চলমান বিজ্ঞাপন
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৫ ১৫:৪২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় এক ধরনের বিজ্ঞাপন মাধ্যম এখন সবার দৃষ্টি কাড়ছে- শরীরে স্ক্রিন বয়ে বেড়ানো মানুষ, যারা শহরময় ঘুরে ঘুরে পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের প্রচার করছেন। ‘হিউম্যান বিলবোর্ড’ নামের এই অভিনব সেবাটি চালু করেছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ‘স্মার্ট স্ক্রিন ডিজিটাল’-এর প্রতিষ্ঠাতা নেওয়াজ আকবর হোসাইন।
বিকাল বা সন্ধ্যার আগে আগে রাজধানীর অভিজাত ও জনবহুল এলাকায় দেখা যায় একদল তরুণকেÑ পিঠে ব্যাকপ্যাকের মতো একটি যন্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেখানে যুক্ত রয়েছে ডিজিটাল স্ক্রিন। একই পোশাকে সাজানো এই তরুণরা হাঁটতে হাঁটতে প্রদর্শন করেন বিজ্ঞাপন, যা শহরের পথচারীদের নজরকাড়ে। ট্রাফিক সিগন্যাল, শপিং মল, বাসস্ট্যান্ড বা রেলস্টেশনের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তারা প্রচার করেন নানা প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবা।
ডিজিটাল যুগে পুরনো ধারণার নতুন রূপ
মানুষের শরীরে বিজ্ঞাপন বহনের ধারণা নতুন নয়। ১৯ শতকে লন্ডনে ‘হিউম্যান বিলবোর্ড’ নামে এই পদ্ধতির বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়েছিল। এখন সেই প্রচারণাই আধুনিক রূপে ফিরে এসেছে ডিজিটাল স্ক্রিনের মাধ্যমে। উন্নত দেশগুলোতে এটি বেশ জনপ্রিয় আর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সেটি বাস্তবায়ন করেছেন নেওয়াজ আকবর হোসাইন।
দুবাইয়ের রাস্তায় এমন সেবা দেখে নেওয়াজের মাথায় আসে ধারণাটি। দেশের বিজ্ঞাপন শিল্পে এর সম্ভাবনা যাচাই করতে তিনি প্রায় এক বছর গবেষণা করেন। এর পর নিজস্ব প্রযুক্তিতে যন্ত্রপাতি তৈরি করে এ বছরের শুরুতে শুরু করেন ‘স্মার্ট স্ক্রিন ডিজিটাল’-এর কার্যক্রম।
নেওয়াজ বলেন, ‘কোরিয়া, জাপান আর দুবাইয়ে এই সেবাটি খুব প্রচলিত। সেখানে কাজ করছেন অনেক বাংলাদেশি ও ভারতীয় তরুণ। তখন ভাবলাম, আমরা নিজের দেশে কেন শুরু করতে পারব না? সেই চিন্তা থেকেই উদ্যোগটি নিই।’
বাড়ছে সাড়া ও আগ্রহ
প্রতিষ্ঠানটির সেলস ও মার্কেটিং বিভাগের দায়িত্বে থাকা ঐশিকা জয়া জানান, মাসে ভালো পরিমাণ অর্ডার পাচ্ছেন তারা। তিনি বলেন, ‘সবাই চায় তাদের পণ্যটিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে। আমরা সেই কাজটাই করছি সবচেয়ে আকর্ষণীয়ভাবে।’ প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে এই প্রচারণা। প্রায় ১৫ জনের দল শহরের বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকায়Ñ গুলশান, বনানী, তেজগাঁও, সীমান্ত স্কয়ার, ধানমন্ডি ২৭ এবং রবীন্দ্র সরোবর লেকে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কাজ করে। ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী সেবা পুরোপুরি কাস্টমাইজ করা যায়Ñ কোথায়, কতক্ষণ, কতজন কর্মী থাকবেন এমনকি পোশাকের ধরনও নির্ধারণ করতে পারেন গ্রাহকরা।
