সীমান্তের ওপারে বিশ্বকাপ
হেলাল নিরব
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৩ ১২:৩৩ পিএম
আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৩ ১২:৩৬ পিএম
ধরুন এমন হলো—জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় দক্ষিণ আফ্রিকানদের সঙ্গে গলা মেলালেন ওয়েসলি বারেসি অথবা নেদারল্যান্ডসের জাতীয় সংগীতের সময় চুপ থাকলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত আরিয়ান দত্ত। কী হবে তাহলে— প্রচণ্ড বিতর্ক নিশ্চয়! নিদেনপক্ষে কথা তো উঠবেই, ‘জাতীয় সংগীতের অবমাননা কেন করলে?’ কথায় আছে, সবকিছু বদলাতে নেই, জাতীয় সংগীত বদলানো যায় না। আক্রমণাত্মক শোনালেও এমন কথাও আসে, ‘মা তো মা-ই, তাকে কীভাবে বদলাবেন। শেকড় তো ভুলে যেতে পারবেন না।’
কিউবার বিপ্লবী নেতা আর্নেস্তো চে গুয়েভারা জাতিসংঘে এক বক্তৃতায় দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘মৃত্যু কিংবা জন্মভূমি।’ কিন্তু এই জন্মভূমি নেদারল্যান্ডসের ক্রিকেটারদের জন্য আক্ষেপের, খুব কাছে গিয়ে প্রেমিকাকে ছুঁতে না পারার বেদনার মতো। সেসব কিছুর বিচারে আজ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে খেলতে গিয়ে মন খারাপ হতে পারে কলিন অ্যাকারম্যান-ওয়েসলি বারেসিদের। তারাও নিশ্চয় শেকড় ভুলে যেতে পারেননি। তাইতো ভারতের মাটিতে পা রেখেই ঢুকরে কেঁদে উঠেছেন আরিয়ান দত্ত। বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে হায়দরাবাদে এসে তেজা নিডামানুরু খুব করে মনে করেছেন প্রত্যন্ত সেই গ্রামকে, যেখানে জন্ম নিয়েছিলেন। পাকিস্তানের খুব কাছে খেলতে এসে যেমন সাকিব জুলফিকার নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলেন, ‘এটাই তো আমার মাটি, এই বাতাসই তো প্রিয়!’
সাকিব-তেজাদের মতো আজ বড় পরীক্ষার মুখে পড়বেন নেদারল্যান্ডসের পাঁচ ক্রিকেটার। যারা জন্মেছেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। জন্মভূমির বিপক্ষেই ধর্মশালায় ব্যাট হাতে তুলে নিতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্ম নেওয়া স্টিফেন মাইবুর্গ দেশের হয়ে খেলতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত পারেননি। প্রোটিয়া ক্রিকেটার বনে গিয়েছিলেন নেদারল্যান্ডসের ব্যাটার। কাকতালীয় হলেও ক্যারিয়ারের সবশেষ ম্যাচটিও জন্মভূমির বিপক্ষে খেলেছেন। গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রোটিয়াদের হারানোর পর বিদায় নিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘স্বপ্নেও ভাবিনি নিজ দেশকে হারাব। জন্মভূমির জন্য অনেক কেঁদেছি।’
বিশ্বকাপে সেই প্রোটিয়াদের বিপক্ষে খেলবেন দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া পাঁচ ক্রিকেটার— রোলফ ফন ডার মারওয়ে, সিব্র্যান্ড এঙ্গেলব্রেখট, রায়ান ক্লাইন, ওয়েসলি বারেসি ও কলিন অ্যাকারম্যান। ডাচদের কমলা রঙের জার্সি পরে ভারতের মাটিতে নামতে হবে ভারতের তিনজন— আরিয়ান দত্ত, বিক্রম সিং ও তেজা নিডামানুরুকে। সব মিলিয়ে ইউরোপের দেশটির দলে মূলত স্বদেশি আছেন দুজন—বাস দে লিডে এবং পল ফন মিকেরেন। নেদারল্যান্ডসের অধিনায়ক স্কট এডওয়ার্ডসও স্বদেশি নন।
স্কট-সাকিবরা জন্মেছেন এক দেশে আর বিশ্বকাপ খেলেছেন অন্য দেশের জার্সিতে। তারা ব্যাট হাতে দাঁড়িয়েছেন বা দাঁড়াবেন জন্মভূমির বিপক্ষে, বোলিংয়ে নিজের দেশকে হারাতে সর্বোচ্চ দিয়ে লড়বেন; সবশেষে আক্ষেপেও হয়তো পুড়বেন এবং আকুতি জানিয়ে বলবেন— ‘আমারে পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে।’
স্টিভেন মাইবুর্গ যেমন ব্যাট হাতে প্রোটিয়াদের কচুকাটা করে জন্মভূমির বদলে ডাচদের মান রেখেছিলেন, তেমনি চান তার সাবেক দলের সবাইও এমন করুক। মজার বিষয় হচ্ছে মাইবুর্গের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল জাতীয় সংগীত নিয়ে, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচে যখন সংগীত বাজবে তখন আপনি মাঠে থাকলে কী করতেন?’
সাবেক ডাচ তারকা দিয়েছেন কৌশলী উত্তর, ‘আমি চাই দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের শিরোপা জিতুক। কিন্তু কালকের (আজকের) ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের জয়ের জন্য শুভকামনা থাকবে। আমি ডাচ দলের পাঁচ শতাংশ সুযোগ দেখছি যদিও। সব সময়ই নেদারল্যান্ডসকে প্রতিনিধিত্ব করতে অত্যন্ত গর্ব অনুভব করি। কিন্তু একই সঙ্গে জন্মভূমিকেও ভালোবাসি। সে কারণে যে দেশেরই জাতীয় সংগীত বাজুক না কেন মনের মধ্যে অন্য ধরনের অনুভূতি হয়। সব সময় দুটোতেই কণ্ঠ মিলিয়েছি।’
অ্যাকারম্যানদেরও হয়তো তেমন কিছু করতে হবে! অথবা দুই দেশের জাতীয় সংগীতের সময় চুপ থাকতে হবে। শেকড় ভুলে শিখরে উঠতে চাওয়াদের একটু নিষ্ঠুর হতেই হয়!