তারেক আজিজ
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৩ ১৫:৩৯ পিএম
টেস্ট ক্রিকেটে এমনিতেই আমরা অবহেলিত। আমরা যদি অতীতের টেস্ট ম্যাচগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে দেখব সেখানে নানাভাবে বঞ্চিত হয়েছি। এ অবস্থা থেকে আমাদের পেসাররা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। দাপট, অ্যাগ্রেশন সব ছিল এই টেস্টে; এক কথায় যা চমৎকার যা আমরা পেসারদের থেকে দেখতে চেয়েছি এতটা সময়।
তিনজন পেসার সত্যিকার অর্থেই আমাদের দৃষ্টি জুড়িয়েছে, মন ভরিয়েছে। দিনশেষে শত শত বছরের ইতিহাসে একটা সাক্ষীর জায়গায় নিয়ে এসেছে। অধিনায়ক লিটন দাস প্রেস কনফারেন্সে যেটা বলেছে, অধিনায়ক হিসেবে এর থেকে ভালো আপনি আশা করতে পারেন না। আর আমরা যারা দর্শক, সাবেক ক্রিকেটার তারাও এটা দেখে শান্তি পাই। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে আমাদের নামটা (বাংলাদেশ) এখন স্মরণ করা হবে। কেননা, টেস্ট ক্রিকেটের শত বছরের ইতিহাস আমরা ওলট-পালট করে দিয়েছি।
একই সঙ্গে ঢাকা টেস্টে আফগানদের বিপক্ষে আমরা দারুণ ব্যাট করেছি। বিশেষভাবে নাজমুল হাসান শান্ত, মুমিনুল হক, লিটন দাস, জাকির হাসান, মাহমুদুল হাসান জয়Ñ সব ব্যাটারকে কৃতিত্ব দিতে হবে। আমাদের দারুণ ব্যাটিংয়ের কারণেই ওদেরকে সাধারণ মানের বোলার মনে হয়েছে। একই সঙ্গে বোলিংটা আমরা এতটাই ভালো করেছি যে, তাদের ব্যাটারদের মনে হয়েছে সাধারণ ব্যাটার। আপনার স্কিলে যখন অনেক বেশি মনোযোগী হবেন তখন তফাৎটা অনেক বেশি প্রতিফলিত হবে। আমার কাছে মনে হয়, ওভারঅল ক্রিকেট একটা দলগত খেলা। আমাদের ব্যাটাররা একটা চমৎকার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছে। এরপর আমাদের বোলারদের যে কাজটা ছিল তারা এত ভালোভাবে সেই কাজটা করে দিয়েছে যে, আপনি এরচেয়ে ভালো আশাই করতে পারেন না। তাসকিন প্রথম ইনিংসে কিছুটা এলোমেলো ছিল, কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে দুর্দান্ত প্রতাপের সঙ্গে ফিরে এসেছে। তার অ্যাগ্রেশন, ফায়ার অব বোলিং, পেস সব মিলিয়ে ছিল অসাধারণ। অন্যদিকে ইবাদত ছিল এক কথায় আউটস্ট্যান্ডিং।
ইবাদতের সঙ্গে ডিপিএলে কাজ করেছি। ইবাদত এখন যে অব্স্থায় আছে সেটা দেখতেও ভালো লাগে। একজন পেসারের যেই জায়গাতে থাকা দরকার সেই জায়গাটাতে ও চমৎকারভাবে অবস্থান করছে। এইরকমভাবে শরিফুলকেও আমরা দেখেছি। এই তিনজনই কিন্তু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চমৎকার একটা জয় এনে দিয়েছিল। আমার দেখা ওটাই বাংলাদেশের সেরা। দিনশেষে টেস্ট হলো বোলার গেম। ব্যাটসম্যানরা যতই রান করুক না কেন ম্যাচ জিততে হলে বোলারদের উইকেট নিতেই হবে। কাজেই পেসারদের এই প্রশংসা প্রাপ্য।
মিরপুর এমনিতেই রহস্যজনক জায়গা। টিম ম্যানেজমেন্ট যেমন চেয়েছে তেমন উইকেটই প্রস্তুত হয়েছে। এমনকি উইকেটটা ভাঙলেও কেউ বলতে পারবে না উইকেটে ডাবল পেস ছিল। উইকেট যথেষ্ট পেস ক্যারি করেছে। উইকেটে বাউন্স ছিল। যেটা আমাদের পেসারদের বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। দিনশেষে এটা আশ্চর্যজনক তো বটেই, কেননা এত বছরের ইতিহাসে মিরপুরে এর আগে কখনোই এমন উইকেট দেখা যায়নি। তবে এক্ষেত্রে পেসারদেরও অবদান আছে, কেননা তারা টিম ম্যানেজমেন্টকে ওই আত্মবিশ্বাসটা দিতে পেরেছে যে আমাদের যদি উইকেটটা দেওয়া হয় তাহলে আমরা আপনাদের একটা সুন্দর জয় উপহার দিতে পারব।
