বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৩ ১১:৫৬ এএম
আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৩ ১১:৫৭ এএম
প্রস্তুতি ম্যাচে এক চিত্র। হোক না সেটা বিশ্বকাপের ওয়ার্মআপ। আর মূল লড়াইয়ে মঞ্চস্থ হলো ভিন্ন চিত্রনাট্য। দুটোই তো মাঠের খেলাই। প্রতিপক্ষও একই- বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ড। দুদলের স্কোয়াডেও আসেনি তেমন কোনো পরিবর্তন। ভেন্যুটা কেবল ভিন্ন, এই যা। গুয়াহাটির বারসাপারা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচেও লড়াইটা বলতে গেলে ছিল হাড্ডাহাড্ডি।
ডিএলএস মেথডে ইংলিশরা জয় পেয়েছে ঠিক। তবে ২৪.১ ওভারে ১৯৭ রান তুলতেই ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল জস বাটলারের দল। বাংলাদেশের ব্যাটিংটা বাজে হলেও দুরন্ত পেস বোলিংয়ে একটু হলে জমজমাট লড়াইয়ের স্বাদ উপভোগ করেন ক্রিকেট অনুরাগীরা।
কিন্তু সেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ধর্মশালায় বাংলাদেশ পেল ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। ইংলিশরা এক সেঞ্চুরির সঙ্গে পেল দুই ফিফটি- ডেভিড মালান ১৪০, জো রুট ৮২ আর জনি বেয়ারস্টোর ৫২। লক্ষ্য তাড়ায় বাংলাদেশ পেল মাত্র দুটি হাফসেঞ্চুরি- লিটন দাস ৭৬ ও মুশফিকুর রহিম ৫১। ব্যাটিং ব্যর্থতার মধ্যে এই দুজনই ছিলেন ব্যতিক্রম। তাদের সঙ্গে তাওহিদ হৃদয় (৩৯) একটু চেষ্টা করেছেন। বাকি ব্যাটাররা ছিলেন চরম ব্যর্থ। ব্যবধানটা তো এখানেই। তারচেয়ে বড় কথা, জেতার মানসিকতা ছিল না লাল-সবুজ প্রতিনিধিদের শারীরিক ভাষায়। হারের ব্যবধান কমানোর দিকেই যেন বেশি নজর ছিল তাদের। বোলিংয়ের চিত্রটাও প্রায় একই। ব্যাটিংয়ের মতো বোলিংয়েও আক্রমণাত্মক দেখা যায়নি দেশের ক্রিকেটারদের। রিচ টপলি চার উইকেট পেলেন দরকারি সময়ে। আর শেখ মাহেদি হাসানও পেলেন ৪ উইকেট। কিন্তু সেটা বড্ড অসময়ে। শরিফুলের তিন উইকেটও কোনো কাজে আসেনি। ততক্ষণে ইংল্যান্ড গড়ে ফেলে রানের পাহাড়। তাদের ৩৬৪ রানের বিপরীতে টাইগারদের নামের পাশে জমা পড়ে মাত্র ২২৭।
মাঠে লড়াই হলো ঠিকই। কিন্তু ভক্ত-সমর্থকরা দেখলেন অসম এক ক্রিকেটযুদ্ধ। লড়াই জমবে কীভাবে? জয় ছিনিয়ে নেওয়ার সাহস বা স্বপ্ন কোনোটাই তো দেখাতে পারেননি সাকিব আল হাসানরা। আর সেটা হবেইবা কী করে? গোড়ায় যে গলদ করে ফেলেছে বাংলাদেশ- হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামে টস জিতে শুরুতে বোলিং বেছে নিয়ে। যেখানে লড়াইয়ের আগের রাতে হয়েছিল বৃষ্টি। সেখানে ফিল্ডিং নিয়ে সুবিধা করতে পারেননি তাসকিনরা। যে কারণে টস হারটা শাপে বর হয়ে দেখা দেয় ইংল্যান্ডের। সুবিধা পান ইংলিশ ব্যাটাররা। আগে ব্যাটিং পেয়ে বরং তারা খুশিই হয়ে যান। পরে পিচের সুবিধা নিয়ে চালান ব্যাটিং তাণ্ডব।
