× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ওয়ারী আর ‘আইলো না’

রুবেল রেহান

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৪ ১০:২৯ এএম

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৪ ১০:৫৮ এএম

তারুণ্যের স্রোত থমকে যাওয়ায় এতিহ্যবাহী ওয়ারী ক্লাব এখন মৃতপ্রায়। ছবি : আ. ই. আলীম

তারুণ্যের স্রোত থমকে যাওয়ায় এতিহ্যবাহী ওয়ারী ক্লাব এখন মৃতপ্রায়। ছবি : আ. ই. আলীম

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের শতবর্ষী ক্লাবগুলোর সোনালি অতীত হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার দায়ও অনুভব করেনি কেউ। শতবর্ষী ক্লাবগুলোকে নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশের পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক আয়োজনের আজ দ্বিতীয় পর্ব। 

একটা স্পোর্টিং ক্লাব, ক্রীড়াঙ্গনে যাদের লক্ষ্য কেবল শিরোপা জেতা নয়; লক্ষ্য স্পোর্টিং কালচার বা পরিবেশ তৈরি করা। তৃণমূল পর্যায় থেকে খেলোয়াড় তুলে আনা। তাদের পরিচর্যা করে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করা। ইতিহাস, ঐতিহ্য আর গৌরবের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মতিঝিল পাড়ার ওয়ারী ক্লাবের ক্ষেত্রে এই কথাগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ তো বটেই, এই উপমহাদেশেরই অন্যতম পুরোনো ক্লাব এটি। তবে তারুণ্যের স্রোত থমকে যাওয়া ১২৬ বছর বয়সি ক্লাবটি এখন যেন এক মৃত নদী। 

১৯৫৫ সালের ডিসেম্বরেই ঢাকায় অনুষ্ঠিত কোয়াড্রাঙ্গুলার ফুটবল টুর্নামেন্টের সময় পাকিস্তানি ও ভারতীয় ফুটবল দলের কর্মকর্তা ও খেলোয়াড়দের ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) প্র্যাকটিস ম্যাচ শেষে ওয়ারী ক্লাবের লনে বসে গল্প-আড্ডায় দেখা যেত।

বিলুপ্ত হওয়া ওয়েলিংটন ক্লাবের কয়েকজন কর্মকর্তা ১৮৯৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ওয়ারী ক্লাব। রায়বাহাদুর সুরেন্দ্র নাথ রায় ছিলেন এই ক্লাবটির প্রতিষ্ঠাতা। পরবর্তী সময়ে এই নামে ভারতেও একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১২৫ বছর পূর্তি উদযাপন করতে যাচ্ছে ওয়ারী ক্লাব। ২০০০ সালের ২১-২৬ এপিল শতবর্ষ উদযাপন করা ক্লাবটিকে এখন লড়াই করতে হচ্ছে অস্তিত্বের সঙ্গে। একটা সময় ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, টেবিল টেনিস এবং ভলিবলে স্বপ্রতাপে অংশ নিত ওয়ারী ক্লাব। ভলিবল ও টেবিল টেনিসে পুরোনো ছাপ এখনও আছে। হকিতে নেমে গেছে দ্বিতীয় স্তরে, ফুটবলেও তাই। আর ক্লাব থেকে ক্রিকেট তো হারিয়ে গেছে আরও আগেই। 

অথচ ক্রিকেট দিয়েই সর্বপ্রথম ক্লাবের নাম উজ্জ্বল করেছিল ওয়ারী। দেশের ক্লাব ইতিহাসে প্রথমবার ওয়ারী ক্লাবই বাইরের দেশ থেকে খেলোয়াড় নিবন্ধন করে। পঞ্চাশ ষাটের দশকে ওয়ারী ক্লাবের তখন দারুণ ক্রিকেট টিম। অধিনায়ক ছিলেন এম আহমেদ চাঁদের মতো ক্রিকেটার। উইকেটের পেছনে গ্লাভস হাতে ছিলেন এম এ খান ফনু, যিনি ফুটবলার হিসেবেও পরিচিত। এই দলের দুই ক্রিকেটার মইনুদ্দিন মাহমুদ ও সুকুমার রায় সে সময় ছিলেন ঢাকার ক্রিকেটের অন্যতম তারকা। দুজনেই পাকিস্তান কায়েদে আজম ট্রফিতে খেলেছিলেন। ক্লাবের মাধ্যমে জানা যায়, সেই সময় শ্রীলঙ্কান ফার্নান্ডোকে নিয়ে রীতিমতো আলোচনার ঝড় ওঠে মতিঝিল পাড়ায়।

