প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৩ ২১:৫৬ পিএম
আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৩ ২১:৫৮ পিএম
‘ফুটবল খেলাটা খুবই সহজ। ২২ জন খেলোয়াড় ৯০ মিনিট বলের পেছনে দৌড়ায় আর শেষে জার্মানিই সব সময় জেতে।’- কথাগুলো গ্যারি লিনেকারের। জার্মানির কাছে এক হারের পর বলেছিলেন তিনি। তবে জার্মানিকে সরিয়ে বসুন্ধরা কিংসের নাম যোগ করে দিলে বাংলাদেশ ফুটবল লিগের সঙ্গেও কথাটা চলে যায় বেশ। বসুন্ধরার আবির্ভাবের পর থেকে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার ফুটবল লিগ মানেই যে তাদের শিরোপা-জয়!
দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে নাম লেখানোর পর থেকেই বসুন্ধরা কিংস বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে শক্তিধর দলের নাম। বসুন্ধরা বিপিএলে খেলছে, আর শিরোপা জিতছে না- এমনটা হয়নি কখনোই। হয়নি এবারও। লিগের মাঝপথেই শিরোপা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, দ্বিতীয় ভাগে এসে স্রেফ আনুষ্ঠানিকতাটাই সেরেছে দলটি।
তবে বাংলাদেশের ফুটবলে বসুন্ধরা এই দাপট দেখাতে পারছে নিজেদের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো বসুন্ধরাকে আলাদা করে দিয়েছে বিপিএলের আর সব দলের চেয়ে। দেশের ফুটবলে আবাহনী-মোহামেডানের মতো ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর আধিপত্যও অনেকটাই কমে গেছে তাতে।
তাদের রেকর্ড টানা চারবারের শিরোপা-জয় জানান দিচ্ছে- বসুন্ধরার এই সাফল্য মোটেও দৈবাৎ কিছু নয়। এসব নিয়ামকই বসুন্ধরাকে সফল করেছে, বাকিদের স্রেফ দর্শকের কাতারে রেখে।
পেশাদারত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা
মানদণ্ডটা যখন হয় পেশাদারত্বের, বসুন্ধরা সেখানে যোজন যোজন এগিয়ে বিপিএলের আর সব ক্লাবের চেয়ে। নিজস্ব মাঠ বর্তমানে একমাত্র তাদেরই আছে। এখানেই তো শেষ নয়। ক্লাবটির আছে নিজস্ব অনুশীলন সুবিধা, সঙ্গে আবাসন ব্যবস্থাও।
এ তো গেল শুধু অবকাঠামো। ক্লাবের বাকি সব কাঠামোতেও পেশাদারত্বের ছাপ পরিষ্কার। বসুন্ধরার কোচিং স্টাফ, মেডিকেল টিম ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা সবকিছুই সামলানো হয় বেশ পেশাদার কায়দায়। যে কারণে ক্লাবের সাবেক খেলোয়াড়রা একে ইউরোপিয়ান ক্লাবের সঙ্গে তুলনা দিতেও দ্বিধায় ভোগেন না।
ক্লাবটির পরিকল্পনাতে আছে দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা, যা পেশাদারত্বেরই নামান্তর। বিদেশি খেলোয়াড়দের চুক্তি শেষের আগেই নতুন চুক্তির কথা ভাবা, তা বাস্তবায়ন করা- এমন সব কিছু বসুন্ধরা শেষ কয়েক বছরে করে দেখিয়েছে। পুরো বিষয়টা যেভাবে সামলানো হয়, তাতে সাংগঠনিক দক্ষতারও প্রয়োজন। ক্লাবটি ধারাবাহিকভাবে তা করেও যাচ্ছে।
কোচিং স্টাফ
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে আসার পর থেকেই কোচ অস্কার ব্রুজন আছেন দলটির কোচের ভূমিকায়। তার সহকারীদের চেহারাও বদলায়নি খুব একটা। শুরু থেকে এ পর্যন্ত সাফল্য কখনোই মুখ ফিরিয়ে নেয়নি, তাতে তাদের অবদান বেশ। কোচদের কাজ যেমন প্রতিপক্ষের শক্তি-সামর্থ্য বিচারে দলের কৌশল ঠিক করে দেওয়া, দলের ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট, ম্যান ম্যানেজমেন্টের বিষয়গুলো সামলাচ্ছেন তারা সুনিপুণভাবে।
ধারাবাহিক সাফল্য পেতে থাকা দলের কোচিং করানোর কাজটা যে সহজ নয়, তা জানিয়েছেন সহকারী কোচ মাহবুব হোসেন রক্সি। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন খেলার ফলে টানা সাফল্য পাওয়ার পরে একসময় অবসাদ চলে আসতে পারে, খেলোয়াড়দের মধ্যে আত্মতুষ্টিটা পেয়ে বসতে পারে; তখন আমাদের দায়িত্বটা বেড়ে যায়। খেলোয়াড়দের অনুপ্রেরণা জোগাতে হয় তখন আমাদের, তাদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখতে হয়, তাদের ভেতরে জয়ক্ষুধাটা আবার ফিরিয়ে আনতে হয়।’
দেশি ও বিদেশি খেলোয়াড় বাছাই
বসুন্ধরা কিংস প্রথমবার যখন প্রিমিয়ার লিগে এসেছিল, তখনই দিয়েছিল এক চমক। ২০১৮ বিশ্বকাপ শেষের কিছু পরেই দলে ভেড়ায় সেই বিশ্বকাপে কোস্টারিকার হয়ে খেলা দানিয়েল কলিন্দ্রেসকে। প্রিমিয়ার লিগ যুগে বাংলাদেশের ফুটবলে বিশ্বকাপে খেলা কোনো খেলোয়াড়ের আগমন এর আগে ছিল না।
এরপর লিওনেল মেসির আর্জেন্টাইন সতীর্থ হেরনান বার্কোসকে দলে টেনেছিল ২০২০ এএফসি কাপকে সামনে রেখে। করোনা মহামারির ঠিক আগে একটা ম্যাচ খেলেছিলেন বসুন্ধরার জার্সি গায়ে, সে ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে চিনিয়েছিলেন নিজেকে। তাকে অবশ্য খুব বেশিদিন পায়নি।
বর্তমানে দলটিতে খেলছেন রবসন রবিনহো, মিগেল দামাসেনো, দরিয়েলতন গোমেজদের মতো বিদেশিরা। সঙ্গে দেশিদের তালিকাটাও দেখুন- আনিসুর রহমান জিকো, তপু বর্মণ, তারিক কাজী, বিশ্বনাথ ঘোষ, সোহেল রানা থেকে শুরু করে তরুণ তুর্কি শেখ মোরসালিন… সদ্য সমাপ্ত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ দলের একটা বড় অংশ তো এই বসুন্ধরারই। এই দুইয়ের মিশেলেই দলটা শক্তিশালী হয়েছে বহুগুণে। টানা চার লিগ যার ফল।