দলের সঙ্গে আছেন ভারতীয় শ্রীধরন শ্রীরাম। স্থানীয় কোচ হওয়া সত্ত্বেও পিচ নিয়ে এ টেকনিক্যাল কনসালট্যান্টের পরামর্শ কোনো কাজেই আসেনি। এ জন্য তার ভূমিকা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। তার সঙ্গে আছেন প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। দলের সঙ্গী হয়েছেন টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ সুজন। এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বিশাল কোচিং বহর নিয়ে ভারতে গেলেও ফায়দা লুটছে প্রতিপক্ষ। তিনজনের বুদ্ধিতে বরং সব হয়েছে গড়বড়। দলও তার চড়া মূল্য দিয়েছে ১৩৭ রানের বড় ব্যবধানে হার মেনে। কিন্তু তারপরও বোলিং নেওয়ার সিদ্ধান্তটাকে ভুল মানতে নারাজ হাথুরু। দেখছেন না শ্রীরামের কোনো ভুলও, ‘আমার মনে হয় না আগে বোলিং নিয়ে আমরা ভুল করেছি। কারণ উইকেটে কিছু ছিল, বিশেষত খেলা শুরু হয়েছে সাড়ে ১০টায়, আগের দিনও একই কাজ করেছি। কিছুটা বৃষ্টি ছিল। উইকেটেও কিছু ছিল। ব্যাপারটা হচ্ছে, আমরা ঠিক জায়গায় বল করিনি। আমাদের লাইন-লেন্থ ভালো ছিল না। শ্রীরাম আমাদের পরামর্শক। শেষ বিশ্বকাপেও দলের সঙ্গে ছিল। ওর দায়িত্ব অনেক বড়, শুধু পিচই না।’
শুধু পিচই ঠিকঠাক পড়তে পারেনি। ব্যাপারটা এখানেই শেষ নয়। একাদশ গঠনে ভুল করে বসেছে বাংলাদেশ। ইংল্যান্ড যেখানে স্পিনার মঈন আলিকে বসিয়ে একাদশে নেয় রিচ টপলিকে। তাদের সিদ্ধান্তটা যে ঠিক ছিল। মাঠের পারফরম্যান্সে সেটা প্রমাণও করেছেন এ ইংলিশ পেসার। সেই টপলি ইংল্যান্ডের জন্য বনে যান সুপার-চেঞ্জ। তিনিই তো টাইগারদের ব্যাটিং লাইনআপে মড়ক লাগিয়ে দেন। আর বাংলাদেশ অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে বসিয়ে রাখে। যিনি ব্যাটিং দৃঢ়তা দেখানোর সুযোগ পেতে পারতেন। তার বদলে বাংলাদেশের একাদশে নেওয়া হয় শেখ মাহেদি হাসানকে। তারকা এ স্পিনার অসময়ে চার উইকেট পেলেও ব্যাট হাতে তেমন কোনো অবদান রাখতে পারেননি। পেসারদের মতো স্পিনাররাও সময়মতো চেনা রূপটা দেখাতে পারেননি। শুরুর নির্বিষ বোলিংই বাংলাদেশের হারকে ত্বরান্বিত করেছে। ইএসপিএন ক্রিকইনফোর ম্যাচপরবর্তী আলোচনায় মাহমুদউল্লাহর বাদ পড়া মানতে পারেননি ক্রিকেট বিশ্লেষক ওয়াসিম জাফর- ‘টসের সিদ্ধান্তটা আমি বুঝতে পেরেছি। তারা আগে বোলিং করেই আফগানিস্তানের বিপক্ষে জিতেছিল। উইকেটেও আপনি কিছুটা আর্দ্রতা আশা করতেই পারেন। তবে রিয়াদকে (মাহমুদউল্লাহ) বাদ দেওয়ায় অবাক হয়েছি। কারণ ইংল্যান্ডে ডানহাতি ব্যাটসম্যানই বেশি, মাঠ ছোট। এই সিদ্ধান্তে অবাক হয়েছি।’
অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের কর্ণধার হয়ে উঠেছে পেস ডিপার্টমেন্ট। সেটা অবশ্য দক্ষিণ আফ্রিকান পেস বোলিং কোচ অ্যালান ডোনাল্ডের কল্যাণে। সেই পেসাররা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের ঠিকমতো মেলে ধরতে পারেননি। লাইন-লেন্থ-সুইং-ইয়র্কার কোনো কিছুতেই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ রাখতে পারেননি। নিজেদের জ্বলে উঠতে না পারার ব্যর্থতাটা তো ম্যাচ শেষে স্বীকার করে নিয়েছেন গতির তারকা তাসকিন আহমেদ, ‘আউটফিল্ড একটু নরম ছিল। দৌড়ানো কঠিন ছিল। কিন্তু অজুহাত দিয়ে তো লাভ নেই। কন্ডিশন যেমনই হোক, এগুলো তো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই এটা মেনে নিয়েই আরেকটু ভালো করা উচিত ছিল। আমাদের সামর্থ্যের চেয়ে এই ম্যাচে বোলিংটা একটু খারাপ করে ফেলেছি। বড় লক্ষ্য হয়ে যাওয়ার কারণে হয়তো ব্যাটিংটাও ওইভাবে ভালো হয়নি।’ বাজে আউটফিল্ডে ফিল্ডিং হয়েছে গড়পড়তা। ছিল না কোনো উদ্যম। যে কারণে লড়াইটাও জমে ওঠেনি। জয়ের সম্ভাবনাও উঁকি দেয়নি দেশের ক্রিকেটের মেঘে-ঢাকা আকাশ চিরে। পুরোনো চেহারায় ফিরে দল হজম করে বাজে হারের তেতো স্বাদ।