বিদেশ নয়, দেশেই স্বপ্নপূরণ
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২৫ ১৪:২১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা যখন দ্রুত বাড়ছে, তখন মালিবাগের তরুণ ফুজায়েল আহমেদের গল্পটি অন্যসব গল্প থেকে আলাদা। হাতে ছিল অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পড়াশোনার অফার লেটার, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যও ছিল যথেষ্ট। বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল ছেলে যেন বিদেশে গিয়ে ভালো কিছু করে আসে। কিন্তু ফুজায়েলের মনে তখন অন্য চিন্তা- বিদেশ নয়, নিজের দেশে থেকেই নিজ যোগ্যতায় কিছু গড়ে তুলবেন তিনি। বাবার টাকায় বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা নয়; নিজের দাঁড়াবার শক্তিটিই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই সিদ্ধান্তই পরে জন্ম দেয় নেক্সটজেন টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের মতো এক প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের।
গল্পের শুরুটা খুব সাধারণ- আইইএলটিএসের বই কিনতে নীলক্ষেতে যাওয়ার সময় বাবার টাকায় নির্ভরশীল হওয়ায় মন খারাপ হয়ে যায় তার। এরপর আসে ২০২০ সালের দীর্ঘ লকডাউন, যে সময়টি ফুজায়েলের জীবনে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে জানতে পারেন সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে। পরিবারকে না জানিয়ে ঝুঁকি নিয়ে ৪৫০ ডলার দিয়ে ভর্তি হন এক আইরিশ প্রশিক্ষকের অনলাইন কোর্সে। শুরুতেই উচ্চারণ বোঝার সমস্যা, তাত্ত্বিক ক্লাসের জটিলতা- সব মিলিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। প্রায় এক মাস ক্লাস বন্ধ রাখলেও সেই বড় ভাইয়ের তিরস্কার তাকে আবার ফিরিয়ে আনে। এবার ব্যবহারিক ক্লাসগুলো তার আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, তাকে এগিয়ে যেতে শেখায়।
ধীরে ধীরে শিখে ফেলেন কনটেন্ট রাইটিং, পোস্টার ও ব্যানার ডিজাইনসহ ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের নানা দিক। প্রথম আয় আসে একটি ব্যানার ডিজাইনের কাজ থেকে- মাত্র ৫০০ টাকা। এই সামান্য আয়ই তাকে নতুন লক্ষ্য দেখিয়ে দেয়। নিজের কাজ সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করতে শুরু করলে মানুষ তাকে লক্ষ্য করতে থাকে। চার মাসেই আয় করেন প্রায় ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু অর্থই ছিল না তার লক্ষ্য; তিনি দেখতে পেলেন দেশের তরুণদের দক্ষতার ঘাটতি অনেক, ফ্রিল্যান্সিং কী বা ডিজিটাল স্কিল দিয়ে আয় করা যায়, অনেকেই জানে না। এমনকি নিজের পরিবারকেও বিষয়টি বোঝাতে সময় লেগেছে তার।
নেটওয়ার্ক বাড়াতে তিনি যোগ দেন ব্র্যান্ড প্রোমোটার হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠানে। সেখানে কাজ করতে করতেই মাথায় আসে বড় একটি ভাবনা, দেশের তরুণদের স্কিলড করে তোলা, তাদের ভাষাগত দুর্বলতা দূর করা এবং প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় নেক্সটজেন টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট। ২০২২ সালে মালিবাগে শুরু হয় নেক্সটজেনের পথচলা। শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না, কিন্তু ফুজায়েলের শুরু থেকেই লক্ষ্য ছিল- কোর্সগুলো নিয়মিত আপডেটেড রাখা। কারণ তথ্যপ্রযুক্তি খাত প্রতিনিয়ত বদলায়; আজ শিখলে কালই সেটা পুরনো হয়ে যেতে পারে।
নেক্সটজেনের মূল ফোকাস এখন ডেটা-ড্রিভেন মার্কেটিং, এআই-সংশ্লিষ্ট দক্ষতা এবং নতুন প্রজন্মের ডিজিটাল উদ্ভাবন। শুরুতে প্রতি মাসে যেখানে মাত্র ৪০-৫০ জন প্রশিক্ষণার্থী ছিল, সেখানে ২০২২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত তিন বছরে প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী দক্ষতা অর্জন করেছে এখান থেকে। বর্তমানে প্রতি মাসে ছয়টি ব্যাচে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। এই ধারাবাহিকতা নেক্সটজেনকে দেশের দ্রুতবর্ধনশীল প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের একটিতে পরিণত করেছে। প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছেন।
ফুজায়েল খুব গর্ব করেই জানালেন, তার প্রতিষ্ঠান থেকে কোর্স করে অনেকেই বিভিন্ন এজেন্সির মালিক হয়েছেন, কেউবা নিজেই নিজের প্রতিষ্ঠান খুলেছেন, কেউ আবার কোর্স সেল করেন। তার কথা হলো, ‘আমার এখানে কোর্স করে অনেকেই মাসে ৩০-৪৫ লাখ টাকা আয় করে। আবার এমনও আছে যে কি না মাসে কোনো টাকাই আয় করে না। অথচ তারা পড়েছে একসঙ্গেই। সুতরাং জীবনে কিছু করার জন্য দুইটা জিনিস খুব দরকার, প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর দক্ষতা।’
নিজের বিদেশযাত্রা স্থগিত করে দেশের মাটিতে সাধারণ ভাবনা থেকে শুরু হওয়া ফুজায়েলের এই যাত্রা আজ বহু তরুণের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।