মুহিন তপু
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৬:৩০ পিএম
বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ নতুন কিছু নয়। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। কিন্তু অধিকাংশই দক্ষতা, তথ্য কিংবা যোগাযোগের অভাবে কাঙ্ক্ষিত চাকরি থেকে পিছিয়ে পড়েন। একদিকে প্রতিষ্ঠানগুলো খুঁজে পান না উপযুক্ত প্রার্থী, অন্যদিকে চাকরিপ্রার্থীরা খুঁজে পান না স্বচ্ছ ও দক্ষ নিয়োগব্যবস্থা। এই বাস্তবতা বদলাতে সামনে এসেছে ‘সম্ভব’- একটি সামাজিক স্টার্টআপ, যা প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানের সমীকরণ বদলে দিতে চায়।
‘সম্ভব’ শুধু আরেকটি চাকরির অ্যাপ নয়। এটি একটি সমন্বিত জব-টেক ও এইচআর-টেক প্লাটফর্ম, যেখানে চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের দক্ষতা অনুযায়ী চাকরি খুঁজে পান, বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন, আর নিয়োগকর্তারা পান দ্রুত ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেরা প্রার্থী বাছাইয়ের সুযোগ। দেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে ‘সম্ভব’ হয়ে উঠেছে এক কার্যকর সেতুবন্ধ।
সম্ভব অ্যাপ সম্পর্কে পরিচিতি
‘সম্ভব’ একটি ডিজিটাল প্লাটফর্ম, যা চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগকর্তাদের জন্য এক সমন্বিত ব্যবস্থা প্রদান করে। এটি দক্ষতা যাচাই, অনলাইন প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি, সরাসরি চাকরির আবেদন, প্রার্থী মূল্যায়ন ও নিয়োগ প্রক্রিয়া অটোমেশনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের জটিলতা দূর করতে কাজ করছে। ‘সম্ভব’ কেবল একটি চাকরি খোঁজার ওয়েবসাইট নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার সলিউশন।
শুরুর গল্প
২০২২ সালে তিন বন্ধু- রিফাদ হোসেন, নাকিব মুহাম্মদ ফাইয়াজ ও হাসিবুর রহমানÑ দক্ষতার অভাবে চাকরি না পাওয়া ও কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধান করতে ‘সম্ভব’ প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে মূলত নিম্নআয়ের নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। দ্রুত তারা বুঝতে পারেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরো দেশের কর্মবাজারের কাঠামো বদলে ফেলা সম্ভব। এরপর তারা প্লাটফর্মটি প্রসারিত করে চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগকর্তাদের জন্য এক সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলেন।
উদ্যোক্তাদের পরিচিতি
সম্ভব অ্যাপস এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও রিফাদ হোসেন। তিনি প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা মানসিকতা দিয়ে ‘সম্ভব’-কে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কৌশলগত পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের দায়িত্বে আছেন নাকিব মুহাম্মদ ফাইয়াজ। এছাড়া ‘সম্ভব’ এর ব্যবসায়িক বিকাশ ও অংশীদারত্ব বৃদ্ধির দায়িত্ব পালন করছেন হাসিবুর রহমান।
‘সম্ভব’-এর কাজ ও কার্যক্রম
ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি ও দক্ষতা যাচাই : ব্যবহারকারীরা স্বল্প সময়ে নিজেদের প্রোফাইল তৈরি করতে পারেন, যেখানে ভিডিও প্রোফাইল, স্কিল অ্যাসেসমেন্ট, প্রশিক্ষণের সার্টিফিকেট অন্তর্ভুক্ত।
অনলাইন প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন : সরাসরি প্লাটফর্ম থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া যায়, যা চাকরির যোগ্যতা বৃদ্ধি করে।
চাকরির জন্য সরাসরি আবেদন ও ট্র্যাকিং : কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই চাকরিতে আবেদন করা সম্ভব।
নিয়োগকর্তাদের জন্য সম্পূর্ণ এইচআর সমাধান : প্রার্থী মূল্যায়ন থেকে শুরু করে নিয়োগ প্রক্রিয়া, পে-রোল ম্যানেজমেন্ট ও এইচআর সেবা
