রাকিব খান
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২৩ ১২:৪২ পিএম
আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৩ ১২:৪৯ পিএম
এবারের বিশ্বকাপে উপমহাদেশের অতি চেনা কন্ডিশনেও সেমিফাইনালে জায়গা করে নিতে পারেনি পাকিস্তান। দলটির দেহভাষ্যেও দেখা যায়নি সেই পুরোনো ঝাঁজ। আগের চার বিশ্বকাপের চেয়ে এবার নিষ্প্রভ ছিল বাংলাদেশ। আবার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ক্রিকেট দুনিয়াকে চমকে দিয়েছে আফগানিস্তান। বিষয়গুলোকে অনেকভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারেন বিশেষজ্ঞরা। তবে একটা জায়গায় কিন্তু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। আর সেটা আইপিএল।
রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে আইপিএল খেলার সুযোগ নেই পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান ছাড়া সেই অর্থে আইপিএলে সুযোগ পান না বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও। আর আফগান ক্রিকেটারদের উত্থানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আইপিএল। বলাবাহুল্য ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের তীর্থক্ষেত্র আইপিএল। বিশ্বের সেরা ক্রিকেটারদের মনন-মগজজুড়ে আইপিএল তথা ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট। এক কথায় টি-টোয়েন্টি। এ সময়ের ক্রিকেটাররা নিজেদের গড়ে তুলছেন টি-টোয়েন্টি উপযোগী করে। স্পন্সর প্রতিষ্ঠানগুলো, দর্শক সবার চাওয়ায় এই চার-ছক্কার মারকাটারি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট। এর সবচেয়ে বড় কোপটা এসে পড়েছে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে। হালের ওয়ানডে ক্রিকেট আসলে ৫০ ওভারের টি-টোয়েন্টি।
বাংলাদেশ এখনও আগের দিনের ওয়ানডে খেলে, এটা অনুধাবন করতে খুব বেশিদূর যাওয়ার দরকার নেই। এই বিশ্বকাপে সাকিবের অনুপস্থিতিতে টাইগারদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ শেষে শান্ত বলেছিলেন, আমরা ওয়ানডে ক্রিকেটে ২৬০ রান করতে পারি। ৩২০ থেকে ৩৫০ করতে পারি না। তার কথা থেকেই এটা পরিষ্কার যে, বাংলাদেশ ওয়ানডে খেলছে কিন্তু বাকিরা খেলছে ৫০ ওভারের টি-টোয়েন্টি। আর এখানেই পিছিয়ে পড়েছে ওয়ানডে ক্রিকেটের বাংলাদেশ দল।
এবারের বিশ্বকাপে টি-টোয়েন্টির প্রভাব কতটা সেটা অনুধাবন করতে প্রয়োজন পড়ে না বিশেষজ্ঞ হওয়ার। রেকর্ডগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলীয় সর্বোচ্চ রান, সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জয়, এক ম্যাচে চার সেঞ্চুরি, এক ইনিংসে তিন সেঞ্চুরি, সর্বোচ্চ ছক্কা, দ্রুততম সেঞ্চুরি, এত সব রেকর্ডের উৎসবে ভেসেছে ২০২৩ বিশ্বকাপ।
এই বিশ্বকাপের আগেই ওয়ানডে ক্রিকেট তার উপযোগিতা হারিয়েছে এমন মতামত দিয়েছেন রবি শাস্ত্রী, ওয়াসিম আকরামের মতো সাবেক গ্রেটরা। একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে ওয়ান ডে ব্যাটিংয়ের সমার্থক হয়ে ওঠা শচীন টেন্ডুলকার। টেস্ট আর টি-টোয়েন্টির মাঝামাঝি ৫০ ওভারের ক্রিকেট থাকার আদৌ প্রয়োজন আছে কি না এই বিতর্ক এখন তুঙ্গে। ওয়ানডে ক্রিকেটে টানটান ম্যাচের সংখ্যা হয়ে উঠেছে হাতেগোনা। এবারের বিশ্বকাপ শুরুর আগেই বলা হচ্ছিল, এ সময়ের ওয়ানডে ক্রিকেটের বেশিরভাগ ম্যাচের ফলই একপেশে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচের সংখ্যা কমে এসেছে আশঙ্কাজনকভাবে। ব্যতিক্রম হয়নি এই বিশ্বকাপেও। ৪/৫টা ম্যাচ বাদ দিলে বাকি ম্যাচগুলোতে লেশমাত্রও ছিল না প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সব কথার এক কথা, ওয়ানডে ক্রিকেটে স্নায়ুক্ষয়ী ম্যাচের সংখ্যা এখন পার্সেন্টেজে পড়ে না।
১৯৭১ সাল থেকে শুরু হওয়া ওয়ানডে ক্রিকেটের বয়স সবে ৫০ পেরিয়েছে। এরই মধ্যে ফরম্যাটটির অস্তিত্ব নিয়ে শুরু হয়ে গেছে টানাটানি। অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে আরও বেশি করে টি-টোয়েন্টি অভিমুখী হয়ে পড়েছে ৫০ ওভারের ক্রিকেট। আর এতে করে ওয়ানডে ক্রিকেটের মূল চরিত্র হয়ে উঠেছেন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের স্পেশালিস্টরা।
আধুনিক ক্রিকেটের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট। লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন, গ্ল্যামার, টাকার ঝনঝনানিÑ কী নেই এখানে! যার প্রভাব পড়েছে মাঠের ক্রিকেটে। সত্তর, আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকের ক্রিকেটযুদ্ধ ছিল মাঠে স্কিল ও মগজের লড়াই। এখন এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাইলি টেকনিক্যাল ও টেকনোলজিক্যাল বিষয়। ধরা যাক ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ মানে আইপিএলের কথাই। আধুনিক ক্রিকেটের যে মারকাটারি ব্যাটিং, ব্যাটারদের ব্যাটিং ইনটেন্টের পরিবর্তন, বোলারদের নতুন নতুন কৌশলÑ এসব নতুনত্বের সেরা মঞ্চ আইপিএল।
এই বিশ্বকাপেও আইপিএলের প্রভাব খুবই প্রত্যক্ষ। আরও সহজ করে বললে, আইপিএল তারকারা মাতাচ্ছেন বিশ্বকাপ। ওয়ানডে ইতিহাসে প্রথম ব্যাটার হিসেবে ওপেনার না হয়েও ডবল সেঞ্চুরি করেছেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ছয় নম্বরে খেলতে নেমে অপরাজিত থাকেন ২০১ রানে। আইপিএলে সমীহ জাগানো নাম ম্যাক্সওয়েল। পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে ডেভিড ওয়ার্নার খেলেছেন ১২৪ বলে ১৬৩ রানের এক মারদাঙ্গা ইনিংস। ২০০৯ থেকে আইপিএল খেলা ওয়ার্নার নেতৃত্ব দিয়েছেন সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে। সেই সুবাদে ভারতের মাঠগুলো তার হাতের তালুর মতোই চেনা। এবারের আসরে ব্যাটারদের দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছেন অজি লেগ স্পিনার অ্যাডাম জাম্পা। আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে খেলা জাম্পা হয়ে উঠেছেন অজিদের অন্যতম ট্রাম্পকার্ড।
আফগান ঘূর্ণিত্রয়ী রশিদ-নবি-মুজিবরা আইপিএলের নিয়মিত মুখ। আফগানরা যে তিন তিনটি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলকে শিকারে পরিণত করেছে, এর প্রধানতম কারণ আইপিএল তথা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট।
দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে পেছনে ফেলে এবারের আসরে সেমিফাইনাল খেলেছে নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা। কিউই দলটির বোলিংয়ে নেতৃত্বে দিয়েছেন মিচেল স্যান্টনার আর ব্যাটিংয়ে অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন ডেভন কনওয়ে। দুজনেই হয়ে উঠেছেন আইপিএলের অন্যতম দল চেন্নাই সুপার কিংসের ঘরের ছেলে। সান্নিধ্য পেয়েছেন ভারতের বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির।
এই আসরে ফাইনালে উঠতে না পারলেও সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাটিংটা করেছেন প্রোটিয়ারা। যার নেতৃত্বে ছিলেন কুইন্টন ডি কক আর হেইনরিখ ক্লাসেন। দুজনই আইপিএল অভিজ্ঞতায় পুষ্ট। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স ও লক্ষ্নৌ সুপার জায়ান্টে খেলার অভিজ্ঞতা আছে ডি ককের। ক্লাসেন খেলেছেন হায়দরাবাদের হয়ে।
এখনকার ওয়ানডে ক্রিকেটের সঙ্গে টি-টোয়েন্টির পার্থক্য করাটা হয়ে উঠেছে কঠিন। এই যে ওয়ানডে ক্রিকেটের বদলে যাওয়া, এটা যে আইপিএল তথা ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের কল্যাণে সেটা আর নতুন করে না বললেও চলে। স্বভাবতই টি-টোয়েন্টি স্পেশালিস্টরা ওয়ানডে ক্রিকেট শাসন করবেন, এটাই এখনকার বাস্তবতা। এ ছাড়া মানুষের আল্টিমেট টার্গেট গ্ল্যামার আর টাকা। ক্রিকেটে এ দুটোর অফুরান জোগান দিচ্ছে টি-টোয়েন্টি। ক্রিকেটের এই সংক্ষিপ্ততম সংস্করণের বাঁশির তাল-লয়ের মধ্যেই নিজেদের হারিয়ে খুঁজছে ওয়ানডে ক্রিকেট। প্রশ্নটা টিকে থাকার, সর্বোপরি অস্তিত্ব রক্ষার।