সীমান্তের ওপারে বিশ্বকাপ
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৩ ২৩:৩৮ পিএম
আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৩ ২৩:৪০ পিএম
ক্রিকেটকে বলা হয় ‘গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা।’ আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের ইতিহাস ঘাঁটলে যদিও দ্বিমত পোষণ করবেন অনেকে। ২০০৩ সালের আসরে কেনিয়ার সেমিফাইনাল খেলা বাদে বলার মতো কি ছোট দলগুলোর কিছু আছে? মোটাদাগে তা না থাকলেও ছোটদের বড় স্বপ্নযাত্রায় প্রতিবারই কোনো না কোনো অঘটন ঘটিয়েছে তারা। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের লম্বা ইতিহাস ঘাঁটার পর তিনটি ‘জায়ান্ট কিলিং’ ঘটনা নিয়েই এই আলোচনা।
মিরাকল অব কেনিয়া (২০০৩ বিশ্বকাপ)
১৯৯৬ সালে এশিয়ার তিন দেশে বসা বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলতে এসেই নজর কেড়েছিল কেনিয়া। ভারতের পুনেতে তারা হারিয়ে দিয়েছিল দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। তবে চমকের সবটুকু যেন তুলে রেখেছিলেন স্টিভ টিকোলোরা। ঝোলার ভেতর থেকে একে একে সবটা বের করলেন ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে। মিরাকল অব কেনিয়া খ্যাত ম্যাচের আগেই পয়েন্ট টেবিলে দারুণ অবস্থায় চলে গেল কেনিয়া।
পরিসংখ্যান একটা সময় এমন দাঁড়াল, আসরের সুপার সিক্সে পৌঁছতে একটি জায়ান্ট কিলিং লাগবে কেনিয়ার। আইসিসির সহযোগী দেশটি সেই কিলিং মিশনে বেছে নিয়েছিল লঙ্কানদের। তখনকার অন্যতম শক্তিধর শ্রীলঙ্কাকে ধরাশায়ী করে শুধু সুপার সিক্সেই নয়, হিসাবের মারপ্যাঁচে সেমিফাইনালে উঠতেও বড় ভূমিকা রেখেছিল।
সবকিছু যেন আসরটিতে সহ-আয়োজক কেনিয়ার পক্ষে কথা বলছিল। নিরাপত্তার অজুহাতে নিউজিল্যান্ড দল নাইরোবি যেতে অস্বীকার করায় মাঠে না নেমেই চার পয়েন্ট পেয়ে যায় কেনিয়া। এরপর আর তাদের পায় কে, সহজ সমীকরণ সামনে। সেটাই খাতা-কলমে কাটাকুটি করে ফয়সালা করা। নাইবোরিতে মিরাকল খ্যাত ম্যাচটিতে ৯ উইকেট হারিয়ে ২১০ রান জমা করে কেনিয়া। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে স্বল্প পুঁজিতেই ঘূর্ণি ছোড়েন লেগস্পিনার কলিন্স ওবুইয়া, ২৪ রানের বিনিময়ে নেন ৫ উইকেট। কেনিয়া শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি জিতে যায় ৫৩ রানে। বিশ্বকে হতভম্ব করে দেওয়া জয়টির পর অবশ্য আরেকটি মিরাকল করতে পারেনি কেনিয়া। ভারতের কাছে সেমিতে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়া দলটি এখনও ক্রিকেটে ফিরতে নিজেদের খুঁজছে।
টাইগারদের অঘটনের দিন (২০০৭ বিশ্বকাপ)
