কলাম
ইয়াসেফ ইমরোজ ইফাজ
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ২০:৪৫ পিএম
আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ২০:৫৭ পিএম
তামিম ইকবালকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে রাখা হয়নি। এর সঠিক ব্যাখ্যা বা কারণ আমাদের জানা নেই। যতটুকু জানা যায়, তামিমের ফিটনেস বড় কারণ। মূল আলোচনায় আসার আগে কিছু তথ্য জানাতে চাই। বিষয়গুলো জানা থাকলে পুরো ঘটনাটি বোঝা সবার জন্য সহজ হবে।
আরও পড়ুন - যাদের পাওয়া যাবে না বিশ্বকাপে
বিশ্ব ক্রিকেটের দিকে তাকালে দেখবেন নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন এখনও শতভাগ ফিট নন। খুব সম্ভবত তিনি কিউইদের প্রথম ম্যাচে হয়তো থাকবেনও না। অস্ট্রেলিয়ার ট্রাভিস হেড দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ইনজুরিতে পড়েছেন, তবুও তাকে অস্ট্রেলিয়া স্কোয়াডে রেখে দিয়েছে। যদিও অনিশ্চিত তিনি পুরো আসরের কোনো একটি ম্যাচে খেলতে পারবেন কি না।
আরও একটি উদাহরণ যদি টানি, ২০২২-২৩ বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিতে মিচেল স্টার্ক শতভাগ ফিট না হয়েই খেলেছেন। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে সব। আমি শতভাগ ঠিক নেই, তবে বোলিংটা দারুণ হচ্ছে। আমি ভালো বোধ করছি।’
এখন প্রশ্ন আপনার মনে আসতেই পারে। কেন শতভাগ ফিট না হওয়া সত্ত্বেও খেলোয়াড়দের সিলেক্ট করা হচ্ছে। তাও আবার সেই সব দলে যারা কি না চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেসে এগিয়ে। কারণ, তারা ‘গান প্লেয়ার্স’। তারা যেই ম্যাচে খেলেন সেই ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের জন্য ট্রাভিস হেড-উইলিয়ামসন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তামিম ইকবালও কিন্তু বাংলাদেশের সেটআপের জন্য তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের চিন্তাধারা চ্যাম্পিয়নদের মতো নয়।
তামিম নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে প্রথম দুটি ম্যাচ খেলেছেন। তাকে দেখে মনে হয়নি তিনি খুব সমস্যায় রয়েছেন। তার মুভমেন্ট বা ব্যাটিং দেখে স্পেশালি মনে হয়েছে তিনি ইনজুরি কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছেন এবং ঠিকঠাকভাবে কাটিয়ে উঠে সবকিছু মানিয়ে নিচ্ছেন দারুণভাবে। তামিম প্রেস কনফারেন্সে এসে বলেছেন কিছুটা ডিস কমফোর্ট আছে। এর মানে এই নয় যে বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন না। তিনি তার জায়গায় ক্লিয়ার ছিলেন।
তবে যারা গুজব ছড়িয়েছেন, তামিম বলেছেন সর্বোচ্চ পাঁচটি ম্যাচ খেলতে পারবেন, এর বেশি নয়। সত্য ঘটনা হচ্ছে, তামিম এই বিষয়টিতে কোনো আলাপ বা বক্তব্য কখনও দেননি। বাংলাদেশ দলের বা অন্য কোনো খেলোয়াড় কি বলতে পারবেন যে তিনি সবগুলো ম্যাচ খেলতে পারবেন বিশ্বকাপে! ইনজুরি সাকিব আল হাসানেরও হতে পারে, বা অন্য কোনো খেলোয়াড়েরও হতে পারে। বিশ্বকাপ অনেক লম্বা একটা টুর্নামেন্ট, এখানে খেলোয়াড়দের ফ্রেশ রাখার জন্য রোটেশন অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
অস্ট্রেলিয়া, ভারত অথবা ইংল্যান্ডের মতো দল দুই সেট দল বানাতে চাচ্ছে, অনেক বেশি পরিবর্তন নিয়ে। যাতে বেশিরভাগ খেলোয়াড় বিশ্বকাপে ফিট থাকেন। তা ছাড়া আরও একটা জিনিস উল্লেখ করতেই হবে- তামিমের বিকল্প কি আমাদের দলে এখন আছে? বা আমরা কি তার বদলি কাউকে তৈরি করতে পেরেছি? অন্তত আমার চোখে পড়েনি। আপনারাও হয়তো একই মত দেবেন।
