নজরুল ইসলাম
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৯:০৩ এএম
আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৯:৫৭ এএম
প্রথম ইতিহাসটা হয়েছে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে। মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টে অবিস্মরণীয় টেস্ট জয় ছিনিয়ে নিয়ে। পরে কীর্তি গড়েছে বাংলাদেশ সিলেটের মাটিতে। দেশের মাটিতে কিউইদের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় নিজেদের করে নিয়ে। লাল বলের ক্রিকেটে দুটি বড় কীর্তি গড়েছে টাইগাররা। এবার নতুন ইতিহাস লেখার পালা।
মাঠের প্রতিপক্ষ সেই নিউজিল্যান্ড। ভেন্যুটা কেবল পাল্টে গেছে। আজ থেকে অতিথিদের বিরুদ্ধে লাল-সবুজের মাঠের লড়াইটা শুরু মিরপুরে। সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে নিউজিল্যান্ডকে হারাতে পারলেই নতুন উচ্চতায় উঠবে দেশের ক্রিকেট। ব্ল্যাক ক্যাপসদের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ের রেকর্ড গড়বে টাইগাররা।
সিলেট টেস্টের পুনর্মঞ্চায়নের লক্ষ্য নিয়ে শেরেবাংলায় লড়াইয়ে নামবে ক্যাপ্টেন নাজমুল হোসেন শান্তর দল। জয় ভিন্ন বিকল্প কোনো ভাবনাই দেশের ক্রিকেটারদের মাথায় নেই। টাইগারদের আরও একটি জয়ের ফানুস ওড়াতে সাহস জোগাচ্ছে নিজেদের চেনা উইকেট। হাতের তালুর মতো বিশ্বাসী হোম কন্ডিশন। সঙ্গে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে গ্যালারি। সিলেট টেস্টের মতো এবারও সবকিছুই নিজেদের পক্ষে।
যদিও নিউজিল্যান্ড সিরিজ নিয়ে শুরুর দিকে তেমন কোনো প্রত্যাশা ছিল না বললেই চলে। কারণ ভারতের মাটিতে ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল যাচ্ছেতাই। তবে সিলেট টেস্ট জয়ের স্বাদ থাকায় স্বাগতিকরা এখন বেশ চনমনে আর উজ্জীবিত।
সিলেটের মতো মিরপুরের উইকেটও স্লো। শেরেবাংলার টার্নিং উইকেটে সফরকারীদের নাস্তানাবুদ করে সিরিজের জয়ের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। শুধু লাল বলেই নয়। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতেও আছে স্মৃতি। সেটা কেন উইলিয়ামসনদের বিপক্ষেই। ২০১০ সালের অক্টেবরে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে কিউদের ৪-০তে হোয়াইটওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ। মিরপুরে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ অবশ্য ভেসে গিয়েছিল বৃষ্টিতে। তিন বছর বাদে ফের বাংলাদেশ সফরে এসে ধবলধোলাইয়ের শিকার হয় তাসমান সাগরপাড়ের দেশটি। ২০১৩ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে মিরপুর-ফতুল্লায় তিন ম্যাচের সিরিজ ৩-০তে জিতে নেয় দেশের ছেলেরা। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে মিরপুরে পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজও হাতছাড়া করেছিল অতিথিরা। বাংলাদেশ কিউইদের হতাশ করেছিল ৩-২ ব্যবধানে। টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিÑ ক্রিকেটের তিন সংস্করণের সুখস্মৃতির অনুপ্রেরণা নিয়ে আজ বুধবার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামবেন শান্ত-মিরাজরা।
