এস. এম. ইমদাদুল হক
প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৪ ১১:৪১ এএম
আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৪ ১২:০২ পিএম
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিটিআরসি ভবনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় গোলটেবিল আলোচনা
রেডেইট ও পিন্টারেস্টের মতো বেশি কিছু ওয়েবসাইট এখনও বন্ধ। তাই বিগত সরকারের সময়ে যেসব ডোমেইন বন্ধ করা হয়েছে তা পুনর্মূল্যায়নের দাবি তুলেছেন ডিজিটাল সেবাদাতারা।
একই সঙ্গে নাগরিকদের জন্য মানসম্মত সেবা সুলভ করতে টেলিকম ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে যাচ্ছে বিটিআরসি। এখান থেকে উদ্ভাবনী ডিজটাল কনটেন্ট তৈরিতে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও প্ল্যাটফর্মকে সহায়তা করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিটিআরসি ভবনের সম্মেলন কক্ষে বিকাশমান টেলিযোগাযোগের শক্তিতে বাংলাদেশের ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ নিয়ে সোমবার অনুষ্ঠিত গোলটেবিল আলোচনায় এসব তথ্য উঠে আসে।
সভায় বক্তারা দেশের ডিজিটাল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সেবা প্রদানে সুলভে মানসম্মত টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত, সময়োপযোগী পলিসি প্রণয়ন, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ, প্রান্তিক অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, স্মার্টফোনের পেনিট্রেশন বৃদ্ধি, টেলিযোগাযোগ আইনের সময়োপযোগী সংস্কার এবং ডিজিটাল লিটারেসি ও ডিজিটাল সেবার বহুমাত্রিক ব্যবহারের লক্ষ্যে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারীর সভাপতিত্ব গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইসিটি সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ডেটা ও সাইবার সুরক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। তাই গত ১০ বছরের যে বৈষম্য রয়েছে তা খুঁজে বের করছি। সময়ের চাহিদা মেটাতে ডেটার স্বাতন্ত্র্য, ইন্টার অপারেটেবলিটি গুরুত্বপূর্ণ। এস্তোনিয়া ও তুরস্কের মতো আমরাও ডেটার অ্যাকসেস বিষয়ে উদার হতে চাই। পাশাপাশি বাজারে বাইরে থেকে আসা ফোনের দামের চেয়ে দেশে তৈরি মোবাইল ফোনের দাম বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষ সেই ফোনগুলো কিনবে এটাই স্বাভাবিক উল্লেখ করে, দেশে উৎপাদিত ফোনের দাম বেশি হওয়ার বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন আইসিটি সচিব।
অন্যদিকে এ ফোনগুলো বাংলাদেশের নেটওয়ার্কে সচল হওয়ার বিষয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন বিটিআরসি চেয়ারম্যন এমদাদ উল বারী। তিনি বলেন, টেলিকম খাতে অতিরিক্ত লাইসেন্স দেওয়া ও লেয়ারের পর লেয়ার তৈরি করে নেটওয়ার্ককে টুকরো টুকরো করায় ব্যবসায় সফল হয়নি। এ খাতটি হেভি ক্যাপেক্স হয়ে গেছে। কিন্তু এ ইন্টারনেট বাতাসের মতো ফ্রি হওয়া উচিত। ডেটাকে জলের দামে আনতে হবে। ডিজিটাল সেবা বাড়লে এ নেটওয়ার্ক সচল হবে। এজন্য প্রচুর ডেটা সেন্টার দরকার। অ্যাডভান্স লেভেলের ফিনটেক দরকার। একই সঙ্গে আরবান টু লোকালে এক দেশ এক রেটের গ্যাপ তুলে ধরতে হবে। এজন্য সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
বিটিআরসির সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. খলিল উর রহমানের সঞ্চালনায় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চালডাল ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা সিইও ওয়াসিম আলিম। তিনি জানান, ভারতে ১০ মিনিটে ১ জিবি ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও বাংলাদেশ এ সংখ্যায় অনেক পিছিয়ে। বাংলাদেশের চেয়ে ভারত ১ হাজার গুণ বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ডেটার দাম বেশি হওয়ায় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। তাই সব মোবাইল অপারেটরের উচিত ১০ টাকায় এক মাসের জন্য ২ জিবি ডেটা অফার করা। এজন্য অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন লেয়ার তুলে নেওয়া ও ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দেওয়া দরকার।
