আবদুল্লাহ আল মাসুম
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৪ ১৯:২৫ পিএম
আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৪ ১৯:৪১ পিএম
বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরিচয় ক্রিকেট। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় কোনো শিরোপাই উপহার দিতে পারেননি মাশরাফি-সাকিবরা। পুরুষ দল কোনো শিরোপা জিততে না পারলেও সেটি ঠিকই পেরেছেন বাংলাদেশের মেয়েরা। ২০১৮ নারী এশিয়া কাপ ক্রিকেটের শিরোপা জিতে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয় লাল-সবুজ প্রতিনিধিরা। পরের বছর দক্ষিণ এশিয়ান গেমসেও স্বর্ণ জেতেন টাইগ্রেসরা। দেশের নারী ক্রিকেটের এত সব সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতীয় নারী দলের তারকা ক্রিকেটার জাহানারা আলমের নাম। অবশ্য গত বছর থেকে জাতীয় দলের বাইরে আছেন ৩০ বছর বয়সি এই পেস অলরাউন্ডার। তবে দলে ফিরতে নিজেকে সব সময় প্রস্তুত রাখছেন তিনি। আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিবসে দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদক আবদুল্লাহ আল মাসুমের সঙ্গে কথা বলেছেন জাহানারা। তার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-
প্রতিদিনের বাংলাদেশ : কেমন আছেন?
জাহানারা আলম : আলহামদুলিল্লাহ! সবার
দোয়ায় ভালো আছি।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ : ক্রিকেটের সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে?
জাহানারা আলম : যখন স্কুলে পড়ি তখন থেকেই
খেলাধুলা করতাম। শুরুটা ছিল ফুটবল, হ্যান্ডবল, ভলিবল দিয়ে। যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি
তখন প্রথম ক্রিকেটে আসি। সেটাও বেশ নাটকীয়ভাবে। ২০০৭ সালে যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড
(বিসিবি) প্রথম নারী ক্রিকেট দল গড়ে, তখন স্কুলে স্কুলে নারী ক্রিকেটারের খোঁজ চলছিল।
সেখান থেকেই আমার ক্রিকেটার হয়ে উঠে আসা।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ : লম্বা সময় জাতীয়
দলকে সার্ভিস দিয়েছেন। সামনেও হয়তো সে সুযোগ আবার আসবে। ক্রিকেটার হিসেবে কেমন অনুভব
করেন?
জাহানারা আলম : ক্রিকেটের সাথে আমার
পথচলা ১৭ বছরের, আর খেলোয়াড় হিসেবে ২১ বছর হয়ে গেল। সব মিলিয়ে যদি একজন নারী ক্রীড়াবিদ
হিসেবে বলি, জার্নিটা এতটা সহজ ছিল না। খুব কঠিন ছিল আমার জন্য। অনেক স্ট্রাগল করেছি।
অনেক বাধা পার হয়ে আজকের এই জায়গায় এসেছি। আলহামদুলিল্লাহ আমি গর্বিত এজন্য যে, আল্লাহর
রহমতে ও নিজের পরিশ্রমে বাংলাদেশকে দেশ ও দেশের বাইরে প্রতিনিধিত্ব করতে পারছি।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ : আপনি বাংলাদেশ
দলের অধিনায়কত্ব পালন করেছেন। আপনার জন্য জার্নিটা কেমন চ্যালেঞ্জিং ছিল?
জাহানারা আলম : আমি বাংলাদেশ দলে প্রায়
আড়াই বছর ক্যাপ্টেন ছিলাম। ২০১৫, ২০১৬ বিশ্বকাপের পর ২০১৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত।
এর আগে ২০১৩ সালের পরপর থেকে দুই বছর সহঅধিনায়ক ছিলাম। সব মিলিয়ে বলতে পারেন জার্নিটা
এতটা সহজ ছিল না।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ : বাংলাদেশের সব
বড় বড় সাফল্যের অংশীদার ছিলেন আপনি। নিশ্চয়ই এসবে বেশ গর্ব হয় আপনার?
জাহানারা আলম : ২০১১ সালে বাংলাদেশের জার্সিতে আমাদের ১১ জনের একসাথে অভিষেক হলো। ২০১৪ সালে ঘরের মাটিতে বিশ্বকাপ খেললাম। এরপর ২০১৮ বিশ্বকাপে আইসিসির সেরা বারোতে নির্বাচিত হয়েছি। এরপর ২০১৮ এশিয়া কাপের শিরোপা জিতলাম আমরা। আল্লাহর রহমতে ফাইনালে শেষ দুই রান এসেছিল আমার ব্যাট থেকে। এরপর ২০২০, ২০২২, ২০২৩ বিশ্বকাপ খেলেছি। আমি এসবে খুব গর্ববোধ করি।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ : কিছু দিন আগে পুরুষদের
বিপিএলের দশম আসর শেষ হলো। কিন্তু নারী বিপিএল এখনও আলোর মুখ দেখেনি। বিসিবির ভাষ্যে,
চলতি বছরের ডিসেম্বর অথবা নতুন বছরের জানুয়ারিতে মাঠে গড়াবে নারী বিপিএল। এ বিষয়ে
আপনার মন্তব্য কী?
