স্মার্ট ড্রোন ও রোবোটিকস
ইয়ামীর আহমেদ
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৫ ১৪:০২ পিএম
আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৫ ১৪:০৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
একটি ভবন ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ জীবিত আছে কি না কেউ জানে না। উদ্ধারকারীরা চেষ্টা করছেন, কিন্তু ধোঁয়া, গ্যাস আর ঝুঁকির কারণে ভেতরে ঢোকা যাচ্ছে না। তখনই এগিয়ে আসে ছোট্ট এক রোবট, স্লিম ও সাপের মতো আকৃতির। ধ্বংসস্তূপের সরু ফাঁক গলে ঢুকে পড়ে সে, তার থারমাল সেন্সর বিশ্লেষণ করে মানুষের শরীরের তাপমাত্রা। হঠাৎই কন্ট্রোল স্ক্রিনে দেখা যায় একজন আহত মানুষ বেঁচে আছেন! সময়মতো উদ্ধার করে বাঁচানো গেল একটি জীবন।
এটাই আজকের যুগের স্মার্ট রোবোটিকস, যেখানে রোবট আর শুধু যন্ত্র নয়, হয়ে উঠেছে সাহসী সহচর, জীবনের রক্ষাকবচ।
আগুনের মুখোমুখি সাহসী রোবট
আগুন লাগলে প্রায়ই উদ্ধারকর্মীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভবনে প্রবেশ করতে হয়। এখন অনেক দেশে স্মার্ট ফায়ারফাইটিং রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে, যেমন চীনের RXR-MC80BD রোবট, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগুন শনাক্ত করে পানি বা ফোম স্প্রে করে আগুন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
এ রোবটগুলো ধোঁয়া, তাপমাত্রা ও গ্যাস লিক শনাক্ত করতে পারে; যেখানে মানুষ প্রবেশ করতে পারে না, সেখানে এগিয়ে যায় এ যন্ত্রমানব।
বন্যার পানিতে ভেসে আসে ড্রোনের সাহায্য
বন্যা বা পাহাড়ি দুর্যোগে অনেক সময় দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হয় না। সেসব জায়গায় ব্যবহৃত হয় AI-চালিত স্মার্ট ড্রোন, যা GPS ও ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো এলাকা ম্যাপ করে দিতে পারে, ক্ষতিগ্রস্তদের অবস্থান নির্ধারণ করে ওষুধ বা খাবার পৌঁছে দিতে পারে।
২০২৩ সালে ভারতের আসাম রাজ্যে ভয়াবহ বন্যার সময় ড্রোন ব্যবহার করে পানিবন্দি মানুষের অবস্থান চিহ্নিত করে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছানো হয় (সূত্র : The Hindu, 2023)।
ভূমিকম্পে স্নেক রোবটের সাহসী অভিযান
ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত মানুষকে খুঁজে বের করতে ব্যবহৃত হয় ‘স্নেক রোবট’, যেমন জাপানের তৈরি Quince রোবট। ফুকুশিমা পারমাণবিক বিপর্যয়ের সময় এ রোবট ভয়ংকর র্যাডিয়েশনযুক্ত এলাকায় প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহ করে উদ্ধার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে (সূত্র : IEEE Spectrum)।
এ রোবটগুলোর রয়েছে ক্যামেরা, তাপমাত্রা ও শব্দ সেন্সর, যেগুলো ক্ষুদ্র ফাটলের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে মানুষের জীবন খুঁজে পায়।
বাংলাদেশে রোবোটিকসের সম্ভাবনা ও উদ্যোগ
বাংলাদেশেও রোবোটিকস প্রযুক্তি নিয়ে কাজ হচ্ছে। BUET ও NSU-এর মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রোবোটিকস ক্লাব, বিভিন্ন প্রজেক্ট ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করে উদ্ভাবনী চর্চা করছে।
২০২০ সালে BRAC ও কিছু স্থানীয় উদ্ভাবকের সহায়তায় একটি প্রাথমিক ডেলিভারি ড্রোন প্রকল্প চালু হয়, যা দূরবর্তী এলাকায় চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দিতে সহায়তা করে।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ প্রযুক্তিগুলো দুর্যোগকালীন ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করা গেলে বাংলাদেশে জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রযুক্তি যখন মানবতার সহচর
একটা সময় ছিল যখন শুধু মানুষই লড়াই করত প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিপক্ষে। এখন এ লড়াইয়ে পাশে এসেছে প্রযুক্তির সাহসী সহযোদ্ধা রোবট ও স্মার্ট ড্রোন। এরা কাজ করে নির্ভয়ে, নিঃশব্দে, কিন্তু ফল হয় প্রাণ বাঁচানোর মতো অসাধারণ।
মানুষ যখন ক্লান্ত হয়, রোবট তখনও কাজ করে। যখন আগুনের সামনে দাঁড়ানো যায় না, তখন রোবট এগিয়ে যায়। যখন ফাটলের মধ্যে চোখ রাখা যায় না, তখন রোবট চুপচাপ দেখছে।
এ প্রযুক্তির মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে আমাদের ভবিষ্যৎ দুর্যোগ প্রস্তুতির প্রধান হাতিয়ার।
একনজরে রোবোটিক
| দুর্যোগ | ব্যবহৃত রোবট/ড্রোন | প্রধান কাজ |
| আগুন | ফায়ারফাইটিং রোবট | আগুন শনাক্ত ও নির্বাপণ |
| বন্যা | স্মার্ট ড্রোন | ম্যাপিং, ত্রাণ পৌঁছানো |
ভূমিকম্প | স্নেক রোবট | ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান |
| দুর্গম এলাকা | মেডিকেল ডেলিভারি ড্রোন | ওষুধ ও রক্ত পৌঁছানো |