মুহিন তপু
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৬:৪৮ পিএম
আপনার ল্যাপটপ বা কম্পিউটার কি দিন দিন স্লো হয়ে যাচ্ছে? কাজের মাঝে বারবার আটকে যাওয়া বা হ্যাং করার সমস্যা? এর মূল কারণ হলো সিস্টেমে জমে থাকা জাঙ্ক ফাইল এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে অতিরিক্ত প্রোগ্রামের দৌড়াদৌড়ি। অনেকে মনে করেন একমাত্র নতুন ডিভাইস কিনলেই এই সমস্যার সমাধান হবে, কিন্তু তা পুরোপুরি ঠিক নয়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্মার্ট কৌশল অবলম্বন করে আপনি আপনার ডিভাইসের হারানো গতি অনেকটাই ফিরিয়ে আনতে পারেন।টেম্পোরারি ফাইল সরানো, স্টার্টআপ প্রোগ্রাম নিয়ন্ত্রণ করা এবং ব্রাউজার অপটিমাইজেশনের মতো সহজ কিছু টিপস অনুসরণ করে যেভাবে আপনার পুরনো কম্পিউটারের গতি বাড়াতে পারবেন, কার্যকর পদ্ধতিগুলো ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো এই ফিচারে। লিখেছেন মুহিন তপু।
জাঙ্ক ফাইল সরিয়ে স্টোরেজ পরিষ্কার করুন
অপারেটিং সিস্টেম (OS) এবং বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহারের সময় অসংখ্য টেম্পোরারি ফাইল তৈরি হয়। এগুলো দীর্ঘ সময় ধরে জমা হয়ে আপনার স্টোরেজ পূর্ণ করে এবং ডিভাইসের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। এই ফাইলগুলো সরানোর জন্য, প্রথমে উইন্ডোস সার্চ বারে গিয়ে Disk Cleanup লিখে টুলটি চালু করুন। এখান থেকে আপনি ড্রাইভ নির্বাচন করে টেম্পোরারি ইন্টারনেট ফাইল, টেম্পোরারি ফাইল এবং ডেলিভারি অপটিমাইজেশন ফাইলসহ সমস্ত অপ্রয়োজনীয় আইটেম নির্বাচন করে ডিলিট করতে পারবেন। এ ছাড়াও আরও বেশি জায়গা খালি করার জন্য কিবোর্ডে রান ডায়ালগ বক্সে %temp% লিখে ম্যানুয়ালি টেম্পোরারি ফোল্ডারের সমস্ত ফাইল ডিলিট করে দিন। সবশেষে, ডিলিট হওয়া ফাইলগুলো স্থায়ীভাবে সরাতে রিসাইকেল বিন খালি করতে ভুলবেন না।
অপ্রয়োজনীয় সফটওয়্যার আনইনস্টল করুন
আমরা প্রায়ই এমন কিছু প্রোগ্রাম বা গেম ইনস্টল করি, যা পরে আর ব্যবহার করা হয় না। এই অব্যবহৃত প্রোগ্রামগুলো স্টোরেজ দখল করে এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে রিসোর্স ব্যবহার করে ডিভাইসের পারফরম্যান্স কমিয়ে দেয়। এগুলো সরানোর জন্য সেটিংস খুলুন এবং অ্যাপস অপশনে যান। ইনস্টল করা অ্যাপের তালিকা থেকে যেগুলো আপনার প্রয়োজন নেই, সেগুলো নির্বাচন করে আনইনস্টল করুন। অনেক ল্যাপটপে প্রস্তুতকারকের দেওয়া অপ্রয়োজনীয় সফটওয়্যার আগে থেকেই ইনস্টল করা থাকে, সেগুলো খুঁজে বের করে আনইনস্টল করুন।
স্টার্টআপ প্রোগ্রাম নিয়ন্ত্রণ করুন
কম্পিউটার চালু হওয়ার সময় কিছু প্রোগ্রাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে শুরু করে, যা সিস্টেমের বুটিং টাইম অনেক বাড়িয়ে দেয়। এই প্রোগ্রামগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে Task Manager খুলুন এবং Startup ট্যাবে যান। এখানে আপনি দেখতে পাবেন কোন কোন প্রোগ্রাম স্টার্টআপের সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলছে এবং তাদের প্রভাব (High, Medium, Low)। যে প্রোগ্রামগুলো আপনার স্টার্টআপের জন্য জরুরি নয় (যেমন বিভিন্ন আপডেটার বা চ্যাটিং অ্যাপ), সেগুলোকে নির্বাচন করে ডিসাবল করে দিন। এতে আপনার কম্পিউটার আরও দ্রুত চালু হবে।
অপারেটিং সিস্টেম ও ড্রাইভার আপডেট রাখুন
আপনার সফটওয়্যারের আপডেটগুলো কেবল নতুন ফিচারের পাশাপাশি পুরনো ত্রুটি (Bugs) এবং নিরাপত্তার দুর্বলতা ঠিক করে ডিভাইসের পারফরম্যান্স উন্নত করে। তাই উইন্ডোজ আপডেট অপশন চেক করে আপনার অপারেটিং সিস্টেমকে সবসময় আপ টু ডেট রাখুন। একই সঙ্গে আপনার গ্রাফিক্স কার্ড এবং অন্য হার্ডওয়্যারের ড্রাইভারগুলোও প্রস্তুতকারকের ওয়েবসাইট থেকে নিয়মিত আপডেট করা উচিত। কারণ পুরনো বা ত্রুটিযুক্ত ড্রাইভারগুলো প্রায়শই পারফরম্যান্স কমানোর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ব্রাউজার অপটিমাইজেশন