মিরপুর টেস্ট জিতে উপমহাদেশের দারুণ এক কীর্তি ছুঁয়ে ফেলার সামনে এবার শান্তরা। তাতে বাংলাদেশ নাম লিখবে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার গড়া অনন্য এক ক্লাবে। সাব-কন্টিনেন্টের টেস্ট খেলুড়ে এই তিন মহাশক্তি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট সিরিজ জিতেছিল নিজেদের দেশের মাটিতেই। উপমহাদেশের মধ্যে পাকিস্তানই প্রথম দল যারা কিউইদের বিপক্ষে নিজেদের মাঠে টেস্ট সিরিজ জিতেছিল। তারপরই আসে ভারত ও শ্রীলঙ্কার সাফল্য। ক্রিকেট দুনিয়ায় এই তিন দেশের পরাশক্তি হয়ে ওঠার শুরুও এখান থেকে। ধীরে ধীরে তারা বিশ্ব ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠা লাভ করে স্বমহিমায়। উপমহাদেশের এই বিশাল অর্জনের সঙ্গী হতে পারে বাংলাদেশও। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো টাইগাররাও কিউইদের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রথম টেস্ট সিরিজ জিততে পারে দেশের মাটিতেই। মিরপুর টেস্টে জিতলে তো কথাই নেই। ড্র করলেও সিরিজ ট্রফি থেকে যাবে দেশেই। সেখান থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলও নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারে ক্রিকেটের এলিট সংস্করণের বলয়ে।
তবে সিরিজ জয়ের স্বপ্নটা সত্যি করাটা মোটেও সহজ হবে না টাইগারদের জন্য। সিলেট টেস্টে হার মেনে ঘুরে দাঁড়াতে চাইবে কিউইরা। সন্দেহ নেই ক্ষুধার্ত সিংহের মতোই ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইবে মাঠে। জমবে ঘূর্ণি লড়াইটা। স্পিন ব্যাটলের হুঁশিয়ারি তো টিম সাউদি দিয়েই রেখেছেন। লড়াইটা হবে মাইন্ডগেমেরও। স্নায়ুচাপ যারা সামলে উঠতে পারবে, বিজয়ীর হাসি হাসবে তারাই।
লক্ষ্যটা এখন জয়ের ছন্দ ধরে রাখা। তাহলে মিরপুরেও কি টাইগাররা সিলেটের মতো একই রণকৌশল নিয়ে খেলবে? তবে ব্যাটারটা পুরোপুরি খোলাসা করতে চাইলেন না চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে প্রধান কোচের হাসিমাখা উত্তর, ‘বেশি তথ্য দিতে চাই না। কারণ নিউজিল্যান্ড দল হয়তো শুনবে বা পড়বে।’ পরে আরও একটু বিস্তারিত জানান, ‘আমাদের সমন্বয় কেমন হবে, তা উইকেটের ওপর নির্ভর করবে এবং অবশ্যই আমাদের শক্তিমত্তার ওপর, ওদের সীমাবদ্ধতার ওপর। সিলেটে আমরা খুব ভালো ক্রিকেট খেলেছি, পুরো পাঁচ দিনই। আমরা খুব ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। আমরা সেখানে যে সমন্বয় সাজিয়েছি, তা সিলেটের কন্ডিশন অনুযায়ী সাজিয়েছি।’
শেষ টেস্টেও একই কৌশলে খেলবে দেশের ছেলেরা। হাথুরুসিংহ দিলেন তারই আভাস, ‘মিরপুরে উইকেট কেমন হবে, তা আপনি এখানে দুই সেশন না খেলা পর্যন্ত বুঝতে পারবেন না। এই মাঠে অনেক খেলা হয়। আমার মনে হয় না বিশ্বের কোথাও একই ভেন্যুতে এত খেলা হয়। অনুমান করা কঠিন হবে। আমরা খুব বেশি পরিবর্তন করতে চাইব না।’
প্রথম টেস্টের মতো মিরপুরেও বাংলাদেশ শুরু করবে শূন্য থেকে। হাথুরুর ভাষ্য অন্তত তেমনটাই, ‘আমাদের শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। আমরা খেলাটা শুরু করব ঠিক যেভাবে শুরু করেছি সিলেটে। একই রোমাঞ্চ, চেষ্টা, আশা ও লক্ষ্য নিয়ে। আমরা প্রতিদিন লড়তে চাই।’
টাইগাররা শেষ দুটি টেস্ট খেলেছে মিরপুরে। আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। হাথুরুসিংহে সেই দুই টেস্টের স্মৃতি মনে করিয়ে দিলেন, ‘আপনি সমন্বয় সাজাবেন কন্ডিশন ও প্রতিপক্ষ দেখে। এখানে আমরা শেষ যে ম্যাচ খেলেছি, সেটা আফগানিস্তানের বিপক্ষে। উইকেট ভিন্ন ছিল। ওই টেস্টের আগে তেমন কোনো খেলা ছিল না। উইকেট তৈরির জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া গেছে। আমরা তিন পেসার নিয়ে দল সাজিয়েছি প্রতিপক্ষ ও কন্ডিশন মাথায় রেখে। এর আগে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছি। সেখানে উইকেট কিছুটা অন্যরকম ছিল।’
গুরু হাথুরুসিংহে মুগ্ধ হয়েছেন শান্তর খেলায়। স্তুতি গাইলেন তার নেতৃত্বেরও, ‘অধিনায়কত্ব ও নেতৃত্ব দুটো আলাদা জিনিস। অধিনায়কত্ব ছিল চমৎকার। টেকটিক্যালি সে একদম ঠিকঠাক ছিল। খেলায় সে বেশিরভাগ সময়ই নিজে আগে এগিয়ে এসেছে। মুগ্ধ করার মতো ফিল্ড প্লেসিংও ছিল। কোনো কোনো সময় কিছুটা আন-অর্থোডক্স কিন্তু সেটা খুবই কাজের ছিল।’