আবদুল্লাহ আল মাসুম
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০০:৩৪ এএম
আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১২:৪৯ পিএম
একাধিক বিতর্ক প্রশ্নবিদ্ধ করছে বিপিএলকে। ছবি : সংগৃহীত
ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে জমজমাট আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)। কিন্তু ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক এই টুর্নামেন্ট মানেই যেন বিতর্ক। প্রতিটি জায়গাতেই অগোছালো আর অব্যবস্থাপনার ছাপ সুস্পষ্ট। তিক্ত অতীত ঝেড়ে মুছে এবার নতুন আঙ্গিকে বিপিএল আয়োজনের চেষ্টা করেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি। মাঠ ও মাঠের বাইরের বিতর্কই হয়েছে এবারের আসরের সঙ্গী।
সাত দলের এবারের দশম আসরে বেশ কিছু জায়গায় এসেছে নতুনত্বও। টিভি সম্প্রচারে নতুনত্ব আনতে প্রথমবারের মতো স্পাইডার ক্যাম, ড্রোন ক্যামেরা, ব্যাগি ক্যামেরাসহ উন্নতমানের সব প্রযুক্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া আসরের শুরু থেকেই রয়েছে পূর্ণাঙ্গ ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম (ডিআরএস)। সঙ্গে যুক্ত রয়েছে হক আই প্রযুক্তিও। এ ছাড়া বিপিএলে প্রথমবার সব দলের দায়িত্বেই রয়েছেন দেশি কোচ। কিন্তু এতসব আয়োজনই যেন সকলই গরল ভেল, এড়ানো যাচ্ছে না বিতর্ক।
টিম হোটেলে সোহান-ফোর্ডের হাতাহাতি: বিপিএলের চট্টগ্রাম পর্বে টিম হোটেলে দুই ফ্র্যাঞ্চাইজির দুই ক্রিকেটারের মধ্যে হাতাহাতির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। রুমে উঁকি দেওয়া নিয়ে এই ঘটনা ঘটে রংপুর রাইডার্স অধিনায়ক নুরুল হাসান সোহান ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটার ম্যাথু ফোর্ডের মধ্যে। সোহান রংপুর রাইডার্সের এক কর্মকর্তার রুমে যেতে গিয়ে ভুল করে ফোর্ডের রুমে উঁকি দিয়ে বসেন। এতে চটে গিয়ে সোহানকে বাজে মন্তব্য করে বসেন ফোর্ড। এরপর দুজনের মধ্যে হাতাহাতি লেগে যায়। ঘটনা চলাকালীন দ্রুত দুই দলের ম্যানেজমেন্ট ও নিরাপত্তায় নিয়োজিত কর্তারা পরিস্থিতি শান্ত করেন। এই দুই ক্রিকেটারকে শান্ত করতে গিয়ে দুই ফ্র্যাঞ্চাইজির কর্মকর্তারাও আঘাতপ্রাপ্ত হন।
সাংবাদিকের সঙ্গে সামিত প্যাটেলের দুর্ব্যবহার: গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে অনুশীলন করতে এসেছিলেন সিলেট স্ট্রাইকার্সের ক্রিকেটাররা। অনুশীলনের ফাঁকে এক গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেন সিলেটের ইংলিশ অলরাউন্ডার সামিত প্যাটেল। সাক্ষাৎকার শেষ করার কয়েক মিনিট পর কোনো এক কারণে রেগে যান সামিত। সাংবাদিককে ডেকে এনে সাক্ষাৎকার প্রকাশ করতে না বলেন। এরপর তার উপস্থিতিতেই রেকর্ড করা সাক্ষাৎকারের অডিও ক্লিপস ডিলিট করেন। পরে দেশের গণমাধ্যমের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। যদিও পরে সামিত তার নিজের ভুল বুঝতে পেরে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি দুঃখপ্রকাশ করেন। ভবিষ্যতে তিনি এ ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে সেই দিকে সজাগ থাকবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেন।
বিপিএলের লভ্যাংশ চান কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের মালিক: বিপিএলের সবচেয়ে সফলতম দল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স। এখন পর্যন্ত ৯ আসরের মধ্যে সর্বাধিক চারবারের চ্যাম্পিয়ন তারা। বর্তমান চ্যাম্পিয়নও তারা, চোখ এবার পঞ্চম শিরোপায়। স্থানীয় ও বিদেশী তারকায় ঠাসা দল নিয়ে এগোচ্ছে সেভাবেই। তবে বিপিএলের রাজস্ব ভাগাভাগি না করলে পরের মৌসুম থেকে না থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন দলটির মালিক নাফিসা কামাল। তারা টিকিট রাইটস, গ্রাউন্ড রাইটস ও মিডিয়া রাইটসের একটা অংশ চায়।
