হেলাল নিরব
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৩ ১৬:২৪ পিএম
গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের এই গল্পটি আপনি হয়ত জানেন না...
অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া তাকে আদর করে ডাকে ‘দ্য বিগ শো’। সতীর্থরা ভালোবেসে বলেন ‘ম্যাক্সি’। কেউ কেউ আরেকটু রঙ চড়িয়ে ডাকেন ‘ম্যাড ম্যাক্স’। কার কথা বলা হচ্ছে, বুঝতে পারছেন নিশ্চয়—সেই গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে নিয়েই আজকের গল্প। যাকে ঠাণ্ডা মাথার কিলার বললে আপত্তি তুলবেন না। বরং চাইবেন এই ‘খুনি’ শব্দটির সঙ্গে আরেকটি অ্যাডভার্ব বসিয়ে দিতে। তবে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ক্রিকেটে খেলেন এমন একজনকে কিলার বলতেও কেন অত্যুক্তি হবে না? প্রশ্ন উঁকি দিতেই পারে!
সেই উত্তর জানার আগে শুনতে হবে ম্যাক্সওয়েলের ছোটবেলার একটি গল্প। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে বিশ্বকাপে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়া ম্যাক্সিকে এক সময় ক্রিকেটটাই ছেড়ে দিতে বলা হয়েছিল। নেপথ্যে বোলারদের বেধড়ক পেটানো। প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় ম্যাক্সওয়েল পেস বোলিংয়ের পাশাপাশি টুকটাক ব্যাটিংও করতেন। স্কুল ছুটি হওয়ার পর একবার ভাবলেন, ‘এত কষ্ট করে দৌড়ে এসে বল করছি আর ওরা জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাট চালিয়েই খালাস! রান বানালেই পিটি স্যার খুশি। আমি ব্যাটার হব।’ কিন্তু ব্যাটার হলেও তো হ্যাপা আছে। ম্যাক্সওয়েলের আবার কষ্ট করতে খুব বাধে। জায়গায় দাঁড়িয়ে রান নিতে হবে। সেক্ষেত্রে বাউন্ডারির বিকল্প নেই। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। বাসায় এসে প্রস্তুতি নিতে লাগলেন কিশোর ম্যাক্সি, ব্যাটিং করবেন এবং চার-ছক্কা হাঁকাবেন। রান করলেই তো হচ্ছে—এত দৌড়াদৌড়ির কী আছে!
‘ওদের ভয় ছিল ডান হাতে ব্যাট করলে বড় বড় ছক্কা মারব। আমি শর্ত মেনে নিয়েছিলাম। বাঁ হাতে শটকে উন্নত করার চেষ্টা চালালাম। বাড়ি ফিরে বাঁ হাতেই ব্যাটিং অনুশীলন করতাম। বাবাও আমাকে সব সময় নতুন কিছু চেষ্টা করার জন্য প্রেরণা দিতেন’
এমন ভাবনা থেকেই শুরু, প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর এখনও তাণ্ডব চালান ম্যাক্সি। এখনকার প্রতিপক্ষের মতো তখনও মারকুটে ম্যাক্সিকে পছন্দ করতেন না অন্য দলে খেলা বন্ধুরা। একবার হুট করেই ম্যাক্সির ডাক পড়ল। বিচার আছে। পিটি স্যারের কাছে নালিশ গেছে, ‘ম্যাক্সওয়েল বোলিং ছেড়ে ব্যাটিং করছে। টানা সাত দিন তাকে আউটও করা যায়নি।’ বন্ধুদের ক্ষোভ আউট না করতে পারা নিয়েই। যার ফলে ক্রিকেটটাই ছেড়ে দিতে হলো, ম্যাক্সি বনে গেলেন বাস্কেটবল খেলোয়াড়। কিন্তু ব্যাট হাতে যিনি তাণ্ডব চালাতে চান তার কি বাস্কেটবলে চাপড় মেড়ে চলবে। ম্যাক্সওয়েল মানেননি, ফিরে এলেন ক্রিকেটে। কিন্তু শর্ত ছিল বড্ড কঠিন। ডানহাতি ম্যাক্সওয়েলকে ব্যাট করতে হবে বাম হাতে। শুরুতে গড়িমসি করলেও পরে মেনে নিলেন, নিজেকে আরও ক্ষুরধার বানালেন। লম্বা শট খেলার পাশাপাশি ঝুলিতে ম্যাক্সি যোগ করলেন ক্লিন হিটিং দক্ষতা, রিভার্স সুইপ, রিভার্স অ্যান্ড সুইচ হিটার। প্রতিপক্ষের বোলাররা সেই থেকেই তার বিপক্ষে বল করতে গিয়ে লাইন-লেন্থ হারান, ভয়ে পা দুটোও হয়তো কাঁপে! চার-ছক্কায় অন্যপাশে রানবন্যা ছোটান পাগলাটে ‘ম্যাড ম্যাক্স’।

ছোটবেলার সেই ক্রিকেট ছেড়ে বাস্কেটবলে আসার ঘটনাটি একবার শুনিয়েছিলেন ম্যাক্সওয়েল, ‘ওদের ভয় ছিল ডান হাতে ব্যাট করলে বড় বড় ছক্কা মারব। আমি শর্ত মেনে নিয়েছিলাম। বাঁ হাতে শটকে উন্নত করার চেষ্টা চালালাম। বাড়ি ফিরে বাঁ হাতেই ব্যাটিং অনুশীলন করতাম। বাবাও আমাকে সব সময় নতুন কিছু চেষ্টা করার জন্য প্রেরণা দিতেন।’ সেই থেকেই এতদূর। ভিক্টোরিয়ার হয়ে একবার ঘরোয়া ক্রিকেটে ম্যাক্সওয়েল ১৯ বলে হাঁকান ফিফটি। চোখে পড়ে যায় অজি ক্রিকেট বোর্ডের কর্তাদের, ‘এমন ছক্কা মারতে পারা কাউকেই তো চাই।’ ম্যাক্সি ডাক পেলেন। মান রাখলেন। নিজের নামের পাশে এখন পর্যন্ত সাত হাজারের মতো রান যোগ করেও ম্যাক্সওয়েল আছেন বহাল তবিয়তে।
পেসার থেকে স্পিনার বনে যাওয়া অজি অলরাউন্ডারের ঝুলিতে আছে শতাধিক উইকেটও। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যেটা নজর কাড়ে, ব্যাটিংয়ে তার স্ট্রাইক রেট। ওয়ানডেতে দেড়শর কাছাকাছি স্টাইক রেটে ব্যাট চালানো ম্যাক্সওয়েল টি-টোয়েন্টিতে আরও নিষ্ঠুর। দেড়শ স্ট্রাইক রেট ছাড়িয়ে তুলাধুনা করেন প্রতিপক্ষ বোলারদের। কিলার ম্যাক্সির সবশেষ শিকার নেদারল্যান্ডস।
‘খুনি’ শব্দটি কেমন যেন শোনাচ্ছে তাই না? দিল্লিতে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে অজি টপ অর্ডার ব্যাটার যা করলেন তাতে ‘কিলার’ না বলে জো আছে! বাইশ গজে নামার আগে ‘ম্যাড ম্যাক্স’ অসুস্থ ছিলেন, জ্বরে ভুগছিলেন। ব্যাটিংয়ে নেমে সেই জ্বর চড়িয়ে দিলেন ডাচ বোলারদের ওপর। ভাঙলেন নিজের দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড, আয়ারল্যান্ডের কেভিন ও’ব্রায়েন ও দক্ষিণ আফ্রিকার এইডেন মার্করামকে পেছনে ফেলে গড়লেন বিশ্বকাপে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড। ম্যাক্সি শোনালেন, এই তো শুরু। প্রত্যয়ী কণ্ঠে বললেন আত্মবিশ্বাসের কথা, ‘আমাকে বল করা কঠিন। প্রথম বল কোনোভাবে কাটিয়ে দেওয়া গেলেই হবে।’ তারপরের গল্পটি তো জানা, ধুন্ধুমার ব্যাটিং দেখে আপনি বলতেও বাধ্য হবেন ‘ম্যাক্সওয়েল খুনি।’