এস. এম. ইমদাদুল হক
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৫:১৪ পিএম
বিগত এক দশকে ২২টি প্রকল্পের জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। প্রকল্পগুলোর বেশিভাগই নেয়া হয়েছে ২০১৬ সালে। কয়েকটি প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে ২০২৭ সাল পর্যন্ত। চলমান প্রকল্পগুলোর কয়েকটির প্রকল্প বরাদ্দের টাকা বাড়ানো হয়েছে কয়েক ধাপে।
তবে এসব প্রকল্পের মধ্যে বড় ধরনের ঘাপলা ও অনিয়ম পাওয়া গেছে। অনিয়মের অভিযোগ ১০-১২টি প্রকল্প সংশোধন করা হয়েছে। সূত্রমতে, তদন্তে ইডিসি, হাইটেক পার্ক ও অ্যাপ্লিকেশনের মতো প্রকল্পে গুরুতর অনিয়ম থাকায় প্রকল্প কাঁটছাট করা হয়েছে। একইসঙ্গে আলোচিত এটুআই প্রকল্প আর নবায়ন না হওয়া এবং এটুআই-কে কর্তৃপক্ষ করার বিষয়েও নেতিবাচক তথ্য মিলেছে। বিশেষ করে অনিয়মে শীর্ষে থাকা ইডিসি প্রকল্প সংশোধন করে ১৯৫ কোটি টাকার মতো সাশ্রয় হয়েছে।
আজ (৮ ডিসেম্বর) রবিবার অনিয়মের শ্বেতপত্রের সঙ্গে পরমার্শবিষয়ক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে বলে জানিয়ছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্ত কমিটির প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, তদন্তে ২১ জন পিডিকে তলব করা হয়েছিল। তাদের বক্তব্য পর্যালোচনায় প্রায় প্রতিটি প্রকল্পে নানা ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। ফলে তদন্তের সময়ই চলমান বেশির ভাগ প্রকল্পের অপ্রয়োজনীয় টাকার অঙ্ক বাদ দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মাহবুবুর রহমান বলেছেন, তদন্তে দুর্নীতির থলের বিড়াল বেরিয়ে আসছে। চলমান প্রকল্পের বাইরে হাতে নেওয়া হয়েছে এমন বেশ কয়েকটি ভবিষ্যৎ প্রকল্পেরও তদন্ত করা হচ্ছে। সেসব প্রকল্পেও হরিলুটের চিত্র পাচ্ছি। এরই মধ্যে ১০-১২টি প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে এখন প্রতিবেদন লেখা চলছে। প্রতিবেদনে ত্রুটি-বিচ্যুতি অনিয়ম সনাক্তের পাশাপাশি কীভাবে তা সংশোধন করা যাবে সেই সুপারিশও থাকছে।
তদন্ত সূত্রে প্রকাশ, প্রকল্পগুলোর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে নানা ফরম্যাটে ডিজিটাল উপস্থাপনায় ব্যয় হয়েছে ৩৪ কোটি টাকারও বেশি। প্রকল্পের ঠিকাদারি কাজ সম্পর্কিত নথি অনুযায়ী,
প্রকল্পগুলোর মধ্যে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার ছয়টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)। এছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর তিনটি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ৯৩৬ কোটি টাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়), ৫ হাজার ৯২৩ কোটি টাকার ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন (ইডিসি) প্রকল্প ও ২৮৭ কোটি টাকার হার পাওয়ার প্রকল্প : প্রযুক্তির সহায়তায় নারীর ক্ষমতায়ন-দ্বিতীয় পর্যায় প্রকল্প।
প্রশ্নবিদ্ধ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ৪৯ কোটি টাকার সরকারের ভিডিও কনফারেন্সিং প্ল্যাটফরম শক্তিশালীকরণ শীর্ষক প্রকল্প, ৮ কোটি টাকার পার্টনারশিপস ফর এ মোর টলারেন্ট, ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ (পিটিআইবি), বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের অধীনে ৮৩৭ কোটি টাকার শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার (১১টি) প্রকল্প (প্রথম সংশোধিত), ১ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকার জেলা পর্যায়ে আইটি/হাই-টেক পার্ক স্থাপন (১২ জেলায়) (প্রথম সংশোধিত), ৫৩৩ কোটি টাকার শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্প, ৪৩১ কোটি টাকার বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটি-২-এর সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প (দ্বিতীয় সংশোধিত), ৩৫৩ কোটি টাকার ডিজিটাল উদ্যোক্তা এবং উদ্ভাবন ইকো-সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্প, ৭৪ কোটি টাকার বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল সেবা ও কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ (বিডিসেট) কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাকরণ শীর্ষক প্রকল্প, ১ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকার শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউট অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, ১ হাজার ১১৪ কোটি টাকার শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং ও ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন (১৪টি) প্রকল্প।
একইভাবে ৮৫৫ কোটি টাকার অ্যাসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই), ২৭ কোটি টাকার দীক্ষা-দক্ষতা উন্নয়নে শিক্ষা অনলাইনে, ৪৪২ কোটি টাকার উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন একাডেমি প্রতিষ্ঠাকরণ (তৃতীয় সংশোধিত), ১৫৮ কোটি টাকার গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধিকরণ (প্রথম সংশোধিত), ৩০ কোটি টাকার ডিজিটাল সিলেট সিটি শীর্ষক প্রকল্প (দ্বিতীয় সংশোধিত), ১৬৭ কোটি টাকার বিজিডি-ই-গভর্নমেন্টের সক্ষমতা বৃদ্ধি শীর্ষক প্রকল্পের তদন্তেও ঘাপলা পাওয়া গেছে।
এছাড়াও আলোচিত ছয় প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ২৭১ কোটি টাকার উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন একাডেমি প্রতিষ্ঠাকরণ প্রকল্প, ১৫৯ কোটি টাকার গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প, ৫০৪ কোটি টাকার কানেকটেড বাংলাদেশ প্রকল্প, ২ হাজার ১৪১ কোটি টাকার বিজিডি ই-গভ. সার্ট প্রকল্প, ৪৭ কোটি টাকার সরকারের ভিডিও কনফারেন্সিং প্ল্যাটফর্ম শক্তিশালীকরণ প্রকল্প ও ২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকার ডিজিটাল সরকার ও অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ প্রকল্প (ইডিজিই)।
তদন্ত কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন আইসিটি বিভাগের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগের আইন শাখার উপসচিব মোঃ সিদ্দিকুর রহমান তালুকদার। কমিটিতে অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক, হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি, এটুআই প্রকল্প পরিচালক মো: মামুনুর রশীদ ভূঁইয়া এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের উন্নয়ন ও পরিকল্পনা শাখার মনিরুল ইসলাম এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি), সরকারি কেনাকাটা মূল্যায়নে গঠিত সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) একজন প্রতিনিধিও রয়েছেন।