নেয়ামত উল্লাহ
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৩ ০৯:৪৪ এএম
আপডেট : ১৭ জুন ২০২৩ ০৯:৪৮ এএম
ঢাকা টেস্টে বাংলাদেশের দুই সাফল্যের রূপকার নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুমিনুল হক। টানা দুই শতক হাঁকানো শান্ত অভিনন্দন জানাচ্ছেন ২৬ মাস পর সেঞ্চুরির দেখা পাওয়া মুমিনুলকে। গতকাল মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে - আ. ই. আলিম
এভারেস্টসম লিড আগের দিনই জমা পড়েছিল বাংলাদেশের খাতায়। তবে দলের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে যে আছে ৪০০ ছোঁয়া রানের লক্ষ্য দিয়েও হারের ‘কীর্তি’, তাদের মনে খচখচানিটা থেকে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তার ওপর বাকি ছিল খেলার তিন দিন, ইনিংস ঘোষণা করার তাড়া কোথায়?
আরও পড়ুন : রুটের সেঞ্চুরিতে ইংলিশ শিবিরে স্বস্তি
কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে দিনের শুরুতে বলেই ফেললেন, নাজমুল হোসেন শান্তরা পুরো দিন খেললেও সমস্যা দেখছেন না। পুরো দিন নয় অবশ্য, বাংলাদেশ খেলল আরও আড়াই সেশন। শান্তর সঙ্গে মুমিনুল পেলেন খরা কাটানো এক সেঞ্চুরি।
তাতেই এভারেস্টসম লিডটা রূপ নিল অলিম্পাস মঁসে, যে রানশৃঙ্ঘ জয় করা প্রায় অসম্ভব। ৬৬১ রানের লিড দিয়ে বাংলাদেশ দিন শেষের আগেই তুলে নিয়েছে ২ উইকেট। বড় জয়টাকে তাই মনে হচ্ছে সময়ের অপেক্ষা।
দিনের শুরুটা হয়েছিল বৃষ্টি দিয়ে। ভোরের বৃষ্টি অবশ্য টিকল না বেশিক্ষণ। ম্যাচ যখন শুরু হলো, শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে তখন ঠিকরে পড়ছে রোদ। তবে দিনের শুরুটায় অবশ্য একটু নড়বড়েই ছিলেন আগের দিনের দুই থিতু ব্যাটার জাকির হাসান আর শান্ত। মাঝব্যাটে শট খেলতে বেগ পেতে হচ্ছিল। তবে সময় গড়াতেই সে অস্বস্তিটা উবে গেল একেবারে। তৃতীয় দিনে মিলল প্রথম দিনের অনুভূতি, নিজে থেকে উইকেট না খোয়ালে বুঝি উইকেটই যাচ্ছে না আর!
এরপরই জাকিরের বিদায় ঘটল। সেটাও নিজেদের ভুলেই। বাউন্ডারি লাইনে বল পাঠিয়ে একটা রান বাড়তি চুরি করতে চেয়েছিলেন। হলো না আর। রান আউটের কাটায় শেষ হয় তার সেঞ্চুরির সম্ভাবনা।
জাকির না পারলেও শান্ত ঠিকই পেরেছেন। আগের ইনিংসের সেঞ্চুরির পর দ্বিতীয় ইনিংসেও তার নামের পাশে বসল তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার। তাতে রেকর্ডটাও হয়ে যায় তার, দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে গড়েন জোড়া ইনিংসে সেঞ্চুরির কীর্তি।
যার রেকর্ডটা ছুঁয়েছেন, সেই মুমিনুল তখন এপাশ থেকে দেখছেন; ২০১৮ সালে তিনিই যে এ অভূতপূর্ব অনুভূতিটা উপহার দিয়েছিলেন বাংলাদেশকে। তবে সময়ের ফেরে তিনি লড়ছিলেন ছন্দহীনতার সঙ্গে, সেঞ্চুরি ছিল না ২৬ ইনিংস ধরে। শান্তকে দেখেই হয়তো তিনিও পরে ছুঁয়েছেন তিন অঙ্ক। প্রায় ২৬ মাস পর সেঞ্চুরির দেখা পান টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সেঞ্চুরিয়ান।