তানজিদ হাসান তামিমের সক্ষমতা আছে সিওর। কিন্তু তাকে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে আনা একটু আগেভাগেই হয়ে গেছে। নাঈম শেখ মোটাদাগে ব্যর্থ হয়েছেন। জাকির হাসানের অভিষেক হলো মাত্র, এবং ব্যর্থ হয়েছেন। এনামুল হক বিজয় ইতোমধ্যে অনেকবার ব্যর্থ হয়েছেন। অতএব সবাই ব্যাকআপ হতে পারেন কিন্তু রিপ্লেসমেন্ট হওয়া কঠিন। তো সমাধান কী হতে পারত! হয় আফিফকে দলে এনে মেকশিপ ওপেনার হিসেবে খেলাতে পারতেন, শান্তকে দিয়ে ওপেন করানো যেত। তা ছাড়া মিরাজকে দিয়ে তো আগেও আমরা ওপেন করিয়েছি। আদর্শ না হলেও সমাধান ছিল। কিন্তু সমাধানের মুডে কেউ ছিলেন না।
আরও একটা কাকতাল ঘটনা চোখে পড়েছে, তামিমকে তো দলে নেওয়া হয়নি। এরই সঙ্গে নাফিস ইকবাল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডে ম্যাচ চলাকালে পদ ছেড়েছেন। বিশ্বকাপে লজিস্টিক ম্যানেজার হিসেবে তিনি থাকবেন না। ছোট ভাইয়ের মতো তিনিও ছেড়ে গেছেন। আরেকটা বিষয় ক্লিয়ার করা দরকার, অস্ট্রেলিয়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগেও এমনটি ঘটেছিল।
নাফিস সেবার টিম ম্যানেজারের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এটা কি কাকতাল, মোটেও নয়! দিনের শেষে আসলে ইমপ্যাক্ট কার ওপর পড়ছে? বাংলাদেশ ক্রিকেটের ওপর। দেশের ক্রিকেটকে বিভক্ত করে দেওয়া হয়েছে সিস্টেমেটিক রুলসে ভুগে। তিন-চার মাস আগে যে দল নিয়ে আমরা এত স্বপ্ন দেখেছি, সেই স্বপ্নগুলো বাস্তবতার কাছে ধূলিসাৎ হচ্ছে। মাঠের বাইরের এসব ইস্যু, ড্রেসিংরুমের অস্থির পরিস্থিতি- এগুলোর রেজাল্ট মাঠের পারফর্মে পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি আফগানিস্তানের সঙ্গে সিরিজ হেরেছি, এশিয়া কাপে বাজেভাবে ব্যর্থ হয়েছি, নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সিরিজ হেরেছি- এগুলো সারপ্রাইজিং ছিল না।
সবই টিম পরিচালনা, অস্থিরতা এবং আনপ্রফেশনালিজমের ফল। যেটা আমাদের জন্য কখনও কাম্য নয়। এখন আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন, এসব কেন হচ্ছে? আপনি ঘাটতিগুলোতে যদি নজর দেন, তাহলে নিজেই এসবের উত্তর পেয়ে যাবেন। কিন্তু হাথুরুসিংহে আসায় যেমনটি মনে হচ্ছে এটি বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে, তিনি ডিক্টেটরশিপ করছেন এবং এর সঙ্গে যোগ হলো নতুন অধিনায়কের আধিপত্য। টিম সিলেকশন, সাকিবকে যেভাবে অধিনায়কত্ব দেওয়া হলো, তার শর্তগুলো যেভাবে মানা হয়েছে বা হচ্ছে; মিডিয়ার মাধ্যমে এসব আমরা শুনতে পাচ্ছি। এই চেইন অব ইভেন্টগুলো বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনছে না।
যেটা মনে হচ্ছে, সামনে আরও অনিশ্চিত পরিস্থিতি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে অনেক নাটকীয় ঘটনা আমাদের নিশ্চয় মনে আছে। একজন সিনিয়র ক্রিকেটার অবসর নিচ্ছেন, ওদিকে অধিনায়ক বলছেন সেরা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। আপনি কি ওই আসরকে সাকসেসফুল বলবেন? উত্তরটা আপনিই দিয়েন।
বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কদিন বাকি আছে। অনেকে জানতে চান পরিস্থিতি যেভাবে ঘোলাটে হচ্ছে, হঠাৎ যদি শুনি বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে না...।
কি জানি সেটাও সত্যি সত্যি শুনতে হয় কিনা!
লেখক : অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ক্রিকেট বিশ্লেষক