‘আপনি কখনোই জিততে পারবেন না যদি না হারতে শিখেন’—যুক্তরাষ্ট্রের বাস্কেটবল কিংবদন্তি করিম আব্দুল-জব্বারের কথাটির সঙ্গেই যেন তাল মেলাচ্ছিল বাংলাদেশ। হারতে হারতে তাই দপ করে তালও কেটে গেল। ভারতকে হারিয়ে এলো বড় জয়। এক কথায় ‘জায়ান্ট কিল’। বিশ্বকাপে নতুনের গন্ধ গায়ে লেগে থাকা বাংলাদেশ তখনও জিততে শেখেনি, এমন একটি দলই ১৭ মার্চ বড় অঘটন ঘটিয়ে দিয়েছিল। পোর্ট অব স্পেনে ভারতের মুখোমুখি হওয়ার আগে বাংলাদেশ দল শুনেছিল বড় দুঃসংবাদ। ম্যাচের আগের দিন সতীর্থ মানজারুল ইসলাম রানার মৃত্যুর সংবাদটিই প্রভাবক হিসেবে কাজ করল। মাশরাফি-রাজ্জাকদের দলে নেমে আসে শোকের ছায়া। সেই শোককেই শক্তিতে পরিণত করে বাংলাদেশ। ‘রানার জন্য হলেও জিততে হবে’— এমন প্রতিজ্ঞা নিয়ে নামা দলটি হারিয়ে দিল ফেভারিটদের। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন রানারই কাছের বন্ধু মাশরাফি বিন মর্তুজা।
সে সময় ভারত-বধের সুখস্মৃতি পাওয়া দুরূহ ছিল যথেষ্ট! তখনকার ভারতীয়দের ব্যাটিং লাইনআপ ছিল সর্বকালের অন্যতম সেরা। শচীন টেন্ডুলকার, সৌরভ গাঙ্গুলির পর রাহুল দ্রাবিড়, বীরেন্দর শেবাগ, এরপর আরও...। আসরে ফেভারিট তকমাটাও তাদের গায়ে লেগে। স্বাভাবিকভাবেই কেউ বাংলাদেশের পক্ষে বাজি ধরার সৎ সাহস করতে পারেনি। কিন্তু পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সাকিব-তামিমরা। পঞ্চপাণ্ডবের শুরুও কি তারপর থেকে? সেই আলোচনার বিস্তর ফারাক আছে। তবে ক্যারিবিয়ানদের মুলুকে ইতিহাস রচনা করেছিল লাল-সবুজের দল।
পোর্ট অব স্পেনে মাশরাফির তোপের পর চেপে ধরেন মোহাম্মদ রফিক ও আব্দুর রাজ্জাক। দুই লেগির ঘূর্ণিতে বেশিদূর এগোতে পারেনি ভারত। সব উইকেট হারিয়ে থামে যখন, তখন স্কোর বোর্ডে ১৯১ রান। ছোট লক্ষ্যই বটে। কিন্তু স্লো পিচে কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। সেদিনের তিন টিনএজার তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিমের ফিফটিতে সব সংশয় কেটে যায়। বাংলাদেশ রানার বিদেহী আত্মাকে বড় উপহার হিসেবে এনে দেন ৫ উইকেটে ঐতিহাসিক জয়।
অঘটনে পটু আইরিশরা (২০১১ বিশ্বকাপ)
আগের বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে দিয়েছিল আয়ারল্যান্ড, ২০১১ সালে তারাই বেছে নেয় ইংলিশদের। বেঙ্গালুরুর মাঠে প্রথমে ব্যাট করে ৩২৭ রান তুলেছিল ইংল্যান্ড। সেই বিশাল রান তাড়া করে ম্যাচ জেতে আয়ারল্যান্ড। কেভিন ও’ব্রায়েন ৬৩ বলে ১১৩ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেছিলেন। শেষ ওভারে গিয়ে ম্যাচ জিতেছিল আয়ারল্যান্ড। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ডও গড়ে আইরিশরা।
যত সহজে বলা গেল আদপে ঠিক ততটা সহজ হয়নি জয়টি। চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের তিন ত্রয়ী কেভিন পিটারসেন, জনাথন ট্রট ও ইয়ান বেলের ব্যাটে বড় সংগ্রহ পায় ইংলিশরা। স্বভাবতই তখন সবাই ভেবেছিল নিশ্চিত জয় পেতে যাচ্ছেন পিটারসেনরা। কিন্তু ফল হলো উল্টো। তিনশ রান পার করাই নয়, জিতেই মাঠ ছাড়ে আইরিশরা। কিন্তু ৩ উইকেটে পাওয়া ওই জয়ের পর আর একটি ম্যাচও জিততে পারেনি কেভিন ও’ব্রায়েনরা। তবে ইংলিশ বধের সুখস্মৃতি ইতিহাস হয়েই রয়েছে তাদের।