শান্তর শতক মুমিনুল দেখলেও এরপর এর উল্টোটা ঘটেনি অবশ্য, ১২৪ রান করা শান্ত বিদায় নিয়েছেন মুমিনুলের সেঞ্চুরির আগেই। এরপর মুশফিকও ফিরলেন দ্রুতই। প্রথম ইনিংসে শেষ ৯ রানে ৫ উইকেট খুইয়েছিল বাংলাদেশ। মুশফিকের দ্রুত বিদায়ের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও তেমন কিছুর শঙ্কা তাই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছিল না।
তবে সব উড়ে গেল মুমিনুল আর লিটন দাসের ব্যাটে। মুমিনুলের মতো না হলেও লিটনের বড় রান পেতে সমস্যা হচ্ছিল শেষ কিছুদিন ধরেই। দারুণ শুরুর পরও যে সেসবকে বড় কিছুতে রূপ দিতে পারছিলেন না! মুমিনুলের স্বস্তির দিনে লিটনও সে ‘খরা’ কাটালেন। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক সব শটে রান তুলছিলেন দ্রুত। পেয়ে যান ফিফটির দেখাটাও। যেভাবে খেলছিলেন, তাতে তিন অঙ্ক হয়তো ছুঁয়ে ফেলতেন তিনিও।
সেটা হয়নি ইনিংস ঘোষণা করে ফেলায়। ইনিংসের ৮০তম ওভার শেষ হতেই দুই ব্যাটার মিলে হাঁটতে শুরু করেন ড্রেসিংরুমের দিকে। ৬৬১ রানের অলিম্পাস মঁস সমান পুঁজিটা ততক্ষণে পাওয়া হয়ে গেছে।
ইনিংস ঘোষণাটা আরও আগে হতে পারত কি না, তা নিয়ে আগেই আলোচনা চলছিল ধারাভাষ্য কক্ষে। তবে কেন করা হয়নি, তার একটা কারণ বোলাররা দর্শালেন এরপর।
ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশ নামছে যখন, তখন বিপুল হর্ষধ্বনিতে দলকে বরণ করে নেন দর্শকরা। সে চিৎকার থামতে না থামতেই তাদের আরও একবার চিৎকারের উপলক্ষ এনে দেন শরিফুল ইসলাম। ইনিংসের প্রথম বলেই ফেরান ইবরাহিম জাদরানকে।
সবুজ উইকেটে পেস-উৎসব হচ্ছে রীতিমতো, অথচ সেখানে তাসকিনের নাম ছিল না একটিবারও। অন্তত কাল বিকালের আগ পর্যন্ত। সে উৎসবে তাসকিন যোগ দেন পরের ওভারেই। উইকেটের পেছনে ক্যাচ বানিয়ে ফেরান আবদুল মালিককে।
কিছুক্ষণ পর তিনি ‘ফিরিয়েছেন’ আরও একজনকেও। তার বাউন্সারের বল আফগান অধিনায়ক হাসমতউল্লাহ শাহিদির মাথায় গিয়ে লাগে। ফলে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। আফগান কোচ জনাথন ট্রট জানালেন, স্থিতিশীল আছেন তিনি এখন। তবে তিনি স্থিতিশীল থাকলেও তার দল অবশ্য তা নেই। ৬৬২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে ৪৫ রানে ২ উইকেট খুইয়ে বসলে তা আর থাকা যায় কী করে?
এদিকে বাংলাদেশ প্রহর গুনছে রেকর্ড জয়ের। নিজেদের ইতিহাসে রানের ব্যবধানে সর্বোচ্চ জয়টা ২২৬ রানের, ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেই প্রথম জেতা টেস্টে। সে রেকর্ডটা থেকে বঞ্চিত করতে হলেও আফগানদের করতে হবে আরও চারশ ছুঁইছুঁই রান। যেটা হলে আফগানদের নিজেদের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটা তো বটেই, ভাঙতে হবে মিরপুরে চতুর্থ ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটাও। ট্র্যাক রেকর্ড বলছে, তেমন কিছু প্রায় অসম্ভবই।
আফগানরা অবশ্য এরপরও হার এড়াতে পারে। মিরপুরের আকাশ কাল সন্ধ্যাতেই কেঁদেছে অঝোরে। ম্যাচেও সে কান্না হোক- প্রার্থনাটা এমনই করতে হবে সফরকারীদের। বাংলাদেশ তার উল্টোটা চাইবে নিশ্চিতভাবেই।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ : ৩৮২ ও ৪২৫/৪ ডি. (শান্ত ১২৪, মুমিনুল ১২১, লিটন ৬৬; জহির ২/১১১)
আফগানিস্তান : ১৪৬ ও ৪৫/২ (রহমত ১০; শরিফুল ১/৭, তাসকিন ১/২৮)