এবারের প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান সে অর্থে এতটা শক্তিশালী নয়। পেসারদের চ্যালেঞ্জটাও এসবের ওপর নির্ভর করে। অনেক জায়গা আছে যেখানে আমাদের পেসাররা এখনও ওই মানে পৌঁছায়নি, যেটা আমরা বিশ্বের সেরা পেসারদের ক্ষেত্রে দেখে থাকি। তবে তারা সেই প্রসেসে রয়েছে। আমার মনে হয় না প্রথম দিন আপনি যেই লেন্থে বোলিং করছেন চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে সেই একই লেন্থে বোলিং করবেন। উইকেট বুঝে সে অনুযায়ী আমাদের বোলিং করতে হবে।
পেসারদের উত্থানের পেছনে আমাদের পেস বোলিংয়ের গুরু সারওয়ার ইমরান স্যারের একটা অবদান আছে। ক্রিকেটে পেস বোলার সাপ্লাই দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি একটা চেইন হিসেবে কাজ করছেন। সেখান থেকে মাশরাফি একটা লম্বা সময় ধরে আমাদের পেসারদের নেতা হিসেবে ছিল। তাকে দেখে অনেকেই উদ্বুদ্ধ হয়েছে। এরপর রুবেল হোসেন ছিল। আমরা কালেভদ্রে যেই টেস্ট ম্যাচগুলো জিতেছি সেখানেও কিন্তু পেসারদের অবদান ছিল। এ ছাড়া জাতীয় দলে কিছু পেসারদের ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে ওটিস গিবসনকে কৃতিত্ব দিতেই হবে। পেস বোলার আসলে আলাদা আর্ট, আলাদা সোন্দর্য। তারা সেটা যত বেশি যত্ন করার সুযোগ পাবে তত বেশি আপনার হয়ে কাজ করবে।
ওটিস গিবসন যেভাবে পেসারদের রক্ষা করেছেন, বিশ্রাম দিয়েছেন, তাতে পেসারদের কিন্তু চোটপ্রবণতা অনেকটাই কম ছিল। চাম্পাকা অনেক দিন ধরে কাজ করছেন জাতীয় দলের বাইরে। তার অবদানও যথেষ্ট। আমাদের জ্যাকি ভাই এইচপি দলে কাজ করছেন। আর এখন তো অ্যালান ডোনাল্ড এসেছেন, যিনি অনেক অভিজ্ঞ। তা ছাড়া টেস্ট খেলা বাংলাদেশি অনেক বোলারও কিন্তু কোচিংয়ে এসেছে। আমি এসেছি, তালহা এসেছে, ডলার মাহমুদ এসেছে, নাজমুল এসেছে। আর তারা সবাই জানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলতে হলে কোন ধরনের গুণ থাকতে হয়। তারা নিশ্চয়ই পেসারদের সঙ্গে সেসব নিয়ে কাজ করছে।
পেসাররা সব সময় চায় একটা সঠিক উইকেট হোক। যেখানে ব্যাটার-বোলার সবাই সমান সুযোগ পাবে। সব সুযোগ ফিফটি ফিফটি থাকুক। আর যখন আমরা স্কিল অনুযায়ী উন্নতি করব, তখন সেই স্কিলকে কাজে লাগিয়ে আমরা এমনিতেই বাড়তি সুবিধা পাব। আমি এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পাপন ভাইয়ের কাছে একটা অনুরোধ জানাতে চায়, উনি যেন পেসারদের জন্য একটা একাডেমি করেন, যেটা পেসারদের অনেক দিনের স্বপ্ন। আমরা আসলে দেখে যেতে চাই, পেস বোলিং একাডেমি আমাদের আছে। তবে আমি বলব সব সময় পেসাররা সহায়তা পাবে এমন উইকেটের প্রয়োজন নেই। দরকার ট্রু ও সলিড উইকেট। যে উইকেটে ব্যাটার বা বোলার তার যেই স্কিলটা রয়েছে তার পর্যাপ্ত সুযোগটা নিতে পারে। যার স্কিল বেশি সেই যেন এগিয়ে যায়।
লেখক : বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার, বর্তমানে পেস বোলিং কোচ