ওয়েব ব্রাউজার আজকের দিনে আমাদের কম্পিউটারের সবচেয়ে বেশি রিসোর্স ব্যবহার করে। ঘন ঘন ব্যবহারের কারণে ব্রাউজারে অতিরিক্ত ক্যাশে এবং কুকিজ জমা হয়, যা গতি কমিয়ে দেয়। তাই আপনার ব্রাউজার সেটিংস থেকে নিয়মিত এই ক্যাশে পরিষ্কার করুন। এ ছাড়াও ব্রাউজারে ইনস্টল করা অপ্রয়োজনীয় বা অব্যবহৃত এক্সটেনশনগুলো ডিজেবল বা রিমুভ করুন। অতিরিক্ত এক্সটেনশনগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকে এবং র্যাম ব্যবহার করে গতিকে কমিয়ে দেয়।
র্যাম ব্যবহারের ওপর নজর রাখুন
আপনার কম্পিউটারের র্যাম হলো গতি নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি। Task Manager-এর Performance ট্যাবে গিয়ে দেখুন কোনো অ্যাপ বা প্রক্রিয়া অতিরিক্ত র্যাম ব্যবহার করছে কি না। যদি দেখেন যে ব্যবহারযোগ্য র্যাম কমে যাচ্ছে, তবে সেই প্রোগ্রামগুলো বন্ধ করুন।
হার্ডডিস্কের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ডিফ্র্যাগমেন্টেশন
যদি আপনার কম্পিউটার পুরনো হার্ডডিস্ক ড্রাইভ ব্যবহার করে থাকে, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফাইলগুলো ডিস্কজুড়ে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ফাইল অ্যাক্সেস করতে বেশি সময় লাগে, ফলে গতি কমে যায়। উইন্ডোস সার্চে Defragment and Optimize Drives লিখে টুলটি চালু করুন এবং আপনার ড্রাইভগুলো নিয়মিত ডিফ্র্যাগমেন্ট করুন। তবে, যদি আপনার ডিভাইসটি সলিড স্টেট ড্রাইভ (এসএসডি) ব্যবহার করে, তবে ডিফ্র্যাগমেন্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই।
উচ্চ-রেজল্যুশন ওয়ালপেপার ও স্ক্রিন সেভার এড়িয়ে চলুন
আপনার ডেস্কটপে উচ্চ-রেজল্যুশন বা অ্যানিমেটেড ওয়ালপেপার এবং স্ক্রিন সেভার ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। এই ধরনের ভিজ্যুয়াল উপাদানগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে ক্রমাগত সিস্টেম রিসোর্স ব্যবহার করে, বিশেষ করে গ্রাফিক্স মেমরি। একটি সাধারণ বা স্ট্যাটিক ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবহার করুন। এতে জিপিও এর ওপর চাপ কমবে এবং গ্রাফিক্স-নির্ভর কাজ, যেমনÑ গেমিং বা ভিডিও এডিটিংয়ের সময় সিস্টেমের পারফরম্যান্স উন্নত হবে।
সিস্টেম রিসেট বা ক্লিন ইনস্টলের কথা ভাবুন
যদি ওপরের কোনো টিপসেই আপনার সমস্যার সমাধান না হয় এবং আপনার সিস্টেম দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা হয়, তবে সব থেকে কার্যকর সমাধান হলো সিস্টেম রিসেট বা ক্লিন ইনস্টল। উইন্ডোজে গিয়ে আপনার ফাইলগুলো অক্ষুণ্ন রেখে সম্পূর্ণ অপারেটিং সিস্টেমটি রিসেট করতে পারেন। এতে সব পুরনো কনফিগারেশন, ভাইরাস এবং জাঙ্ক ফাইল মুছে যায়, ফলে কম্পিউটার প্রায় নতুনের মতো গতিশীল হয়ে ওঠে। অবশ্যই এর আগে আপনার সব গুরুত্বপূর্ণ ডেটার ব্যাকআপ নিতে ভুলবেন না।
ফ্যান ও ভেন্ট পরিষ্কার রাখুন
কম্পিউটার স্লো হওয়ার একটি সাধারণ কিন্তু প্রায়শই উপেক্ষিত কারণ হলো অতিরিক্ত গরম হওয়া। ল্যাপটপের কুলিং ফ্যান এবং ভেন্টগুলোতে ধুলো জমে গেলে বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে সিস্টেম গরম হয়ে যায় এবং গতি কমাতে শুরু করে। তাই আপনার ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের ভেন্টিলেশন এরিয়া (বাতাস বের হওয়ার পথ) নিয়মিত পরিষ্কার করুন। প্রয়োজনে ল্যাপটপের জন্য একটি কুলিং প্যাড ব্যবহার করুন।