বর্তমানে তাদের রয়েছে প্রায় ৩০টি ডিজিটাল ব্যাকপ্যাক, যেগুলোতে শক্তিশালী ব্যাটারি ও নিজস্বভাবে তৈরি ইলেকট্রনিক উপকরণ ব্যবহৃত হয়েছে। টেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার সানাউল্লাহ শাওন বলেন, ‘আমরা পুরো প্রযুক্তিটাই নিজেরা তৈরি করেছি, ফলে কোনো সমস্যা হলে তা নিজেরাই ঠিক করতে পারি।’
প্রতিটি দলে একজন টিম লিডার থাকেন, যিনি প্রচারণা পরিচালনা করেন। শুধু বিজ্ঞাপন প্রদর্শন নয়, দলীয় সদস্যরা পথচারীদের সঙ্গে কথা বলে পণ্য সম্পর্কে ধারণাও দেন। এতে বিজ্ঞাপনদাতারা পান ‘ওয়ার্ড অব মাউথ’ মার্কেটিংয়ের বাড়তি সুবিধা, যা প্রচলিত বিলবোর্ডের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।
খরচ ও সেবার ধরন
গ্রাহকের জন্য রয়েছে দুটি অপশনÑ ‘শেয়ারড’ এবং ‘ডেডিকেটেড’ সেবা। শেয়ারড বিজ্ঞাপনে একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রচার একসঙ্গে চলে আর ডেডিকেটেড সেবায় শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হয়।
নেওয়াজ আকবর বলেন, ‘একটি স্ক্রিন এক সপ্তাহ ব্যবহার করতে খরচ হয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। সময় ও স্ক্রিনের সংখ্যা বাড়লে খরচ কমে যায়। কাস্টম সেবার ক্ষেত্রে দরদাম আলোচনা করা যায়।’
তার মতে, ‘আমাদের সেবা প্রচলিত বিলবোর্ডের তুলনায় প্রায় অর্ধেক খরচে পাওয়া যায়, কিন্তু প্রভাব অন্তত তিনগুণ বেশি। কারণ আমাদের স্ক্রিন স্থির নয়, শহরজুড়ে ঘুরে বেড়ায়।’
কর্মীদের জন্য বাড়তি সুযোগ
টিম লিডার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসাইন বলেন, ‘আমরা পাঠাও, তাণ্ডব মুভির ট্রেইলার, চরকির বিভিন্ন ক্যাম্পেইনসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের কাজ করেছি। এখন কাজের পরিমাণও বাড়ছে।’
বিল্লাল বলেন, ‘যখন আমরা রাস্তায় থাকি, সবাই আগ্রহ নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকায়। অনেকে এসে জানতে চান, এটা কীভাবে কাজ করে।’ তিনি নিজে দিনের বেলায় অন্য চাকরি করেন, আর সন্ধ্যায় এই পার্টটাইম কাজ করে বাড়তি আয় করেন।
বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রক্রিয়া
ঐশিকা জয়া জানান, অনলাইনে বা মাঠপর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন নেওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘আমরা ক্লায়েন্টের পণ্য প্রচারের পাশাপাশি নিজেদের প্রচারণাও চালাই।’
বিজ্ঞাপন দিতে হলে নির্দিষ্ট আকারের ভিডিও বা রিলস জমা দিতে হয়, তবে স্থির ছবিতেও প্রচারণা সম্ভব। ডিজিটাল স্ক্রিন হওয়ায় যেকোনো ভিজুয়াল কনটেন্ট সহজে প্রদর্শন করা যায়।
‘স্মার্ট স্ক্রিন ডিজিটাল’-এর কার্যালয় তেজগাঁওয়ের নাবিস্কো রোডে। তাদের একটি সক্রিয় ফেসবুক পেজ আছে, যার মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ করা যায়। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন স্থানে কাজ করা প্রচারণা দলের সঙ্গেও যোগাযোগ সম্ভব।