বিটিআরসির সামাজিক সুরক্ষা তহবিল রয়েছে উল্লেখ করে বিটিআরসি কমিশনার মো. খলিল উর রহমান বলেন, প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে টেলিকম সেবা পৌঁছে দিতে এ তহবিল থেকে টেলিকম অপারেটরদের সহায়তা করা হয়। এজন্য কিছুদিন আগেই এ তহবিল থেকে আমরা সব খাতের কাছে প্রকল্প সহায়তার আহ্বান করেছি। যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডিজিটাল সেবার জন্য কিছু করবেন তাদের আর্থিক সহায়তা করা হচ্ছে। পাশাপাশি এখন আমরা টেলিকম ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন প্ল্যাটফর্ম স্থাপনের পরিকল্পনা করছি। এখান থেকে শিক্ষাবিদ, খাতসংশ্লিষ্ট উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তিগত বা এককভাবে তাদের উদ্ভাবনী ধারণা দিয়ে আর্থিক সহায়তা বা প্রণোদনা পাবেন। উদ্ভাবনগুলো ডেটাভিত্তিক জিজিটাল চ্যানেলে হতে হবে।
বক্তব্যে টেলিকম বিশেষজ্ঞ মাহতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিটিআরসি চাইলেই বিভিন্ন খাতের সেবা সুলভ করতে দায়িত্ব নিতে পারে। ডেটার ডুপলিকেশন বন্ধে দায়িত্ব নিতে হবে। নির্ভরযোগ্য ডেটাসেট প্রকাশে দায়িত্ব নিতে হবে। এ ছাড়া এমএফএস সেবার অধিকার টেলকোকেও দেওয়া দরকার।
সভায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের টাস্কফোর্স সদস্য এবং বিডিজবস প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর বলেন, ব্রডব্যান্ডের মতো মোবাইল ইন্টারনেটেরও দাম বেঁধে দেওয়া দরকার। বিটিআরসির রেভিনিউ শেয়ার ও এসএফও ফান্ডের বিষয় পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অন্তত দুই বছর এসওএফ ফান্ড বন্ধ রাখা দরকার। গুগল, ফেসবুক ও আকামাই যেন দেশে আসে সেজন্য কনটেন্টের দায় শুধু কনটেন্টদাতার ওপর রাখতে হবে। একই সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হোক এনটিটিএন এবং বিগত সময়ে যেসব প্রতিষ্ঠানকে বেআইনি সুবিধা দেওয়া হয়েছে তাদের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ সময়ের দাবি।
এমআইএসটির সাবেক অধ্যক্ষ মেজর জেনারেল ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, এআইভিত্তিক সল্যুশন ইআরপি বা স্বাভাবিক কোনো সেবা নয়। এ বাজারটা এখনও প্রস্তুত নয়। চ্যাটজিপিটি একাই এ কাজ করছে। এআইয়ের খাদ্য হচ্ছে ডেটা। তাই ডেটা শেয়ারের একটি প্ল্যাটফর্ম থাকা দরকার।
শিখো প্রতিষ্ঠাতা শাহির চৌধুরী বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল শিক্ষা থেকে, শেষ হয়েছে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন নিয়ে। অপারেটরদের অবকাঠামোর উন্নয়নে মনোযোগী হওয়া দরকার। তারা শিক্ষা কিংবা বিনোদনের কাজ করবে না। বৈষম্য দূর করতে ডিজিটাল সেবার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে ডিজিটাল সেবা গ্রহণে নাগরিকদের অভ্যস্ত করে তোলাও আমাদের দায়িত্ব।
এইটিটিপুল বাংলাদেশের মুনাফ মুজিব চৌধুরী বলেন, ডেটার অ্যাকসেসের সঙ্গে এর মিনিংফুল ব্যবহারের দিকে বেশি মনোযোগী হওয়া দরকার। ডেটা ব্যবহার করে কোন সার্ভিসে ভালো হবে সে বিষয়টিই জানে না অনেকে। বাংলাদেশের সঙ্গে মেটা বা ফেসবুকের সম্পর্ক খুব খারাপ। অথচ বাংলাদেশ ফেসবুকের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনের বাজার। তাই বিটিআরসিকে এ খাতের ভালোমন্দের বিষয়টির নিবিড় গবেষণা ও সৃজনশীলতার দিকে নজর দিতে হবে।
পাঠাও সিইও ফাহিম আহমেদ বলেন, বিগত সরকারের সময় ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ১৫ দিন বাংলাদেশে ফেসবুক বন্ধ ছিল। ৬০ শতাংশ ব্যবসায়ী ফেসবুকের মাধ্যমে ব্যবসা করে। সে সময় ৭৫০ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের। তাই ডেটার লোকালাইজেশনের সঙ্গে ডেটা প্রটেকশন ও কনজিমার্স প্রটেকশন নিয়ে আমাদের বেশি নজর দেওয়া দরকার।
ব্র্যাক ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) সাব্বির হোসেন বলেন, ইউএসডি ব্যবহারে এসএমএস খরচ কমানো দরকার। টোলফ্রি লাইন দ্রুততার মধ্যে নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। যেকোনো আপদকালে কীভাবে ডিজিটাল সেবা চালু রাখা যায় সে বিষয়ে রেগুলেশন প্রত্যাশা করি।
সভায় বিটিআরিসর ভাইস প্রেসিডেন্ট আমিনুর রহমান, কমিশনার মুশফিক মান্নান, পরিচালক (এসএম) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনিরুজ্জামান, গ্রামীণ ফোনের হেড অব ডিজিটাল চ্যানেলস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন জাহিদ জামান, বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান, সেবা এক্সওয়াইজেডের সহপ্রতিষ্ঠাতা ইলমুল হক সজীব, শেয়ার ট্রিপ সিইও সাদিয়া হক, দারাজ বাংলাদেশের প্রধান করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার এএইচএম হাসিনুল কুদ্দুস রুশোসহ ডিজিটাল সেবা প্রদানকারী প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা মতামত দেন।