প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৪ ১৭:৪৯ পিএম
আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২৪ ১৭:৫৪ পিএম
ঐতিহাসিক টেস্ট নায়ক শামার জোসেফ; ছবি : সংগৃহীত
ব্রিসবেন টেস্টের তৃতীয় দিন মিচেল স্টার্কের
বিধ্বংসী ইয়র্কারে পায়ের আঙুল ভেঙে গিয়েছিল শামার জোসেফের। যে কারণে রিটায়ার হার্ট
হয়ে সতীর্থদের কাঁধে ভর দিয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন তিনি। রক্তাক্ত হয়ে মাঠ ছাড়া ডানহাতি এই
পেসারের টেস্ট তখনই শেষ হয়ে গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। কিন্তু কে জানতো এই শামারের
হাত ধরেই গ্যাবায় ইতিহাস লিখবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ!
উত্তেজনায় ঠাসা দিবা-রাত্রির গোলাপি বলের এই টেস্টে রঙ বদলাচ্ছিল বারবার। যে কারণে ম্যাচের ভাগ্য পেন্ডুলামের মতো দুলছিল দুদিকে। একবার অস্ট্রেলিয়া তো আরেকবার মনে হচ্ছিল জিততে যাচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শেষ পর্যন্ত ৮ রানের রুদ্ধশ্বাস জয়ে ইতিহাস গড়েছে ক্যারিবীয়রা। ঐতিহাসিক এই জয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দীর্ঘ ২০ বছর পর জয়ের স্বাদ পেল ক্যারিবীয়রা। ২০০৩ সালে সবশেষ ঘরের মাঠে অজিদের বিপক্ষে জিতেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আর অস্ট্রেলিয়ায় তাদের হারিয়েছিল আরও আগে, ১৯৯৬-৯৭ মৌসুমে, পার্থ টেস্টে।
দেশকে এমন অবিশ্বাস্য জয় এনে দেওয়ার নায়ক আর কেউ নন, শামার জোসেফ। ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচ খেলতে নেমেই ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন ২৪ বছর বয়সী এই পেসার। দুর্দান্ত এক স্পেলে ১১.৫ ওভারে ৬৮ রানের বিনিময়ে ৭ উইকেট শিকার করেছেন এই ক্যারিবীয় পেসার। আগের ম্যাচে অভিষেকেও আলো ছড়ানো এই ক্রিকেটারই ম্যাচসেরার পাশাপাশি জেতেন সিরিজ সেরার পুরস্কার।
অথচ এদিন খেলার কথাই ছিল না শামার জোসেফের। আঘাত পাওয়া স্থানের স্ক্যান করাতে যেতে হয়েছিল হাসপাতালে। তিনি বোলিংয়ে ফিরতে পারেন সেটা চিন্তা করাই অসম্ভব ছিল। কিন্তু ব্যথানাশক ইনজেকশন নিয়ে সেই জোসেফই গড়ে দেন ব্যবধান। পায়ের চোট নিয়ে চতুর্থ দিনের প্রথম সেশনে টানা করেন ১০ ওভারের স্পেল, নেন ৬ উইকেট। বিরতি থেকে ফিরেও চালিয়ে যান বোলিং। তার হাত ধরেই জয়ের আনন্দে মাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
গ্যাবায় ঐতিহাসিক জয়ের পর প্রতিক্রিয়া
জানাতে গিয়ে সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাতে ভুল করেননি জোসেফ, 'উৎসাহ দেওয়ার জন্য কৃতিত্বটা কেবল
সতীর্থদের দিতে চাই। ব্যথা নিয়েও দল ও ক্যারিবিয়ান মানুষদের জন্য আমি চেষ্টা করে যেতে
চাই। আজকে আমার মাঠে নামার কথা ছিল না। তবে চিকিৎসক আমার পায়ের আঙুলে কিছু একটা করেছেন।
