ব্যবসায়িক কাজে এআই
মুহিন তপু
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৫ ১৭:২৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
২০২৫ সালে এসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence-AI) আর বিলাসবহুল প্রযুক্তি নয়। বরং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য হয়ে উঠেছে বাস্তব ও সাশ্রয়ী এক সমাধান। প্রাত্যহিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, বিপণন, গ্রাহকসেবা কিংবা কনটেন্ট তৈরিতে এখন এআই টুল ব্যবহারের মাধ্যমে সময়, খরচ ও শ্রম বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী McKinsey-এর এক গবেষণা বলছে, ২০২৪ সালেই বিশ্বের ৭৫% ছোট ও মাঝারি ব্যবসায় এআই কোনো না কোনোভাবে ব্যবহার হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে এ সংখ্যা প্রায় ৪২%। এতে গড়ে ৩০% উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই প্রবণতা বাড়ছে, বিশেষত অনলাইনভিত্তিক উদ্যোক্তা, হস্তশিল্প, ডিজিটাল পণ্য ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় যেভাবে বদল আসছে
বাংলাদেশে বর্তমানে ৭৮ লাখেরও বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই সীমিত জনবল ও বাজেটের মধ্যে ব্যবসা পরিচালনা করেন। এই বাস্তবতায় এআই প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের কাছে এমন এক সহকারী হয়ে উঠছে, যে ক্লান্ত হয় না, অতিরিক্ত খরচের চিন্তা নেই এবং দক্ষতার সঙ্গে কাজ শেষ করে।
সাভারের ফারজানা ইসলাম, যিনি একটি অনলাইন বুটিক চালান, বলেন, ‘আগে ক্যাপশন লিখতে, ডিজাইন করতে অনেক সময় লাগত। এখন ChatGPT আর Canva দিয়েই সব হয়ে যায়। সময় বাঁচে, কাস্টমারের প্রতিক্রিয়াও ভালো।’
যেভাবে এআই টুলস ব্যবহার করছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা
কাস্টমার সাপোর্টে চ্যাটবট : Messenger Bot বা WhatsApp Business API ব্যবহার করে ইনবক্স রিপ্লাই অটোমেট করা যাচ্ছে।
কনটেন্ট ও ডিজাইনে সহায়তা : Canva, CapCut, Adobe Express-এর মাধ্যমে পোস্টার, লগো, ভিডিও, রিলস তৈরি করা যায় সহজেই।
বিক্রয় ও মার্কেটিং কপিরাইটিং : ChatGPT বা Copy.ai দিয়ে দ্রুত তৈরি করা যায় বিজ্ঞাপন, প্রোডাক্ট ক্যাপশন বা ব্লগ কনটেন্ট।
হিসাব ও বিশ্লেষণে অটোমেশন : গুগল শিট-এর এআই প্লাগইন, জোহো বুকস বা কুইকবুকস-এর মতো ক্লাউড অ্যাকাউন্টিং টুল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক ডেটা বিশ্লেষণ ও রিপোর্ট তৈরি করতে সাহায্য করছে। কোন পণ্য চলছে, কীভাবে খরচ কমানো যায়—এইসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে গ্রাফ ও চার্টে।
ভয়েস ও ভিডিও কনটেন্ট : Descript বা ElevenLabs দিয়ে ভয়েসওভার, স্ক্রিপ্ট, ভিডিও এডিটিং করা সম্ভব।
সাশ্রয়ী ও জনপ্রিয় এআই টুলসের তালিকা
| টুল | কাজ | ব্যবহারযোগ্যতা |
| ChatGPT | কনটেন্ট লেখা | ফ্রী/প্রো |
| Canva | ডিজাইন | ফ্রী/প্রো |
| CapCut | ভিডিও সম্পাদনা | ফ্রী |
| Meta AI | মেসেঞ্জার রেসপন্স | ফ্রী |
| ElevenLabs | ভয়েজওভার | সীমিত ফ্রী |
| Zoho Books | হিসাবরক্ষণ | ফ্রী ট্রায়াল |
| Gemini | এআই সহকারী | ফ্রী |
চ্যালেঞ্জ
জ্ঞান ও দক্ষতার ঘাটতি : গ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কিংবা প্রবীণ ব্যবসায়ীরা অনেক সময় এআই-এর কার্যপদ্ধতি বোঝেন না। ইংরেজি ভাষানির্ভর ইন্টারফেসও বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা : দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ বা স্মার্টফোনের সীমিত ক্ষমতা অনেককে এআই ব্যবহারে পিছিয়ে দেয়।
ভাষা ও সংস্কৃতিগত প্রতিবন্ধকতা : বাংলা ভাষায় কনটেন্ট তৈরি এখনও সীমিত। অনেক টুল শুধু ইংরেজি ভাষার জন্য কার্যকরভাবে কাজ করে।
ডেটা নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা : এআই টুলে ব্যবসায়িক তথ্য দিলে তা কোথায় সংরক্ষিত হয়, কীভাবে ব্যবহৃত হয়Ñ তা নিয়ে যথেষ্ট সচেতনতা নেই। ফলে তথ্য ফাঁস বা অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যবহার ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।
করণীয়
এআই সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ : সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং এনজিওগুলো যৌথভাবে জেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে এআই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালাতে পারে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোতে SME উদ্যোক্তাদের জন্য তথ্য প্রযুক্তি ও এআই নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করা যেতে পারে।
বাংলা ভাষা ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে টুল উন্নয়ন : বাংলা ভাষায় কাজ করতে পারে এমন দেশীয় এআই টুল যেমন Bhasha.ai, Aporajita.ai, RiseUp AI-এর মতো উদ্যোগকে সহায়তা দিতে হবে। স্থানীয় ভাষা, বাজার ও সংস্কৃতি ভিত্তিক এআই মডেল তৈরি জরুরি।
সাশ্রয়ী সাবস্ক্রিপশন মডেল : সরকার অথবা সংগঠিত SME নেটওয়ার্ক যদি সম্মিলিতভাবে এআই টুলসের জন্য সাবস্ক্রিপশন নেয়, তাহলে প্রতি উদ্যোক্তার খরচ কমানো সম্ভব।
AI ব্যবহারে নৈতিকতা ও নিরাপত্তা শিক্ষা : তথ্য সুরক্ষা, অটোমেশন সীমা, গ্রাহকের সম্মতি ইত্যাদি বিষয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। এআই ব্যবহার নীতিমালা করা যেতে পারে।
শেষের আগে
একজন উদ্যোক্তা, একটি স্মার্টফোন আর কয়েকটি এআই টুল দিয়েই এখন একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভবÑ তাও অনেক বেশি পেশাদারিত্ব ও কার্যকারিতার সঙ্গে। নতুন যুগের ব্যবসা মানেই প্রযুক্তি-সহায়ক সিদ্ধান্ত। আর সেই সিদ্ধান্তে এআই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় সহযোগী।
আগে ব্যবসার জন্য অফিস, কর্মচারী ও বিজ্ঞাপনের জন্য মোটা অঙ্কের বাজেট দরকার হতো। আজকের দিনে, একজন উদ্যোক্তা নিজের মোবাইল ফোন দিয়েই অনেক বেশি পেশাদারিত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে ব্যবসা চালাতে পারেন।