এআই-ভিত্তিক স্কিল-ম্যাচিং প্রযুক্তি : চাকরিপ্রার্থী ও চাকরির খাত মিলিয়ে দেয় প্রযুক্তির সাহায্যে।
সামাজিক অন্তর্ভুক্তি : বিশেষভাবে কম সুযোগপ্রাপ্ত নারীদের জন্য কার্যক্রম।
সফলতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
‘সম্ভব’-এ এখন পর্যন্ত রেজিস্টার্ড ব্যবহারকারী ৬ লাখ ছাড়িয়েছে এবং ১৩০০+ প্রতিষ্ঠান তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ‘সম্ভব’-কে ব্যবহার করছে। সফলভাবে ১২ হাজারের বেশি চাকরি প্লেসমেন্ট করেছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের সংস্করণে ফোর্বস এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সম্ভাবনাময় শীর্ষ ১০০ স্টার্টআপের তালিকায় উঠে আসে ‘সম্ভব’। এটি কনজ্যুমার টেকনোলজি বা ভোক্তা প্রযুক্তি ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছে, যা বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য এক গৌরবময় অর্জন।
২০২৩ সালে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন থেকে ৩ লাখ ডলার অনুদান পেয়ে সম্ভব তাদের সামাজিক উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পথ প্রসারিত করে। এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম কুকুন ক্যাপিটালের নেতৃত্বে ১ মিলিয়ন ডলার (১০ লাখ ডলার) প্রি-সিড ফান্ডিং সংগ্রহ করে।
এই অর্জনগুলো প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্ভাবনী শক্তি ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার ফল। সম্ভবের মাধ্যমে হাজার হাজার তরুণ দক্ষতা অর্জন করে উপযুক্ত চাকরিতে নিয়োজিত হচ্ছে আর প্রতিষ্ঠানগুলো পাচ্ছে কার্যকর ও স্বয়ংক্রিয় নিয়োগ প্রক্রিয়া।
ভবিষ্যতের লক্ষ্য
‘সম্ভব’-এর প্রধান নির্বাহী রিফাদ হোসেন জানান, আমাদের লক্ষ্য শুধু বাংলাদেশ নয়, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করা এবং দেশের কর্মীদের সুযোগ বৃদ্ধিতে প্রযুক্তি ব্যবহার করা।
তারা আগামী সময়ে আরও বেশি প্রশিক্ষণ, বৈশ্বিক কর্মসংস্থান, নতুন ফিচার সংযোজন এবং বহুমাত্রিক প্রযুক্তি উন্নয়ন করে এই প্লাটফর্মকে বিশ্বমানের করার পরিকল্পনা করছে।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে ‘সম্ভব’
‘সম্ভব’ প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের নতুন পথ খুলেছে। এআই, মেশিন লার্নিং ও ডাটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে প্রার্থীদের দক্ষতা যাচাই ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করেছে। এক্ষেত্রে তাদের সিলেকশন অ্যালগরিদম অত্যন্ত কার্যকর।
সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা
‘সম্ভব’-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল নিম্ন-আয়ের নারীদের চাকরিতে সহায়তা করার লক্ষ্যে। সেখান থেকেই আজকের এই বিস্তৃতি।
কাজের সুযোগ বাড়ানো, দালালদের প্রভাব কমানো ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান তৈরি করাÑ এই তিন মূল বিষয়ে ‘সম্ভব’ ইতোমধ্যেই দেশীয় শ্রমবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষত নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে ‘সম্ভব’-এর অবদান অসামান্য।
শেষের আগে
বাংলাদেশের জব মার্কেটে ‘সম্ভব’ একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন। প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করে এটি শুধু চাকরি খোঁজা নয়, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থা বদলে দিচ্ছে। এর ফলে হাজার হাজার তরুণের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে আর হাজারো প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে দক্ষ কর্মী। ‘সম্ভব’-এর এই সাফল্য দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা যায়।