আনফিট মাশরাফিকে নিয়ে সমালোচনা: বিপিএলে গত আসরে সিলেট স্ট্রাইকার্সকে ফাইনালে তুলেছিলেন মাশরাফি বিন মর্ত্তুজা। তাই চলমান বিপিএলেও তার নেতৃত্বে আস্থা রেখেছিল সিলেটের ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। তবে তার অধীনে টানা পাঁচ ম্যাচে হার মানে দলটি। এরপর তার ফিটনেস নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। মাশরাফির ফিট না থাকা নিয়ে কড়া মন্তব্য করেন জাতীয় দলের সাবেক দুই অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল ও আকরাম খান। এরপর মাশরাফি নিজেও জানিয়েছেন খেলার জন্য তিনি আদর্শ পরিস্থিতিতে নেই। পরে রাজনৈতিক ব্যস্ততায় বিপিএল ছাড়েন ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’খ্যাত এই কিংবদন্তি।
শোয়েব মালিকের বিরুদ্ধে ফিক্সিং ইস্যু: বিপিএলে খেলতে এসে ম্যাচে এক ওভারে তিনটি নো বল করায় পাকিস্তানি তারকা শোয়েব মালিকের বিরুদ্ধে ফিক্সিংয়েরও অভিযোগ ওঠে। একজন স্পিনারের একই ওভারে তিনবার ওভার স্টেপিং খুব একটা দেখা যায় না। তাই অনেকেই শোয়েবের এই ঘটনার সঙ্গে ফিক্সিংয়ের গন্ধ খোঁজার চেষ্টা করছেন। তবে এমন গুজব উড়িয়ে দিয়েছেন বরিশালের মালিক মিজানুর রহমান ও মালিক নিজেই।
দেশি কোচদের নিয়ে তর্কাতর্কি: বিপিএলের চলতি আসরে সাত ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রধান কোচের দায়িত্বে রয়েছে স্থানীয়রা। তবে দলগুলোতে দেশি সব কোচ ক্লাব ক্রিকেটে কোচিং করানোরও যোগ্য না বলে বিস্ফোরক এক মন্তব্য করেছিলেন বিপিএল টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান রকিবুল হাসান। তার এমন মন্তব্যের পর কড়া জবাব দিয়েছেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের প্রধান কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন।
রকিবুলের মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করে সালাউদ্দিন বলেন, ‘কিন্তু একটা লোকাল কোচ তাহলে কীভাবে বড় হবে? সে তো আন্ডার নাইনটিনেরও হেড কোচ হতে পারবে না, এইচপির কিংবা বাংলা টাইগার্সেরও হেড কোচ হতে পারবে না। জাতীয় দলের হেড কোচও হতে পারবে না। সে কোথায় হেড কোচিং করাবেন? সারা জীবন কি আমরা সাপোর্টিং রোলে থাকব? আমাদের তো কখনও না কখনও স্টেপ আপ করতে হবে।’
বিপিএলে ছিল না উদ্বোধনী অনুষ্ঠান: এবার বিপিএলের উদ্বোধনীতে ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিকতা। কোনো অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হয়নি। শুধু বেলুন উড়িয়ে কিংবা উদ্বোধনী ম্যাচের দুই দলের ক্রিকেটারদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বিপিএলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিসিবি সভাপতি এবং যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী নাজমুল হাসান পাপন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নিয়ে বিপিএলের গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইসমাইল হায়দার মল্লিক বলেন, ‘অনেক সমস্যা ছিল। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচন শেষে আমরা সময় পেয়েছি খুব কম। এই সময়ের মধ্যে টুর্নামেন্ট মাঠে গড়ানোই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করা সম্ভব ছিল না। সব মিলিয়ে যে আমরা এবারের বিপিএল আয়োজন করতে পেরেছি, এটাই অনেক কিছু।’