ক্রীড়াসাংবাদিক ও লেখক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান ব্রিটিশ আমলকেই ওয়ারীর সেরা সময় বলে আখ্যায়িত করেছেন। 

ক্লাবের পরিচিতি দেশ ছাড়িয়ে দেশের বাইরেও ছিল। সে সময় ঢাকায় কোনো বাইরের দল এলে ওয়ারী ক্লাবে একবার হলেও ঘুরে যেত। এমন অনেক ঘটনাই আছে।

 ওয়ারী ক্লাবের শতবর্ষ স্মরণিকায় লেখক এবং ক্রীড়াসাংবাদিক মুহাম্মদ কামরুজ্জামানের লেখা থেকে ‍দুটি ঘটনা তুলে ধরা হলো। ১৯৫৫ সালের জানুয়ারিতে ভারত-পাকিস্তান টেস্ট ম্যাচের আগে স্টেডিয়ামে নেট প্র্যাকটিস শেষে পাকিস্তানের অধিনায়ক আব্দুল হাফিজ কারদারসহ সেই দলের আরও কয়েকজন খেলোয়াড় ওয়ারী ক্লাবের লনে বসে গল্প-আড্ডায় হাজির হয়েছিলেন। ওই বছরের ডিসেম্বরেই ঢাকায় অনুষ্ঠিত কোয়াড্রাঙ্গুলার ফুটবল টুর্নামেন্টের সময় পাকিস্তানি ও ভারতীয় ফুটবল দলের কর্মকর্তা ও খেলোয়াড়দের ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) প্র্যাকটিস ম্যাচ শেষে ওয়ারী ক্লাবের লনে বসে গল্প-আড্ডায় দেখা যেত। সেই টুর্নামেন্টের ম্যাচ পরিচালনা করতে আসা রেফারি প্রতুল চক্রবর্তী ঢাকা ওয়ারী ক্লাবের সাবেক খেলোয়াড় ছিলেন। ওয়ারী ক্লাবের সাবেক এই ফুলব্যাক দেশভাগের পর কলকাতায় চলে যান। 

ক্রিকেট-ফুটবলের বাইরে ভলিবলে সর্বোচ্চ লিগ জেতার রেকর্ড ওয়ারী ক্লাবের। পাকিস্তান আমল ও স্বাধীনতার পর হকিতেও শিরোপা জয়ের রেকর্ড রয়েছে। ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন না হলেও রানার্সআপের গৌরব আছে। ফুটবলে বড় কোনো সাফল্য না থাকলেও দেশের ফুটবলে ভূমিকা আছে ক্লাবটির। ঢাকা ফুটবল ও হকি লিগ শুরুর পেছনেও ওয়ারীর অবদান রয়েছে বলে জানা যায়। ৭০ দশকে ফুটবল পাড়ায় বেশ আলোড়ন ছড়ায় ওয়ারী ক্লাব। ১৯৭১ সালে ক্লাবটির বয়স তখন ৭৩। হঠাৎ করে সেই সময় ‘ওয়ারী আইলো’ বলে স্লোগান ওঠে। সেটির রহস্য জানান বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মহিদুর রহমান মিরাজ, ওয়ারী আইলো যে স্লোগানটা সেটা এমিলি ভাইয়ের (সম্রাট হোসেন এমিলি) থেকে। তিনি তখন এই ক্লাবে খেলতেন। খুব সম্ভবত ১৯৮৫ বা ১৯৮৬ সালের কথা। সেবার আবাহনী-মোহামেডানকে হারাই। দুই লেগে হারাই ঢাকা আবাহনীকে। আবাহনীকে হারানোর পর থেকেই ঢাকা মোহামেডান টিপ্পনী কেটে আবাহনীকে খোঁচা দিত ‘ওয়ারী আইলো’ বলে। যেটা পরবর্তী সময়ে ক্লাবের স্লোগানই হয়ে যায়। মানেুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। মাঠে খেলতে গেলেই গ্যালারিতে উল্লাস হতো ‘ওয়ারী আইলো’ ধ্বনিতে।