জানি কী করেছেন, তবে সেটা কাজে দিয়েছে। কেবল মৌলিক বিষয়গুলোয় থাকার চেষ্টা করেছি। এই
টেস্ট জিতে আমার কাছে মনে হচ্ছে পুরো সিরিজ জিতে গেছি আমরা।'
জীবন কখনো কখনো কল্পনাকেও হার মানায়। যার সবশেষ উদাহরণ হয়ে থাকবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের শামার জোসেফের নাম। বছর খানেক আগেও ছিলেন একটি সিকিউরিটি সংস্থার নিরাপত্তাকর্মী। সেখান থেকে নাটকীয়ভাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় দলে ডাক পান এই ক্রিকেটার। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্বাগতিক দলের বিপক্ষে অভিষেক টেস্ট ম্যাচ খেলতে নেমে প্রথম বলেই স্টিভেন স্মিথের মত তারকা ব্যাটারকে সাজঘরে ফিরিয়ে বিশ্বের নজর কেড়েছিলেন। প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে অভিষেকটা আরও রাঙান জোসেফ। অবশ্য এমন আগুনে বোলিংয়ের পরেও অ্যাডিলেডে হেরে যায় সফরকারীরা।
ব্রিসবেনে হওয়া দ্বিতীয় ও সিরিজের শেষ
টেস্টের প্রথম ইনিংসে বল হাতে খুব একটা ছাপ রাখতে পারলেন না গায়ানার বারাকানা নামে
ছোট্ট গ্রাম থেকে প্রথম কোনো খেলোয়াড় হিসেবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় দলে আসা শামার জোসেফ।
১১ ওভার বল করে ৫৪ রান দিয়ে পেয়েছিলেন মোটে একটি উইকেট। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে ভাঙা পা
নিয়েই বুক চিতিয়ে লড়লেন এবং দলকে জেতালেন।
শামার যোগ করেন, ‘আজ (রবিবার) সকালেও
আমি মাঠে আসার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। ডাক্তার আমাকে সকালে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কেমন
অনুভব করছি। বলেছিলাম, অনেক ব্যথা। সে পরে বললেন, মাঠে নামতে এবং তার বিশ্বাস ছিল আমি
বোলিং করতে পারব। যখন পাঁচ উইকেট নিলাম, আনন্দে অশ্রু ঝরছিল। আমি এখন অনেক খুশি। এমনকি
কোনো ক্লান্তি নেই। মনে হচ্ছে, বোলিং চালিয়ে যেতে পারব।’
জোসেফ যে মাঠে নামতে পারবেন শুরুতে
জানতেন না ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েট। খেলা শুরুর ঘণ্টা খানেক আগে তাকে
জানানো হয় বিষয়টি। এরপর মাঠে নেমে জোসেফ যেটা করলেন, পুরো দলের জন্য এটা একটি উদাহরণ।
ব্র্যাথওয়েট জানান, ‘দিনের খেলা শুরুর ঘণ্টা খানেক আগে জানতে পারলাম, সম্ভবত শামারকে
পেতে যাচ্ছি। চিকিৎসক বলেছিল, তাকে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে এবং সে ভালো আছে। এরপর শামার
নিজে বলল, সে মাঠে নামতে যাচ্ছে। আমার তাকে সমর্থন করতেই হতো।’
এদিকে স্টিভ স্মিথের হার না মানা ইনিংসের
পরও খুব কাছে গিয়ে হারের হতাশায় পুড়ছে অস্ট্রেলিয়া। তবে জোসেফের দুর্দান্ত বোলিংয়ের
প্রশংসা করতে ভোলেননি স্বাগতিকদের অধিনায়ক প্যাট কামিন্স, ‘ম্যাচ হারার পর অবশ্যই হতাশ
আমরা। তবে চমৎকার একটি টেস্ট ম্যাচ এবং দারুণ একটি সিরিজ ছিল এটি। বিশেষ করে শামার
আজকে যেভাবে বোলিং করেছে, সে দুর্দান্ত ছিল এবং দুর্ভাগ্যবশত আমরা যথেষ্ট ভালো ছিলাম
না।’