× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফ্রিল্যান্সিং ও গিগ ইকোনমি

কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা

মুহিন তপু

প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৫ ১৮:৪৪ পিএম

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৫ ১৮:৪৮ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ফ্রিল্যান্সিং ও গিগ ইকোনমির প্রসার। বর্তমানে দেশের লাখো তরুণ ঘরে বসেই বৈশ্বিক মার্কেটপ্লেসে কাজ করছেন, আয় করছেন বৈদেশিক মুদ্রা। এ খাত এখন আর শুধু বিকল্প কর্মসংস্থান নয়, বরং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ হয়ে উঠছে।

ফ্রিল্যান্সিং ও গিগ ইকোনমি

বিশ্বব্যাপী কাজের ধরনে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে গিগভিত্তিক কাজ, যেখানে নির্দিষ্ট সময় ও প্রজেক্টভিত্তিক চুক্তিতে কাজ করেন ফ্রিল্যান্সাররা। Upwork, Fiverr, Freelancer.com, Toptal এসব আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের অবস্থান দিনদিন শক্ত হচ্ছে। বিশেষত গ্র্যাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট রাইটিং, ভিডিও এডিটিং, অ্যাপ ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন কাজে বিশ্বমানের দক্ষতা দেখাচ্ছেন দেশি তরুণরা।

অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শুধু ফ্রিল্যান্সিং খাত থেকে এসেছে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা। এ খাত এখন রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা যেমন ওয়েব ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট রাইটিং ও ভিডিও এডিটিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশি তরুণরা বিদেশি ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে কাজ নিয়ে ঘরে বসেই আয় করছেন ডলার।

বিশেষজ্ঞদের মতে গিগ ইকোনমির যথাযথ বিকাশ হলে এটি ভবিষ্যতে তৈরি পোশাকশিল্পের মতো বৈদেশিক আয় অর্জনকারী খাতে পরিণত হতে পারে।

বেকারত্ব মোকাবিলায় কার্যকর হাতিয়ার

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশই তরুণ। প্রতি বছর ২০-২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থানপ্রার্থী শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন, কিন্তু প্রচলিত চাকরির সুযোগ সীমিত। এ বাস্তবতায় ফ্রিল্যান্সিং খাত দ্রুত বিকল্প কর্মসংস্থানের রূপ নিচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি ঘরে বসে আয় করতে পারছেন। বিশেষ করে নারীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। অনেক গৃহিণী বা গ্রামীণ নারী এখন পরিবার সামলেই আয় করছেন বিদেশি মুদ্রা।

চ্যালেঞ্জের মুখে সম্ভাবনা

যদিও সম্ভাবনা ব্যাপক, তবু এ খাতের বিকাশে রয়েছে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা।

পেমেন্ট গেটওয়ের অনুপস্থিতি : বাংলাদেশে এখনও PayPal ও Stripe-এর মতো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে চালু হয়নি। বিকল্প ব্যবস্থায় অর্থ আনা যায় বটে, তবে সেখানে রয়েছে বাড়তি সময় ও চার্জের জটিলতা।

দক্ষতার ঘাটতি : বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সার নিজের মতো করে ইউটিউব বা ফ্রি কোর্স দেখে শেখেন। হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও গাইডেন্সের অভাবে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানো অনেকের পক্ষে সম্ভব হয় না।

প্রতারণা ও অনিরাপত্তা : ক্লায়েন্টের পেমেন্ট না দেওয়া, ভুয়া জব অফার, নকল মার্কেটপ্লেস এসব কারণে অনেক তরুণ শুরুর দিকেই নিরুৎসাহ হয়ে পড়েন।

সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও নীতিমালা

বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং ও গিগ ইকোনমি খাত এগিয়ে নিতে বিগত এক দশকে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কাঠামোগত সমন্বয় ও বাস্তব প্রয়োগের দিক দিয়ে এখনও রয়েছে অনেক ঘাটতি।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) ২০১৬ সাল থেকে ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ চালু করেছে। এ প্রকল্পের আওতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক অথরিটি (BHTPA) দেশব্যাপী আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার, হাইটেক পার্ক ও আইটি ভিলেজ স্থাপন করছে; যেখানে আইটি স্টার্টআপ ও ফ্রিল্যান্সাররা ইনকিউবেশন সুবিধা পাচ্ছেন। এসব কেন্দ্র ডিজিটাল উদ্যোক্তা তৈরির সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলছে।

সরকারি উদ্যোগে Skills for Industry Competitiveness and Innovation Program (SICIP) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, যা আইটি ও অন্যান্য খাতে দক্ষ জনশক্তি গঠনে কাজ করছে। এ প্রকল্পে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (PKSF) সঙ্গে যৌথভাবে প্রান্তিক তরুণদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য কোর্স ফি ফ্রি, প্রশিক্ষণকালীন ভাতা এবং পরবর্তী কর্মসংস্থানের সুযোগও রাখা হয়েছে। BASIS ও অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে অংশীদারিতে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।

তবে দুঃখজনক হলো ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় নীতিমালা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২১ সালে তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগ National Strategy for Developing the ICT Freelancers নামে একটি খসড়া প্রকাশ করলেও সেটি এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

বিভিন্ন বেসরকারি আইটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান যেমন কোডার্স ট্রাস্ট, ক্রিয়েটিভ আইটি, শিখবে সবাই, বেসিস (BITM) স্ব-স্ব উদ্যোগে তরুণদের ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্র্যাফিক ডিজাইন ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

কিছু প্রতিষ্ঠান সফল ফ্রিল্যান্সারদের সঙ্গে অনুশীলনভিত্তিক ক্লাস ও মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করেছে, যেখানে বাস্তব মার্কেটপ্লেসের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।

তবে এসব কোর্স সাধারণত শহরকেন্দ্রিক এবং অনেক সময় অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও গ্রামীণ তরুণদের নাগালের বাইরে থেকে যায়। এ ছাড়া কোর্সের মান ও সময়োপযোগিতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যা করা দরকার

পেমেন্ট গেটওয়ে চালু : সরকারকে PayPal বা Stripe চালুর জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দর কষাকষি ও নীতিগত পদক্ষেপ নিতে হবে।

দক্ষতা উন্নয়ন : আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, সফল ফ্রিল্যান্সারদের দিয়ে মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম, বাস্তব প্রজেক্টভিত্তিক শেখার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

আইনি সহায়তা ও সুরক্ষা : প্রতারণার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ, স্ক্যাম রোধে সাইবার হেলপলাইন এবং সচেতনতামূলক প্রচার চালানো দরকার।

নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অগ্রাধিকার : তাদের জন্য ইনসেনটিভ, অনলাইন রিসোর্স সেন্টার ও ডিভাইস সহায়তা নিশ্চিত ও সুযোগসুবিধা আরও বাড়াতে হবে।

শেষের আগে

ফ্রিল্যান্সিং ও গিগ ইকোনমি বাংলাদেশের তরুণদের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক আয় বৃদ্ধিতে বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। এ খাতকে যদি সঠিকভাবে পরিচালিত ও সহায়তা করা যায় তবে এটি শুধু তরুণদের আয় নয়, বরং দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা