প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৩ ২৩:০৬ পিএম
আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৩ ২৩:৩০ পিএম
তাইজুলের স্পিন বিষে নীল কিউইরা। সেই উচ্ছ্বাসে ভাসছেন তারকা এ বোলার - ছবি: আ. ই. আলীম
সিলেটে টেস্ট সিরিজ মাঠে গড়ানোর আগে থেকেই চলছিল আলোচনা। বিষয়বস্তু আর কিছু নয়- কেবলই মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্ট। ২০২২ সালের প্রথম সপ্তাহের সেই অবিস্মরণীয় জয়ের পুনর্মঞ্চায়নের স্বপ্ন দেখছিল সবাই। কিন্তু ওয়ানডে বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে খেলার স্বপ্ন দেখিয়ে হতাশ হওয়া কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে ঠিক পুরোনো সেই সুখস্মৃতি নিয়ে কথা বলতেই চাননি। ঘুরেফিরে প্রথম টেস্টের শেষদিকে এসে ফের আলাপচারিতার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্ট। অবিশ্বাস্য সেই টেস্ট জয়ের গল্প আবার ফিরতে যাচ্ছে। এবার সিলেটের মাটিতে সেই পুরোনো থ্রিলার নতুন করে লিখছেন টাইগাররা।
জয় থেকে হাতছোঁয়া দূরে অপেক্ষা করছে বাংলাদেশ। আগামীকাল শনিবার ম্যাচের পঞ্চম ও শেষ দিনে টাইগারদের জয়ের জন্য দরকার ৩ উইকেট। আর অতিথি কিউইদের প্রয়োজন ২১৯ রান। ৩৩২ রানের টার্গেট নিয়ে ব্যাট করতে নেমে নিউজিল্যান্ড চতুর্থ দিন শেষ করেছে ১১৩ রান তুলে। কিন্তু এরই মধ্যে সফরকারীরা খুইয়ে ফেলেছে ৭টি উইকেট। ক্রিকেটারদের সঙ্গে আগামীকালের রোমাঞ্চকর সকালের অপেক্ষায় রয়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটপিয়াসীরাও। জয়ের স্বপ্নটা সত্যি হলে বিশ্বকাপে ভরাডুবির হতাশা ভোলার দারুণ এক উপলক্ষ পেয়ে যাবে বাংলাদেশ।
সিলেটে টেস্ট জয়ের মঞ্চ প্রস্তুত। ম্যাচকে নিজেদের মুঠোয় রাখতে ব্যাট হাতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন নাজমুল হোসেন শান্ত (১০৫), মাহমুদুল হাসান জয় (৮৬), মুমিনুল হক (৩ উইকেট), মুশফিকুর রহিম (৬৭) ও মেহেদি হাসান মিরাজ (৫০*)। আর বল হাতে সবার সামনের কাতারে আছেন বাঁহাত স্পিনার তাইজুল ইসলাম। তার ঘূর্ণিজাদুতে পথ হারিয়েছেন কিউই ব্যাটাররা। দাপুটে বোলিংয়ের ছন্দ ধরে রেখে প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও পেয়েছেন ৪ উইকেট। চতুর্থ দিন পর্যন্ত তারকা এ স্পিনারের ঝুলিতে দুই ইনিংস মিলিয়ে ৮ উইকেট।
চতুর্থ দিনের খেলা সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সংবাদ সম্মেলনে উচ্ছ্বসিত তাইজুল সম্ভাব্য রোমাঞ্চমাখা জয় নিয়ে বলেন, ‘বড় দলকে হারানোর মজাই আলাদা। এখনও জিতিনি, তবে ইনশাল্লাহ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। বড় দলকে হারালে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, দল বদলে যাওয়ার আভাস থাকে। পুরো বছর যেন এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলতে পারি। কয়টা ম্যাচ জিতব বা জিতব না, তা জানি না। তবে বাংলাদেশকে যেন ভালো কিছু দিতে পারি।’
চতুর্থ দিন নিউজিল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসের ৭ উইকেটের ৬টিই বাংলাদেশের তিন স্পিনারের থলেতে। স্বাগতিক স্পিনারদের সামলাতে গলদঘর্ম দশা হয় সফরকারীদের। দ্রুত উইকেট হারিয়ে হারের পদধ্বনি শুনছে কিউইরা। স্বাগতিক বোলারদের ঘূর্ণিবিষের কোনো জবাব যেন জানা ছিল না সফরকারী ব্যাটারদের। আর তাতে দেশের স্পিনারদের সামর্থ্যের প্রতিচ্ছবিও ফুটে উঠেছে। এ নিয়ে তাইজুলের ভাষ্য, সকালেও উইকেট এত কঠিন মনে হচ্ছিল না। আমাদের বোলাররা অনেক দুর্দান্ত বোলিং করেছে। ওরা বড় ব্যাটারদের দ্রুত হারানোয় চাপে পড়েছে। বলব না উইকেট খুব খারাপ।’
দুই ইনিংসেই বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটার কেন উইলিয়ামসন আত্মসমর্পণ করেছেন তাইজুলের কাছে। প্রথম ইনিংসে ১০৪ রান করা উইলিয়ামসনকে বোল্ড করেছিলেন। গতকাল তো ১১ রান করেই উইলিয়ামসন কাটা পড়ে যান তাইজুলের এলবিডব্লিউর ফাঁদে। এ নিয়ে উইলিয়ামসনের বিপক্ষে তিন ইনিংসে বল করে তিনবারই তাকে শিকারে পরিণত করার কীর্তি গড়লেন তাইজুল।
টেস্টে তাইজুলের উইকেট এখন ১৮৫। সাকিব আল হাসানের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি বোলার হিসেবে টেস্টে ২০০ উইকেটের মাইলফলকের খুব কাছে এই তারকা স্পিনার। সাকিব অনুপস্থিত থাকলে টেস্টে দলের বোলিং আক্রমণের নেতৃত্ব তো থাকে তারই কাঁধে।
লাল বলে দলের অন্য স্পিনারদের সঙ্গে তাইজুলের রসায়নটা সব সময় দুর্দান্ত। সাকিব নেই। মেহেদি হাসান মিরাজ ও নাঈম হাসানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিজের আগুন বোলিং নিয়ে তাইজুল বলছিলেন, ‘আমি আমার প্ল্যানেই থাকি। সাকিব ভাই থাকুক আর না থাকুক, আমার সঙ্গে আরও স্পিনাররা আছে। গেম বাই গেম প্ল্যান এরকম হয়- কেউ উইকেট নেবে, কেউ রান আটকে রাখবে। আমি রান আটকালে হয়তো মিরাজ বা নাঈম উইকেট পেত। যে থাকুক আর না থাকুক, আমরা ভালো খেলছি কি না এটাই জরুরি।'
নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তাইজুল বলেন, ‘একজন খেলোয়াড় যখন ৮-১০-১২ বছর খেলে, অবশ্যই অভিজ্ঞতা থাকে। ক্রিকেটে এই অভিজ্ঞতা অনেক কাজে লাগে।’ বাংলাদেশ সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারছে কি না? তাইজুলের উত্তর, ‘অধিনায়ক আর কোচের ওপর নির্ভর করে আমাকে কতটা প্রায়োরিটি দিচ্ছে। প্রায়োরিটি দিলে অবশ্যই চেষ্টা করব সাহায্য করার। সব সময় আমার দরজা খোলা। যেকোনো দরকার হলে আমি করব। অনেকে অনেক সময় বলে কী করা যায়। আমি পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করি।’
অলিখিত সেই নেতৃত্ব বেশ জমিয়ে উপভোগ করেন তাইজুল। সেই ভালো লাগার কথাই জানিয়েছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ ভালো লাগে।’ খানিকক্ষণ বিরতি নিয়ে হাস্যরস্যও করেন তাইজুল, ‘কিন্তু বুড়ো বানিয়ে দিয়েন না আবার (হাসি)!’ শেষ প্রশ্নে তাইজুলের উত্তর শুনে পুরো সংবাদ সম্মেলন কক্ষে হাসির রোল পড়ে যায়। আজও সবাই এমন হাসিই হাসতে চান। সেই অপেক্ষায় পুরো দেশবাসী। বিশ্বকাপের হতাশা ভোলার জন্য এর চেয়ে ভালো আর কী উপলক্ষ হতে পারে!