এনামুল আরেফিন
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২২ ১১:২৯ এএম
আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২২ ১৯:১০ পিএম
অ্যাডিলেড ওভাল স্টেডিয়াম। সংগৃহীত ছবি
এই স্টেডিয়ামের অনেক পরিচয়। তবে সবচেয়ে বড় পরিচয় এটা স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের মাঠ। অ্যাডিলেড ওভালের গ্যালারিতে প্রবেশের আগে হঠাৎ একটা ছোট্ট সাইনবোর্ডে চোখ পড়বে; লেখা ‘ব্র্যাডম্যান কালেকশন’। যেখানে শুধু বিস্ময় আর বিস্ময় চোখের সামনে, হাতের কাছে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের ক্রিকেট ইতিহাসের সবকিছুই!
সিডনিতে জন্ম, সেখানেই ক্রিকেটের হাতেখড়ি, ক্লাব ক্রিকেটের শুরু এবং অস্ট্রেলিয়ার হয়ে অভিষেক—সিডনির সঙ্গে শৈশব-কৈশোর ও যৌবনের শুরুর এই মিতালি থাকলেও মাত্র ২৫ বছর বয়সে ব্র্যাডম্যান অ্যাডিলেডের অভিবাসী হয়েছিলেন। ব্যস, বিশ্বের বুকে এ শহরটা তার নামেই বিখ্যাত হয়ে গেল! জন্ম সিডনিতে হলেও অ্যাডিলেডই ব্র্যাডমানের নিজ শহর। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলেছেন। ক্রিকেট প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন বেশ কয়েক বছর। তবে ক্রিকেট প্রশাসনে সবচেয়ে লম্বা সময়টা ব্র্যাডম্যান ব্যয় করেছেন দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার শহর অ্যাডিলেডে।
১৯৭০ সালের দিকে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার স্টেট লাইব্রেরির প্রধান হিডলে ব্রাইডসন উদ্যোগটা নেন। ডন ব্র্যাডম্যানের ব্যবহৃত ক্রিকেটীয়-অক্রিকেটীয় সবকিছুর সংরক্ষণের চেষ্টা চালান তিনি। ব্র্যাডম্যানের ডায়েরি লেখার অভ্যাস ছিল। সেই স্ক্র্যাপ বই তিনি স্টেট লাইব্রেরিকে দান করেন। লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ সেই স্ত্র্যাপ বইয়ের সূত্র ধরে ডন ব্র্যাডম্যানের ক্রিকেট জীবনের শুরু থেকে বিভিন্ন ধাপের পর্যায়ক্রম তৈরি করে।
১৯৮০ সালে অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. ডেভিড টনকিনের অনুরোধে ডন ব্র্যাডম্যান তার ব্যক্তিগত ব্যবহার্য বিভিন্ন জিনিস ও ক্রিকেটীয় স্মারক দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার রাজ্য লাইব্রেরিকে হস্তান্তর করেন। ‘ব্র্যাডমান কালেকশন’-এর জন্মকথা মূলত এটাই। তারপর অনেক বছর ধরে এই ব্র্যাডম্যান কালেকশন দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার মর্টলক লাইব্রেরি ও রাজ্য লাইব্রেরি ভবনে সংরক্ষিত ছিল। ২০০৮ সালে ব্র্যাডম্যান কালেকশন চলে আসে আসল ঠিকানায়, অ্যাডিলেড ওভালে!
প্রবেশমুখে বিশাল একটা লাইফসাইজ পোর্ট্রেট ঝুলছে ডন ব্র্যাডম্যানের। পাশেই লেখা সেই অমর বাণী—‘আমি কখনও কোনো কোচের কোচিং পাইনি। কখনও কেউ আমাকে শিখিয়ে দেয়নি কীভাবে ব্যাট ধরতে হবে।’
দেয়ালের চারধারে ব্র্যাডম্যানের ক্রিকেটীয় কীর্তি, রেকর্ড জ্বলজ্বল করছে। শুধু ক্রিকেটই নয়, পিয়ানো বেশ ভালো বাজাতে পারতেন ডন। প্রিয় পিয়ানোর সঙ্গে তার হাস্যোজ্জ্বল ছবির পাশে ক্যাপশন সেটাই জানাচ্ছে। কিছুদিন আবার ক্রীড়া সাংবাদিকতাও করেছেন, ডনের আত্মজীবনীতে সেই তথ্যও মিলল!
সেঞ্চুরির পর সেঞ্চুরি করা তার সেই ব্যাট, যে প্যাড নিয়ে খেললেন সেই প্যাড জোড়া, ক্রিকেট বুট, ব্যাগি গ্রিন ক্যাপ, ক্রিকেট সোয়েটার—লকার রুমে সবকিছুই পাওয়া গেল। তিন গ্রেট—স্যার লেন হাটন, স্যার গ্যারি সোবার্স ও স্যার ডন ব্র্যাডম্যানকে এক ফ্রেমেও দেখা গেল। কোনো এক পার্টিতে তিন ক্রিকেট গ্রেট এক হয়েছিলেন।
চারধারে ক্রিকেট ও ক্রিকেটময় ঐশ্বর্যের এত সম্ভার অথচ ছবি তোলার উপায় নেই। দেয়ালে সতর্কবাণী : ছবি তোলা বা ভিডিও করা নিষেধ!
বাড়িতে ক্রিকেট ব্যাটের বদলে ছোট্ট একটা ক্রিকেট স্টাম্প নিয়ে ব্যাটিং অনুশীলন করতেন ডন ব্র্যাডমান। মিনিট বিশেকের তৈরি একটি ভিডিও তথ্যচিত্রে সেটা জানা গেল। দেয়ালে এক হাতে স্কোয়াশ বল ছুড়ছেন আর সেই বলে স্টাম্প দিয়ে ব্যাটিং অনুশীলন করছেন! এভাবেই তার ব্যাটিং দক্ষতা!
ডনকে নিয়ে তৈরি গান বাজছে গ্রামোফোনে। ১৯৩০ সালে ইংল্যান্ডে অ্যাশেজ সিরিজের সময় গীতিকার জ্যাক ও’হগান লেখেন সেই বিখ্যাত গান : ‘আওয়ার ডন ব্র্যাডম্যান... ইজ দ্য গ্রেটেস্ট এভার প্লেড দ্য গেম’। লাইব্রেরির দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে সেই গানের সুর আরেকবার জানিয়ে গেল—‘ডন আসলে একজনই!’