‘সুপারম্যান মেমোরি ক্রিস্টাল’
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৫ ১৭:২৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বিজ্ঞান এখন এমন এক পথে হাঁটছে, যেখানে প্রযুক্তি ভবিষ্যতের সভ্যতার জন্য অতীতের দরজা খুলে রাখছে। যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন এক ধরনের ‘৫ডি অপটিক্যাল ডেটা স্টোরেজ’ প্রযুক্তি, যাকে বলা হচ্ছে ‘সুপারম্যান মেমোরি ক্রিস্টাল’। এটি এমন এক ধরনের ফিউজড কোয়ার্টজ স্ফটিক, যার মধ্যে আল্ট্রাফাস্ট ফেমটোসেকেন্ড লেজার দিয়ে ডিএনএ এবং নানা ধরনের তথ্য খোদাই করে রাখা যায়, যা বিলিয়ন বছর পর্যন্ত অবিকৃত অবস্থায় টিকে থাকতে পারে।
প্রযুক্তিটির নামের ‘৫ডি’ বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে- তিনটি স্থানিক মাত্রা (উচ্চতা, প্রস্থ ও গভীরতা) ছাড়াও আরও দুটি মাত্রা, যেগুলো নির্দেশ করে ন্যানোস্কেল প্যাটার্নের আকার ও ঘূর্ণনের দিক। এর মাধ্যমে একটি তথ্য কেবল একদিকে নয়, বরং স্ফটিকের ভেতর জ্যামিতিক পদ্ধতিতে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্থায়ীভাবে খোদাই করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি ডিস্কে ৩৬০ টেরাবাইট পর্যন্ত তথ্য সংরক্ষণ করা যায়; যা একটি পূর্ণাঙ্গ মানব ডিএনএর সমান। চরম তাপ (১ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত), মহাকাশের বিকিরণ, আগুন বা সময়ের ক্ষয়Ñ কোনো কিছুই এই স্ফটিকের তথ্যকে ধ্বংস করতে পারে না। ফলে এটি ভবিষ্যতের জন্য টেকসই ডেটা আর্কাইভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই ক্রিস্টালগুলো বর্তমানে অস্ট্রিয়ার হলস্ট্যাট শহরের একটি লবণের গুহায় বিশেষভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে, যেটি পরিচিত ‘মেমোরি অব ম্যানকাইন্ড’ আর্কাইভ হিসেবে। এখানে সেগুলো রাখা হয়েছে টাইম ক্যাপসুল আকারে, যাতে ভবিষ্যতের কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবট এক দিন সেই তথ্য উদ্ধার করতে পারে।
এই ডেটা স্টোরেজ প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু মানব ইতিহাস নয়, বিলুপ্তির মুখে থাকা উদ্ভিদ ও প্রাণীদের জিনগত তথ্যও সংরক্ষণ করা সম্ভব। বিজ্ঞানীদের মতে, এই তথ্য ভবিষ্যতে জীববিজ্ঞানের গবেষণায় বিপ্লব ঘটাতে পারে এমনকি জিনোমিক রিকনস্ট্রাকশন বা ডিএনএ থেকে জীব সৃষ্টির মতো উচ্চপর্যায়ের গবেষণার সম্ভাবনাও উন্মুক্ত করে।
অবশ্য বিজ্ঞানীরা এটাও স্পষ্ট করেছেন যে, কেবল জিনগত তথ্য সংরক্ষণ করলেই কোনো প্রাণী বা মানুষকে কৃত্রিমভাবে ফিরিয়ে আনা এখনও সম্ভব নয়। তবে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সিন্থেটিক বায়োলজিতে অগ্রগতি হলে ভবিষ্যতে হয়তো সেটিও সম্ভব হতে পারে।
২০১৪ সালে এই প্রযুক্তিকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে টেকসই তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যম’ হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান দেওয়া হয়। গবেষকরা বলছেন, কেবল এক খণ্ড কাগজ বা টেপের ওপর নয়, বরং একটি কঠিন পদার্থের পুরো অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় ডেটা লেখার এই পদ্ধতি আমাদের ডেটা আর্কাইভিং ধারণার সম্পূর্ণ রূপান্তর ঘটাবে।
এই ৫ডি ক্রিস্টাল শুধু তথ্য সংরক্ষণ নয়, বরং ভবিষ্যতের জ্ঞান, সভ্যতা ও ইতিহাস পুনর্গঠনের এক প্রযুক্তি ভিত্তিক ব্রিজ হয়ে উঠতে পারে।