জাহানারা আলম : কোনো জিনিস তৈরি করলে
তাড়াহুড়া করে শুরু করলে আসলে কিছুই হয় না। আপনি যদি দেখেন, ভালো কিছু শুরু করতে হলে
সময় লাগবে। পাকিস্তান কিংবা ভারতের কথা যদি চিন্তা করেন, তারাও কিন্তু পুরুষের চেয়ে
দেরিতে লিগ শুরু করেছে। আমরা আশাবাদী, খুব শিগগিরই নারী বিপিএল চালু হবে। তবে এটা যদি
আরও তিন বছর আগে শুরু হতো, তাহলে আমাদের নারী ক্রিকেটের জন্য খুব ভালো হতো।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ : কেন আপনার মনে
হয়, তিন বছর আগে নারী বিপিএল চালু করা দরকার ছিল?
জাহানারা আলম : আমাদের পুরুষ ক্রিকেট
যদি দেখেন, আমরা কিন্তু ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জিতেছিলাম। কিন্তু আমাদের দেশের ক্রিকেটের
প্রসার শুরু হয়েছিল ২০০০ সালের পর থেকে। সেদিক থেকে যদি চিন্তা করি, ২০১৮ সালের এশিয়া
কাপ জেতার পর যদি এটা (নারী বিপিএল) চালু হতো, তাহলে বেশি ভালো হতো। এটি চালু হলে আর্থিক
দিকটার চেয়ে স্কিলের দিক দিয়ে বেশি কাজে দিত। আইপিএল, বিগব্যাশ কিংবা পিএসএলে তিন-চারজন
বিদেশি প্লেয়ার খেলে থাকেন। তাদের সঙ্গে ড্রেসিংরুম শেয়ার, জ্ঞান আদান-প্রদান, তাদের
লাইফস্টাইল, ম্যাচের পরিকল্পনা, ফিটনেস সম্পর্কে জানা, মাঠে একসঙ্গে নামলে ঘরোয়া ক্রিকেটাররা
অনেক এগিয়ে যান। আমার মনে হয়, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে বড় বড় দলের বিপক্ষে ফাইট করতে
হলে, সিরিজ জিততে হলে, আপনাকে সেই লেভেলে প্রস্তুত হতে হবে। আগে তো আমরা সেভাবে ম্যাচ
খেলার সুযোগ পেতাম না। আলহামদুলিল্লাহ এখন আমরা আইসিসির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছি।
আমার মনে হয়, আগামী বছর থেকেও যদি নারী বিপিএলটা শুরু হয়, তাহলে ক্রিকেটাররা আর্থিক
ও স্কিল দুই দিকেই লাভবান হবেন।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ : নারীদের ঘরোয়া
ক্রিকেট কাঠামো শক্ত নয়। মেয়েদের স্কুল ক্রিকেট নেই, ঘরোয়া লিগের সূচি এখনও একটা কাঠামোতে
পৌঁছতে পারেনি। এ নিয়ে কি আপনার আক্ষেপ আছে?
জাহানারা আলম : এটা আসলে আক্ষেপের বিষয় না। কিছু কিছু বিষয় যদি আপনার আগে প্ল্যান করা থাকে, তাহলে ভালো হয়। পুরুষ ক্রিকেটের সূচির কথা কিন্তু সবাই জানে। সে অনুযায়ী কিন্তু ক্রিকেটাররা প্ল্যান করতে পারছে। মেয়েদের ক্রিকেটে যদি এমন কিছু থাকত, তাহলে খুব ভালো হতো। আগে কিন্তু আমাদের ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট খেলতেও বোর্ড টু বোর্ড যোগাযোগ করতে হতো। এখন চ্যাম্পিয়নশিপের আন্ডারে আসায় কিন্তু সেটা করতে হচ্ছে না। তাই বোর্ডও এখন নতুন করে চিন্তা করছে, কীভাবে একটা ক্রিকেট ক্যালেন্ডার তৈরি করা যায়। মেয়েরা বেশি খেলার সুযোগ পেলে আমাদের পাইপলাইন আরও শক্ত হবে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ : কোনো নারী যদি
ক্রিকেটে আসতে চায়, তাদের প্রতি আপনার বার্তা কী থাকবে?
জাহানারা আলম : বর্তমানে নারীরা কিন্তু
অনেক ভালো সাফল্য আনছে। কারও যদি মনের মধ্যে ইচ্ছা থাকে আমি খেলাধুলা করতে চাই, তাহলে
ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। এজন্য পরিবারের সাপোর্ট পাওয়া বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের
লোকজনকে বোঝাতে হবে যে আমি খেলতে চাই, এগোতে চাই। তাই আমার বার্তা থাকবে, হাল না ছেড়ে
নিজের ফোকাস ধরে রাখা।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ : আপনার মূল্যবান
সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
জাহানারা আলম : আপনাকেও ধন্যবাদ।