বর্তমানে ক্লাবটির সাধারণ সম্পাদকের পদে থাকলেও এই ওয়ারী ক্লাবের সাবেক ফুটবলার ছিলেন মহিদুর রহমান। খেলেছেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে। তিনি যখন খেলেছেন সে সময় ক্লাবটি বেশ কিছু সাফল্য পেয়েছে। খেলোয়াড়ি জীবনে পেয়েছেন বড় বড় ক্লাবকে হারানোর স্বাদ। আশির দশকে নিয়মিতই অন্তত একটি লেগে আবাহনীকে হারাত ওয়ারী। এমনটি শীর্ষ তিন ক্লাব- আবাহনী, মোহামেডান এবং ব্রাদার্সকে একই বছর হারানোর গৌরবও আছে ওয়ারী ক্লাবের। সেসব অতীত মনে করে গল্পের ছলে জানালেন নিজের সময়কার একটি মজার ঘটনা, সম্ভবত ১৯৯১ সালের কথা। ববি (ববি হামিদ) আমাদের স্ট্রাইকার ছিল। মৌসুমে আমাদের প্রথম খেলা ছিল ব্রাদার্সের সঙ্গে। ম্যাচে জোড়া গোল করল ববি, আমরা জিতলাম। পরের ম্যাচ মোহামেডানের সঙ্গে। ওই ম্যাচেও এক গোল করে ববি, আমরা মাচটা জিতলাম। রাতের বেলা হয়েছে কী- কায়সার ভাই (কায়সার হামিদ, মোহামেডানের ডিফেন্ডার), ববির বড় ভাই ওনার লাইসেন্স করা বন্দুক দিয়ে আমাদের টিনের ওপর গুলি ছুড়ছেন। গেটের সামনে সে কী চিল্লাচিল্লি কেন আমরা তাকে হারাইলাম।’

ক্লাবসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যমতে, কয়েকজন সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যক্তির হাত ধরে এই ক্লাবের জন্ম। এই ক্লাবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আভিজাত্য। ব্রিটিশ আমলে ঢাকা ফুটবল লিগ নিয়মিত ছিল না। সে সময় বিভিন্ন শিল্ড এবং ট্রফির নামে টুর্নামেন্ট হতো। সেই শিল্ডগুলোতে নিযমিত সাফল্য ছিল ওয়ারীর। কলকাতার মাঠেও দাপট ছিল ক্লাবটির। সিরাজুল ইসলাম বাচ্চুর একটি লেখা থেকে জানা যায়, ১৯১৭ সালে তখনকার লিগ চ্যাম্পিয়ন লিংকোলীন ক্লাবকে হারিয়ে ওয়ারী রীতিমতো বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। কলকাতার মোহনবাগানের বিপক্ষে দুবার মাঠে নামে ওয়ারী। ফলাফলে সমানে সমান, একবার জিত ও হার। প্রথম খেলায় ওয়ারী জেতে ২-১ ব্যবধানে। কিন্তু পরের ম্যাচটি ছিল সেমিফাইনাল। যেখানে ওয়ারী হার মানে সমান ১-২ গোলে। জানা যায়, ১৯১০ সালে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত করিয়ান্থ ক্লাব ঢাকায় এসেছিল। ঢাকা একাদশের হয়ে খেলা সেই ম্যাচে প্রথম একাদশের মধ্যে ১০ জনই ছিলেন ওয়ারীর খেলোয়াড়। ব্রিটিশ আমলে ওয়ারীর বেশ কিছু সাফল্য থাকলেও তার কোনো নথি নেই ক্লাবে। ক্রীড়াসাংবাদিক ও লেখক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান ব্রিটিশ আমলকেই ওয়ারীর সেরা সময় বলে আখ্যায়িত করেছেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ওয়ারী হকি টিম বেশ কয়েকবার শিরোপাও জেতে।

সেসব এখন অতীত। বর্তমানে প্রিমিয়ার লিগে নেই ওয়ারী। বিসিএলে খেলছে, তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরেই ওঠানামা করছে। যদিও মহিদুর রহমান আশাবাদী- ক্লাব আবার জৌলুস ফিরে পাবে। ক্যাসিনোমুক্ত থাকলেও ক্যাসিনো অভিযানের ধাক্কা এসে লাগে এই ক্লাবের গায়ে। সেই ক্ষতি এখনও সামলে উঠতে পারেনি ওয়ারী। ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের ভাষায়, ‘অন্য অনেক ক্লাব ক্যাসিনোতে জড়িত থাকলেও ওয়ারী ক্লাবে সেসব কখনও ছিল না। সেটি পরবর্তী সময়ে প্রমাণও হয়েছে। অনেকেই এখন স্পোর্টিং ক্লাবকে মনে করে ক্যাসিনোর আসর। স্পন্সররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এসব কিছুর সঙ্গে জড়িত না থেকেও ওয়ারী ক্লাবের নাম উঠে গেছে তাতে। যা ক্লাবের জন্য বড় একটা ক্ষতি।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা