রহিম শুভ, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ২১:৩৭ পিএম
আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ২৩:২৪ পিএম
বাংলাদেশ ফুটবলের তীর্থস্থান কলসিন্দুরের নাম দেশের সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে গেছে আন্তর্জাতিক আঙ্গিনাতেও। প্রত্যন্ত গ্রাম রাঙ্গাটুঙ্গীর নাম অজানা। দুটো জায়গাকে সুতোয় বেঁধেছে ফুটবল। এই রাঙ্গাটুঙ্গী গ্রামের ফুটবল মাঠ থেকেই উঠে এসেছেন সবে শেষ হওয়া অনূর্ধ্ব-১৯ সাফ আসরে বাংলাদেশকে শিরোপা জেতানো সাগরিকা।

ঠাকুরগাঁও সদর থেকে প্রায় ৪৬ কিমি দূরে রানীশংকৈল উপজেলা। আর এ উপজেলার রাঙ্গাটুঙ্গী গ্রামে নারীদের জন্য রয়েছে একটি ফুটবল মাঠ। বিকাল হলেই মেয়েরা সাইকেলে চেপে, কেউ হেঁটে চলে আসেন মাঠে। তাদের কারও কারও পরনে ট্র্যাক-স্যুট, জার্সি আর কাঁধে ব্যাগ। মাঠে পৌঁছে কেউ বুট পরছেন, কারও আবার খালি পা। অনুশীলনের জন্য মাঠে চিহ্ন (মার্কার) বসানো হয়েছে। এসব চিহ্নের ফাঁকফোকর দিয়ে বল আদান-প্রদান চলছে। আবার কখনও চলছে ফুটবল হাতে মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত শারীরিক কসরত।
তবে শুরুতে বিষয়টা এত সহজ ছিল না। মেয়েরা ফুটবল খেলবেন গ্রামবাসীর কত কথা, কত কটূক্তি! সেই কটূক্তি পেছনে ফেলে মেয়েদের সাফল্যে এখন গ্রামের মানুষ গর্ব করেন। পাশাপাশি মেয়েদের খেলায় উৎসাহ জোগান। রাঙ্গাটুঙ্গীর মাঠে বিভিন্ন জেলা থেকে নারী দলের খেলোয়াড়রা এসে প্রীতি ম্যাচ খেলেন। আর বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বজন ও প্রতিবেশীরা মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে তাদের মেয়েদের খেলা উপভোগ করেন।
সোহাগী, স্বপ্না, সাগরিকা সবাই নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড়। অজপাড়াগাঁয়ের একটি মাঠ থেকে তারা জায়গা করে নিয়েছেন জাতীয় পর্যায়ে। সবার মুখে মুখে রাঙ্গাটুঙ্গী ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমি। যদিও এই নামে কোনো সাইনবোর্ড নেই।
-65c797e28559e.jpg)
রানীশংকৈলের আবু বক্কর নামে একজন বলেন, এই রাঙ্গাটুঙ্গীর মেয়েরা এখন আমাদের গর্ব। আগে গ্রামের লোকজন এটা পছন্দ করতেন না। এখন পাঁচজন নারী ফুটবলার জাতীয় দলে খেলছেন। সবাই মেয়েদের খেলতে মাঠে পাঠান। এক খুদে ফুটবলারের বাবা নবদি কিসকু বলেন, মেয়েরা কেন ফুটবল খেলবে, শুরুতে আমরা কেউ রাজি ছিলাম না। মেয়েরা আমাদের নাম উজ্জ্বল করেছে। আমরা এখন মেয়েদের নিয়ে গর্বিত।
নারী ফুটবলার নাজমা আক্তার বলেন, শুরুতে আমরা অনেক বাধার মুখে পড়েছি। অনেকজন বলছে মেয়েরা কেন হাফপ্যান্ট পরে মাঠে খেলবে? বাবা-মায়েরা মাঠে খেলতে আসতে দিতেন না। এটা ছেলেদের খেলা। এখন আমাদের অনেক মেয়ে জাতীয় দলে খেলছে। তখন থেকে সবাই আমাদের উৎসাহ দিচ্ছে। আমি সাগরিকা আপুর মতো বড় খেলোয়াড় হতে চাই।
