মেনু, ফোল্ডার এবং ফাইলের নাম বাংলায় লেখা যায়। সেই বাংলা লিনাক্স দেখে মুগ্ধ হন সে সময়ে ১৮ বছর বয়সী মেহেদী হাসান খান। পরে অনলাইনে স্বচ্ছন্দে বাংলা লেখা যায়, এমন একটি সফটওয়্যার এবং কি-বোর্ড তৈরির কাজ শুরু করেন। 

২০০৭ সালে মেহেদী হাসান খানের ওমিক্রন ল্যাব থেকে অভ্র সফটওয়্যারের বহনযোগ্য ও মুক্তভাবে ব্যবহারযোগ্য সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। ২০০৭ সালে যখন অভ্র প্রথম আসে তখন সেখানে লে-আউট হিসেবে বিজয়ের হুবহু আদলে ইউনিজয় ব্যবহার করা হয়। যেহেতু বিজয়ের পেটেন্ট ছিল এর উদ্ভাবক মোস্তাফা জব্বারের, সে কারণে তিনি গুগলের কাছে কপিরাইট ইস্যুকে অভ্র সফটওয়্যারে বিজয় লে-আউট ব্যবহারের আপত্তি জানান। পরে গুগল এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিলে অভ্র থেকে ইউনিজয় সরিয়ে জাতীয় এবং প্রভাত নামে দুটি লে-আউট যুক্ত করা হয়। তবে যে জাতীয় লে-আউটটি বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল থেকে করা হয়েছে, সেটিও মূলত বিজয়েরই লে-আউট। শুধু দুটি হরফে দুটি বোতামে স্থানান্তরের মাধ্যমে বাকিটা হুবহু বিজয়ের লে-আউটই রাখা হয়েছে। বর্তমানে অনলাইনে লেখার জন্য অভ্র খুবই জনপ্রিয়। কম্পিউটার থেকে অনলাইনে লেখার জন্য যতটা না, তার বেশি অভ্র ব্যবহৃত হয় স্মার্টফোনে। তবে স্মার্টফোনে অভ্রকে জনপ্রিয় করেছেন আরেক বাংলাদেশি প্রকৌশলী শামীম হাসনাত।

স্মার্টফোন দুনিয়ায় বাংলার নীরব বিপ্লব ‘রিদমিক’

শামীম হাসনাত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র। তিনি ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রিদমিক ল্যাব। প্রথম থেকেই রিদমিক ল্যাব থেকে যে অ্যানড্রয়েড স্মার্টফোনের জন্য নির্মিত রিদমিক  কি-বোর্ড অ্যানড্রয়েড ব্যবহারকারীদের কাছে জনপ্রিয় হতে শুরু করে। রিদমিক মূলত অভ্র সফটওয়্যারের অ্যানড্রয়েড ভার্সন। শুরুতে বিজয় কি-বোর্ড লে-আউটের আদলে ইউনিয়জয় লে-আউট থাকলেও এখন রিদমিকে সেটা নেই। বরং তার পরিবর্তে জাতীয় এবং প্রভাতই দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে রিদমিক কি-বোর্ড ঘিরে। এটাও বলা যায়, অভ্রকে জনপ্রিয় করেছে মূলত রিদমিক অ্যাপটিই। ২০১৮ সাল থেকে রিদমিক ল্যাব কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করে।

রিদমিক ল্যাবের সিইও শামীম হাসনাত প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, বর্তমানে রিদমিক মোট ইনস্টল করেছেন ১১ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী। আর প্রতি মাসে অ্যাকটিভ ইউজার সাড়ে চার কোটি। তিনি জানান, রিদমিক শুধু স্মার্টফোনের জন্যেই ব্যবহৃত হচ্ছে। উইন্ডোজের জন্য তারা রিদমিক করছেন না, কারণ সেখানে অভ্র বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে।

শামীম হাসনাত বলেন, রিদমিক কি-বোর্ডে সময়ের প্রয়োজনে অনেক নতুন নতুন ফিচার যুক্ত হচ্ছে। গুগলের জি কি-বোর্ডের মতোই ভয়েস থেকে টেক্সট লেখার সুবিধা এখন রিদমিকেও আছে। বাংলোদেশের কি-বোর্ডগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে বাংলাদেশের উদ্ভাবকদের তৈরি বলে অনেকে আমাদের কি-বোর্ডের নিরাপত্তার বিষয়ে সন্দেহ করেন। কিন্তু সত্য হচ্ছে কোনো কি-বোর্ডে লেখার সময় যদি তথ্য চুরি হতে থাকে তাহলে সেটা এখনকার প্রযুক্তিতে সহজেই বোঝা যায়। রিদমিক শতভাগ নিরাপদ কি-বোর্ড।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা