নেয়ামত উল্লাহ, কুমিল্লা থেকে
প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৩ ০৯:৩১ এএম
আপডেট : ৩১ মে ২০২৩ ০৯:৫৩ এএম
গোলের আনন্দে উদ্বেল সুলেমান দিয়াবাতে। ৪ গোল করে তিনিই মোহামেডানকে এনে দিলেন শিরোপা। মঙ্গলবার কুমিল্লায় আবাহনীকে টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হারিয়ে ফেড কাপ চ্যাম্পিয়ন মোহামেডান - আ. ই. আলীম
‘কী এক ফাইনাল দেখলাম। মাথা এখনও ধরে আছে’- স্টেডিয়াম গেটের মুখে একজন বলে উঠলেন। আবাহনী-মোহামেডানের মহাকাব্যিক ফাইনালের মোহ চোখেমুখে যার, তার গায়ের পোশাক দেখে অবশ্য বোঝার জো নেই, তিনি কোন দলের সমর্থক। ধরে নেই তিনি স্রেফ আবাহনী-মোহামেডানের মহারণ দেখতেই এসেছিলেন। ঝুলিতে তিনি কোনো স্মৃতি পুরে নিয়ে যাচ্ছেন ঘরে? মহাকাব্যিক এক ফাইনালের স্মৃতি। এমন এক ফাইনাল, যার দেখা সচরাচর মেলে না।
আরও পড়ুন : ১৩ হাজার ৭৮০ কোটি টাকায় রাজি মেসির বাবা
এমন দর্শকের দেখা গতকাল কুমিল্লার ভাষাশহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে মিলেছে অহরহ। কারও মাথায় হাত, কারও মুখে চওড়া হাসি। তবে একটা প্রতিক্রিয়ায় সব দর্শক এসে মিলে গেলেন এক বিন্দুতে। সবার চোখে-মুখে ছিল তীব্র অবিশ্বাসের ছাপ, এমনও বুঝি ফাইনাল হয়!
ফাইনালে আসলে কী হয়েছে? বদলে যাওয়া মোহামেডানের শেষ বাধা ছিল আবাহনী। বছর তিনেক আগে ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে প্রায় তালা লেগে যাওয়া অবস্থা থেকে মোহামেডান এসেছিল দেশের ফুটবলের কাপ প্রতিযোগিতার ফাইনালে। ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখি হয়ে ওঠার গল্প আপনি বহুবার শুনেছেন। এবার বাংলাদেশের ফুটবল দেখল নিজ চোখে।
ওদিকে আবাহনী বসুন্ধরা কিংসের দাপটে লিগ না জিততে পারলেও কাপ শিরোপা ঘরে তোলে নিয়মিতই। সেই আবাহনী আরও এক কাপ জেতার খুব কাছেই চলে গিয়েছিল। অন্তত রেফারি আলমগীর সরকার যখন প্রথমার্ধের বাঁশিটা বাজালেন, তখন তো মনে হচ্ছিল তাই! শুরুতে ফয়সাল আহমেদ ফাহিম আর বিরতির একটু আগে দানিয়েল কলিনদ্রেস করলেন গোল। দুটোতেই যেভাবে ছত্রখান হয়ে গেছে সাদা-কালোদের রক্ষণ, তাতে মনে হচ্ছিল বড় ব্যবধানে হার বুঝি সময়ের ব্যাপার মাত্র!
তবে এ মোহামেডান যে কোচ আলফাজ আহমেদের মোহামেডান! খেলোয়াড়ি জীবনে বহুবার মোহামেডানকে জয় এনে দিয়েছেন। ডার্বিতে প্রথমবার যখন জয় এনে দিয়েছিলেন, তখন অমন বড় কিছু এই ডার্বি, তা জানতেন না। এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, পরের দিন পত্রিকার পাতা দেখে নাকি ঠাহর হয়েছিল, কত বড় কাজটা করে ফেলেছেন। তবে কোচ হয়ে এসে এখন এই ডার্বির ঝাঁজটা তার অজানা নয়। জানতেন ম্যাচটা ঘুরিয়ে ফেলাটা তো মুহূর্তেরই ব্যাপার! শিষ্যদের তাই তিনি জানালেন, হতোদ্যম হওয়ার তো কিছুই হয়নি, মাথা ঠান্ডা রাখলেই কেল্লাফতে। তিনটা পরিবর্তন আনলেন, কৌশলে আনলেন বদল। তার হাতে ছিল সুলেমান দিয়াবাতে নামের তুরুপের তাস। তিন বদলের পর সেই তুরুপের তাসটাও কাজে লেগে গেল একেবারে।
৫৬ মিনিটে এক গোল শোধ, ৬১ মিনিটে সমতা। দুটো গোলই করলেন ‘ক্যাপ্টেন সুলে’। তবে রোমাঞ্চের শেষ হয়নি তখনও। কোচ মারিও লেমোসের ভাষায়, তার দল ঘুমিয়েই পড়েছিল বিরতির পর। সেই আবাহনী জাগল দ্বিতীয় গোলটা হজম করে। ৬৫ মিনিটে এমেকা অগবাহ করলেন গোলটা। তবে যে দলে দিয়াবাতে আছেন, সে দলের ভাবনা কোথায়? সেই দিয়াবাতেই ৮৩ মিনিটে শোধ করলেন গোলটা। ৪৩ বছর পর ফেড কাপের ফাইনাল দেখল হ্যাটট্রিক, ম্যাচটা গড়াল অতিরিক্ত সময়ে।
মোহামেডানের পক্ষেই ছিল মোমেন্টামটা। সেটা কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের অন্তিম সময়ে গোল পেয়েই যাচ্ছিল তারা। পেল না আবাহনী গোলরক্ষক শহীদুল ইসলাম সোহেলের কারণে, ফাউলই করে বসলেন দিয়াবাতেকে। পেনাল্টি থেকে অবশ্য গোলটা ঠিকই পেলেন তিনি। ফাইনালের ১০৫ মিনিট শেষে অবশেষে মোহামেডান পায় লিডের দেখা, পুরো ম্যাচটা যে হয় পিছিয়ে না হয় সমতায় থেকেই কাটিয়েছিল এর আগ পর্যন্ত।
তবে ম্যাচে প্রথমবার পিছিয়ে পড়ে আবাহনীও আশা ছাড়েনি। জান-প্রাণ দিয়ে চলছিল তাদের গোল শোধের চেষ্টা। সেখানে সফলতা মিলল তখন, যখন ম্যাচটা শেষ বাঁশি থেকে ছিল ৫ মিনিটের দূরত্বে। রহমত মিয়া মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন আগেই, কিন্তু মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়েই তিনি খেলে যাচ্ছিলেন ম্যাচ। ১১৬ মিনিটের সমতাসূচক গোলটাও এলো তারই পা থেকে! প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে তার আগুনে শটটা মোহামেডান জালে জড়াতেই আবাহনী গ্যালারি জেগে উঠল যেন। ম্যাচটা গড়াল টাইব্রেকারে।
পুরো ম্যাচে এত এত নাটক হয়েছে, টাইব্রেকারেও যে হবে, এ নিয়ে কারও কোনো সন্দেহই ছিল না। হয়েছেও বৈকি! না হয় কি আর আহসান হাবিব বিপু হন মোহামেডানের মহানায়ক? আবাহনী অধিনায়ক রাফায়েল আগুস্তো চোট নিয়েই খেলেছেন ফাইনালে, আরেকটু হলে দলকে পাইয়েই দিচ্ছিলেন ট্রফিটা; পেনাল্টি শ্যুট আউটে তার শটটাই ঠেকিয়ে দিলেন বিপু। সেখানে শেষ নয়, এরপর বিশ্বকাপে খেলা দানিয়েল কলিনদ্রেসকেও ঠেকিয়েছেন একই ভঙ্গিতে! আবাহনী গোলরক্ষক সোহেলও ঠেকিয়েছিলেন শাহরিয়ার ইমনের শট। টাইব্রেকারেও যে রোমাঞ্চটা এলো, তা তো এই সেভের কারণেই! সব নাটকের শেষ হলো কামরুল ইসলামের শটে। ডেভিডের গোলিয়াথ বধ বলতে পারেন, কিংবা বলতে পারেন ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখি হয়ে ওঠার গল্প- সব লিখে ১৪ বছর পর মোহামেডান জেতে ফেড কাপের শিরোপা। সব নাটকীয়তা শেষ হলেও রোমাঞ্চের রেশটা যে থেকে গিয়েছিল দর্শকদের মনে, তা ওই ম্যাচের শেষেই বোঝা গিয়েছিল।
দেশের ফুটবলে কান পাতলেই শোনা যায় এই নেই, সেই নেই; দেশের ফুটবল মানেই যেন নেইয়ের হাহাকার। সেই নেইয়ের সময়ে এসে এমন দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর ফাইনাল, ছুটির দিন না হয়েও তাতে দর্শকদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, আর এমন রোমাঞ্চকর ফাইনাল- সব কিছু মিলিয়ে সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনটা হয়ে গেল দেশের ফুটবলের। বাংলাদেশের ফুটবলের দিন যে একেবারেই ফুরিয়ে যায়নি, তার জানান দিয়ে গেল ফেড কাপের এই ফাইনাল। মোহামেডান জিতলেও লাভটা আখেরে দেশের ফুটবলেরই হলো বৈকি!