সাগরিকার বাবা লিটন আলী বলেন, আমার মেয়ে জাতীয় দলে খেলবে এটা আমি কখনও ভাবিনি। এখন তার নাম সারা দেশ জানে। বাবা হিসেবে আমি অনেক গর্বিত। সাগরিকার মা আনজুম আরা বেগম বলেন, প্রথমে যখন আমার মেয়ে ফুটবল খেলতে যায় তখন মানুষ নানান কথা বলেছে। অনেকে বলেছে মেয়ের বিয়ে হবে না। ফুটবল তো ছেলেদের খেলা। এখন আমার মেয়ে জাতীয় দলে খেলে, সবাই আমাদের বাসায় আসে, মেয়ের অনেক প্রশংসা করে।

রাঙ্গাটুঙ্গী গ্রামের মাঠে ফুটবল খেলতেন স্থানীয় কিশোর-তরুণরা। তাদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন রানীশংকৈল ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক তাজুল ইসলাম। ২০১৪ সালের আগস্টে ওই মাঠে ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করেন স্থানীয় লোকজন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কয়েকজন মেয়েকে ফুটবল নিয়ে ছোটাছুটি করতে দেখেন তাজুল ইসলাম। তখন তার ভাবনায় এলো মেয়েরাও তো ফুটবল খেলতে পারে। খেলা চলাকালে কিশোরীদের ডেকে পরিচিত হলেন। জানালেন ভাবনার কথা। প্রস্তাব পেয়ে কিছু মেয়ে রাজি হলেন।
এরপর শুরু হয় দল গঠনের কাজ। সহযোগিতার হাত বাড়ান ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর যুবক সুগা মুরমু, স্থানীয় জয়নুল আবেদিন ও সেতাউর রহমান। তবে খেলোয়াড় জোগাড় করতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়লেন তারা। মেয়েদের ফুটবল খেলা নিয়ে অভিভাবকদের ঘোর আপত্তি। মেয়েরা ফুটবল খেলবেÑ এটা কেমন কথা! তবে এতে সুগা, তাজুলরা দমে যাননি। আঠার মতো লেগে রইলেন অভিভাবকদের পেছনে। তাদের চেষ্টায় একেক করে মাঠে আসতে শুরু করলেন কিশোরীরা। অল্প কিছুদিনের মধ্যে ১৫ জনের একটা দল পেয়ে গেলেন তারা। গড়ে উঠল একটি ফুটবল দল। নাম দেওয়া হলো রাঙ্গাটুঙ্গী ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমি। আর পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন তাজুল ইসলাম নিজেই।
-65c7975d33134.jpg)
মেয়েদের ফুটবল দল গড়ে উঠলেও খেলোয়াড়দের বুট, জার্সিসহ তেমন কোনো সরঞ্জাম ছিল না। প্রান্তিক পরিবারের মেয়েদের পক্ষে ফুটবলের জন্য বাড়তি টাকা জোগান দেওয়াও ছিল কঠিন। তবে তাজুল ইসলাম দমার পাত্র নন। সাধারণ পোশাক আর খালি পায়েই মেয়েদের অনুশীলন চালাতে লাগলেন। পাশাপাশি চলতে থাকে ক্রীড়া সামগ্রী সংগ্রহের চেষ্টা। খেলার পেছনে খরচ করতে করতে বেতনের টাকা কখন ফুরিয়ে যায়, টেরই পান না তাজুল। একসময় স্থানীয় লোকজনও এগিয়ে আসেন। এরপর থেকে তাদের আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।