প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
৮০০ মিটার গভীরতায় জেলিফিশ খাচ্ছে একটি স্ত্রী অক্টোপাস। এই প্রজাতিটিকে জীবিত অবস্থায় খুব কমই দেখা যায়। ছবি: স্মিট ওসান ইনস্টিটিউট
ব্রাজিলের উপকূলসংলগ্ন আন্তর্জাতিক জলসীমায় মাত্র দুই সপ্তাহে ৩১টি নতুন প্রজাতির প্রাণীর সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা।
বাহিয়ার সালভাদর বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে গবেষকেরা সমুদ্রের মিডওয়াটার বা মধ্যবর্তী জলস্তর নিয়ে গবেষণা করেন। এটি সমুদ্রতল ও সূর্যালোক পৌঁছানো ওপরের স্তরের মাঝামাঝি অঞ্চল। গবেষকরা জানান, পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ প্রাণীই এই স্তরে অবস্থিত।
৩৬ কোটি ৮০ লাখ ডলারের এই প্রকল্পে ৯০০-এর বেশি যন্ত্রের মাধ্যমে সমুদ্রের স্বাস্থ্য, স্রোতের ধরণ, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
অভিযানে আবিষ্কৃত নতুন প্রজাতির মধ্যে রয়েছে- একটি অ্যাম্ফিপড (কাঁকড়া ও লবস্টারের আত্মীয় এক ধরনের ক্রাস্টেশিয়ান), একটি দ্রুতগতির গসামার কৃমি, ৯টি নতুন জেলিফিশ, সাতটি সাইফোনোফোর (জেলিফিশ ও প্রবালের আত্মীয় উপনিবেশ গঠনকারী প্রাণী), সাতটি কম্ব জেলি বা সিটেনোফোর, চারটি লারভেসিয়ান (ব্যাঙাচির মতো দেখতে, শ্লেষ্মার তৈরি আবাসে বসবাসকারী প্রাণী) এবং দুটি বিশালাকার রাইজেরিয়ান- যেগুলো এককোষী হলেও খালি চোখে দেখা যায়।
দক্ষিণ আটলান্টিকের ৭৭৯ মিটার গভীরে আবিষ্কৃত একটি অপরিণত গ্লাস স্কুইড। ছবি: স্মিট ওসান ইনস্টিটিউট
এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের তৈরি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। প্রথমবারের মতো একটি গবেষণা জাহাজেই জীবন্ত অণুজীবের ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) কোষীয় গঠন সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। এ প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্কুইড’।
যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল ও জাপানের অন্তত ২৪ জন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ফ্যালকর (টু) নামের গবেষণা জাহাজে এই অভিযান পরিচালনা করেন।
জাহাজটি পরিচালনা করে স্মিট ওসান ইনস্টিটিউট এবং অভিযানে সহযোগিতা করে ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়াসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
অভিযানের প্রধান বিজ্ঞানী, ড. কারেন ওসবর্ন বলেন, “এটি ছিল ভীষণ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। সমুদ্রের মধ্যবর্তী স্তর অসংখ্য বিস্ময়কর প্রাণীতে ভরপুর, যাদের সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি। যেহেতু এই অঞ্চল আগে কখনো অনুসন্ধান করা হয়নি, তাই নতুন প্রজাতি পাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল অনেক বেশি। এত অল্প সময়ে এত নতুন প্রাণীর সন্ধান পাওয়া সম্ভবত একটি রেকর্ড।”
এই অভিযানের অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত সাফল্য ছিল জাহাজেই স্পিনিং-হুইল কনফোকাল মাইক্রোস্কোপ বা ‘স্কুইড’-এর ব্যবহার। লেজারের সাহায্যে এটি অণুজীবের সূক্ষ্ম গঠন বিশ্লেষণ করতে পারে।
একটি টেনোফোরকে শিকার করে সলমিসাস বা ডিনার প্লেট জেলিফিশ। ছবি: স্মিট ওসান ইনস্টিটিউট
ওসবর্ন বলেন, “এটি গবেষণার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আমরা জীবন্ত অবস্থায় কোষগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগ, উপাদান বিনিময় এবং কঙ্কাল গঠনের প্রক্রিয়া দেখতে পেরেছি। সাধারণত এসব দেখতে নমুনা প্রস্তুত করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে, কিন্তু এবার জাহাজেই তা সম্ভব হয়েছে।”
গবেষকেরা আরও ব্যবহার করেন পরীক্ষামূলক চিত্রায়ন প্রযুক্তি, জিনগত বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন শ্রেণিবিন্যাস বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল, যার মাধ্যমে দ্রুত নতুন প্রজাতি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
এই আবিষ্কার সমুদ্রে জীববৈচিত্র্যের বিস্তৃতি সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করবে। ওসবর্ন বলেন, “আমি বিষয়টিকে একটি স্তরযুক্ত কেকের সঙ্গে তুলনা করি। একই গভীরতায় জাপান ও ক্যালিফোর্নিয়ার মতো দূরবর্তী অঞ্চলেও প্রায় একই ধরনের প্রাণী পাওয়া যায়।”
তবে দিনের বেলায় গভীর সমুদ্রে লুকিয়ে থাকা প্রাণীগুলো অন্ধকারে খাবারের সন্ধানে ওপরের স্তরে উঠে আসে। এই চলাচল সমুদ্রের মাধ্যমে কার্বন শোষণ ও সংরক্ষণের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ওসবর্নের মতে, সর্বশেষ এই অভিযান আবারও প্রমাণ করেছে যে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা এবং সমুদ্র সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানার প্রচেষ্টা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, “এ ধরনের গবেষণা আমাদের আরও অনেক বেশি করা উচিত। নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়গুলো বোঝার জন্য অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন দলের বিজ্ঞানীদের একত্রিত করা প্রয়োজন।”
তার ভাষায়, “মানুষ এখন পর্যন্ত যা আবিষ্কার করেছে, তা আসলে হিমশৈলের চূড়ামাত্র। সমুদ্রে অসংখ্য প্রাণ রয়েছে, যারা টিকে থাকার নানা বিস্ময়কর কৌশল উদ্ভাবন করেছে। আমরা যত তাদের সম্পর্কে জানব, ততই নতুন নতুন শিক্ষা লাভ করতে পারব।”
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান