আরিফুর রাজু
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৩ ১০:০৪ এএম
আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৩ ১৫:২০ পিএম
তারা হয়তো মনের আঙিনায় সুর তুলেছিলেন নচিকেতার গান। আউড়িয়ে ছিলেন, ‘একটা চান্স দেন আমায়। প্রমাণ করবো...।’ সুযোগ তাদের কাছে ধরাও দিয়েছে বৈকি। করেছেন বাজিমাতও। ডাগ আউটের অস্বস্তিকর যাত্রা শেষে অপেক্ষার প্রহরও থেমেছে। সতীর্থের সর্বনাশ হয়ে আসা ইনজুরি কিংবা অসুস্থতায় তাদের এসেছে পৌষ মাস। মুহূর্তে অন্ধকার থেকে লাইম লাইটে চলেও এসেছেন। আজ আলোচনায় থাকবে এমন কয়েকজন খেলোয়াড় নিয়ে, যারা অন্য বেঞ্চ গরম করতেন, কিন্তু হুট করে আসা সুযোগে বিশ্বকাপে ছোটাচ্ছেন রানবন্যা, করছেন বাজিমাত।
শনিবার বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে জয়ের দিনে একাদশে ছিলেন না অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা। তার জায়গায় সুযোগ মেলে রেজা হেনড্রিকসের। কুইন্টন ডি ককের সঙ্গে ওপেনিংয়ে নামেন রেজা। তাকে নিয়েই শুরু করা যাক। ৩৯৯ রানের দলীয় স্কোর পেলেও শুরুটা অবশ্য প্রোটিয়াদের জন্য ছিল ভীতি-জাগানিয়া। শুরুতেই রিচ টপলির বলে ক্যাচ তুলে ফেরেন দাপুটে ফর্মে থাকা ডি কক। এরপর রাসি ভ্যান ডার ডুসেনকে নিয়ে ১২১ রানের জুটি গড়েন হেনড্রিকস। বেঞ্চে বসা রেজা রাজা বনে যান। নিজের ঝুলিতেও যোগ করেন ৮৫ রানের ঝকঝকে ইনিংস। ছিল ৩ ছক্কা ও ৯ বাউন্ডারি। তার বদৌলতে শক্ত ভিত পায় প্রোটিয়ারা। ভয় ভেঙে যাওয়া দলটির রান শেষ পর্যন্ত পাহাড়চূড়ায় পৌঁছে। দুরন্ত প্রতাপে থাকা প্রোটিয়াদের পরের ম্যাচ বাংলাদেশের সঙ্গে। ম্যাচটির আগে ব্যালেন্সড একাদশ গঠনে টিম সিলেক্টরদের ভাবনায় ফেলে দিয়েছেন হেনড্রিকস, ‘বাভুমা ফিরলেও আমাকে নিয়ে ভাববেন!’
মিশেল মার্শের কথাই ভাবুন। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের মান বাঁচাতে যার নাম সবার আগে আসবে তিনি মার্শ। হারে ধুঁকতে থাকা অজিদের পয়েন্ট টেবিলের লড়াইয়ে সম্মুখযোদ্ধাও তিনি। দলের নিয়মিত ওপেনার ট্রাভিস হেডের ইনজুরিতে ওপেনিংয়ে আগমন তার। শুরুতে নিজেকে মেলে ধরতে না পারলেও এখন তার ডানায় ভর করে উড়ছে অস্ট্রেলিয়া। দলের দ্বিতীয় জয়ের দিনে ওয়ার্নারসহ ২৫৯ রানের পার্টনারশিপ গড়েন দুজন। যাতে মার্শ ৯ ছক্কা ও ১০ চারে গড়েন ১২১ রানের ইনিংস। এর আগের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে করেন অর্ধশতক।
আবদুল্লাহ শফিকের গল্পটিও ঠিক একই রকম। টানা অফ ফর্মে থাকা ওপেনার ফখর জামানের ইনজুরিতে দলে ডাক আসে তার। এসেই দেখা পান ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাত্র সাতটি ওয়ানডে খেলা শফিক জানান দেন পাকিস্তান ক্রিকেটে রাজত্ব করতে এসেছেন। শ্রীলঙ্কার ৩৪৪ রানের পাহাড়সম স্কোর গুঁড়িয়ে দেন মোহাম্মদ রিজওয়ানকে নিয়ে। আসরে শফিকের দ্বিতীয় ম্যাচটি রানবন্যা ছোটানোর আগেই থেমে যায়। তবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বেঙ্গালুরুতে আরেকবার নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পান। ৬৪ রানের ইনিংসে প্রতিটি বলে দৃঢ়তার পরিচয় দেন।
আলোচনায় রাচিন রবীন্দ্র থাকবেন স্বাভাবিক। ব্ল্যাক ক্যাপসদের নিয়মিত অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনের ইনজুরিতে তিন নম্বর স্থানে সুযোগ মেলে রাচিনের। বাইশ গজে নেমেই সক্ষমতা দেখান। দলকে দারুণ কিছু জয় উপহার দেন। প্রথম ইনিংসে খেলেন ১২৩ রানের অপরাজিত ইনিংস। পরের ম্যাচে ডাচদের বিপক্ষে আরেকবার ব্যাট হাতে জ্বলে ওঠেন। অর্ধশতক তোলার পাশাপাশি হাত ঘুরিয়ে এক উইকেটের দেখা পান। গতকাল রবিবার স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে দলের বিপর্যয়ে এক প্রান্ত আগলে রাখেন। দলের প্রাথমিক বিপর্যয় কাটান ড্যারিল মিচেলকে নিয়ে। দুজন মিলে ১৫৯ রানের জুটি গড়েন।
মার্শ-শফিকদের পাশাপাশি আলোচনা হতে পারে বাংলাদেশের ওপেনার তানজিদ হাসান তামিমকে নিয়েও। বিশ্বকাপের আগে তামিম ইকবালের আচমকা বিদায়ে কপাল খুলে যায় তরুণ এই ব্যাটসম্যানের। আসরে বাংলাদেশের মতো তার পথচলাটাও সুখকর ছিল না। বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচে ৫ রান করেছেন। পরের ম্যাচে ১। এরপর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৬। তবে সবশেষ ম্যাচে ৪৩ বলে ৫১ রানের ইনিংস খেলে ক্রিকেট কিংবদন্তিদের নজর কেড়েছেন। ভারতের বিপক্ষে ৩ ছক্কা ও ৫ চারের মাধ্যমে তার সাজানো ইনিংসটি অনেকের মনে ধরেছে। সাহসী ও আগ্রাসী মনোভাবের জন্য প্রশংসা পাচ্ছেন তানজিদ। তাকে ‘দারুণ প্রতিভাবান’ উল্লেখ করে পাকিস্তানের সাবেক কিংবদন্তি পেসার ওয়াসিম আকরাম বলেছেন, ‘তানজিদ অবশেষে নিজেকে মেলে ধরতে পেরেছে। এখন দরকার তার ধারাবাহিকতা। খুবই প্রতিভাবান ক্রিকেটার সে। আমি তো এমন এক প্রতিভাকে দলে নেওয়ায় বাংলাদেশের নির্বাচকদের কৃতিত্ব দেব।’
‘ঝোপ বুঝে কোপ মারা’ বলে বাংলায় যে প্রবাদটি আছে, সেটির বাস্তব প্রমাণ মাঠে দেখিয়েছেন রাচিন-শফিকরা। তানজিদ-মার্শদের এখনও অনেক কিছু করার বাকি, বড় দায়িত্ব যে তাদের কাঁধে।