প্রবা ডেস্ক
প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৩:৫১ পিএম
আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৪:০৪ পিএম
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে বাংলার মেয়েদের উল্লাস।
ষষ্ঠ সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে ৩ সেপ্টেম্বর নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে পৌঁছায় বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল।
দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের সবচেয়ে বড় এই ফুটবল টুর্নামেন্টটি শুরু হয় ৬ সেপ্টেম্বর ।
এই আসরে এবার অংশ নেয় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলংকা।
সাত জাতির এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ খেলেছে ‘এ’ গ্রুপে। এই গ্রুপে ছিল ভারত, পাকিস্তান ও মালদ্বীপ। ‘বি’ গ্রুপের তিন দল হলো- নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা।
৭ সেপ্টেম্বর নেপালের কাঠমান্ডুতে নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ‘এ’ গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচে এবং নিজেদের প্রথম ম্যাচে মালদ্বীপের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। এই ম্যাচে সাবিনা-মারিয়ারা ৩-০ গোলে হারায় মালদ্বীপের মেয়েদের। তিনটি গোলই হয় প্রথমার্ধে। এই ম্যাচে জোড়া গোল করেন অধিনায়ক সাবিনা খাতুন।
অন্য গোলটি আসে মাসুরা পারভীনের পা থেকে। মেয়েরা ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল আক্রমণাত্মক। গোলের সুযোগও আসে।
তবে স্কোর লাইনে গোল বসাতে বাংলাদেশের মেয়েদের অপেক্ষা করতে হয় ৩২ মিনিট পর্যন্ত। ডি বক্সের বাইরে থেকে শট নিয়ে গোল করেন সাবিনা খাতুন। ২ মিনিট পর আবার গোল। এবার গোলদাতা মাসুরা পারভীন। অধিনায়ক সাবিনা খাতুন নিজের দ্বিতীয় গোল করেন ৪০ মিনিটে।
মালদ্বীপের বিপক্ষে এই জয়ের ফলে ‘এ’ গ্রুপে বাংলাদেশ ও ভারত পয়েন্ট টেবিলে যৌথভাবে শীর্ষে উঠে আসে।
সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে ১০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। এই ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৬-০ গোলে জয় পায় বাংলাদেশের মেয়েরা। ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন অধিনায়ক সাবিনা খাতুন।
দুই জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে এসময় পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে উঠে আসে বাংলাদেশের মেয়েরা।
মালদ্বীপের ম্যাচে জোড়া গোল করা অধিনায়ক সাবিনা এদিন হ্যাটট্রিক করেন। প্রথমার্ধে বাংলাদেশ সাবিনার জোড়া গোলে ৪-০ গোলের লিডে ছিল। দ্বিতীয়ার্ধের ১৩ মিনিটে সাবিনা নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন। ডান প্রান্ত থেকে করা ক্রসে সাবিনা লাফিয়ে হেডের মাধ্যমে নিজের হ্যাটট্রিক ও দলের হয়ে পঞ্চম গোল করেন।
৬ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে ঋতুপর্ণা চাকমা জোরালো শটে গোল করলে বাংলাদেশের ৬-০ গোলের জয় নিশ্চিত হয়।
ম্যাচের তিন মিনিটেই বাংলাদেশকে লিড এনে দিয়েছিলেন মনিকা চাকমা। এক গোলে পিছিয়ে পড়ে পাকিস্তান খেলায় ফেরার চেষ্টা করে। পরবর্তী ২৫ মিনিটে নিজেরা গোল করতে সক্ষম না হলেও বাংলাদেশকে আর ব্যবধান বাড়াতে দেয়নি তারা। ২৯ মিনিটে বাংলাদেশকে আর রুখতে পারেনি পাকিস্তান।
সিরাত জাহান স্বপ্না দারুণভাবে বক্সের মধ্যে শট নিয়ে গোল করেন। স্বপ্নার এই গোলের পর বাংলাদেশ আরও চেপে ধরে পাকিস্তানকে। বাংলাদেশের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন পরের দশ মিনিটের মধ্যে জোড়া গোল করেন। দুটি গোলই তিনি বুদ্ধিদীপ্ততার সঙ্গে করেছেন।
একই দিনে দ্বিতীয় ম্যাচে ভারত মালদ্বীপকে হারালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সেমিফাইনাল নিশ্চিত হয়।
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মাঠে নামে ভারত। নিয়ম রক্ষার এই ম্যাচে এলেমেলো ফুটবল খেলে বাংলাদেশের কাছে ০-৩ হারে ভারত। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসে ভারতের নারী দলের প্রথম হার।
প্রথমার্ধেই ০-২ পিছিয়ে পড়ে ভারত। ম্যাচের মাত্র ১২ মিনিটে বাংলাদেশের প্রথম গোল করেন জাহান স্বপ্না। ১০ মিনিটের ব্যবধানে বাংলাদেশকে ২-০ এগিয়ে দেন শ্রীমতি সরকার। দ্বিতীয়ার্ধেও ম্যাচে ফিরতে পারেনি ভারত। বরং দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই জোড়া গোল এবং বাংলাদেশের স্কোর লাইন ৩-০ করেন জাহান স্বপ্না।
ম্যাচে ফেরার বহু সুযোগ পেয়েছিল ভারত। বরং ম্যাচে এগিয়ে যেতে পারত ভারতের মেয়েরাই। ম্যাচের ১৯ মিনিটে ২২ গজ দূরে ফ্রি-কিক পায় ভারত। সে সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয় তারা।
জয়ের ধারা অব্যাহত রেখে সেমিফাইনালে ভুটানকে আট গোলে উড়িয়ে দেয় বাংলাদেশ। সিরাত জাহান স্বপ্নার শটে ১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডেই গোলের দেখা পেয়ে যায় বাংলাদেশ।
ফাইনালে ওঠার এই ম্যাচে হ্যাটট্রিক উপহার দেন অধিনায়ক সাবিনা খাতুন। গোলের খাতা থেকে বাদ পড়েননি কৃষ্ণা-ঋতুপর্ণারাও। নেপালের কাঠমান্ডুর দশরথ স্টেডিয়ামে ১৬ সেপ্টেম্বর মেয়েদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম সেমিফাইনালে ৮-০ গোলে জিতেছে বাংলাদেশ।
দুই অর্ধে চারটি করে গোল করে বাংলাদেশ। সাবিনা করেন তিন গোল। স্বপ্না, কৃষ্ণা রানী সরকার, ঋতুপর্ণা চাকমা, মাসুরা পারভীন ও তহুরা খাতুনও একটি করে গোল করেছেন।
এই জয়ে দ্বিতীয়বারের মতো সাফের ফাইনালে উঠে বাংলাদেশ। এর আগে ২০১৬ সালে ভারতের শিলিগুড়ির আসরে প্রথম ফাইনাল খেলেছিলেন সাবিনারা।
প্রথম সেকেন্ড থেকে গোলের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার হুঙ্কার আগেই দিয়েছিল বাংলাদেশ। ম্যাচ শুরু হতেই ১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে মনিকা চাকমার থ্রু পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গোলরক্ষককে কাটিয়ে নিখুঁত শটে লক্ষ্যভেদ করেন সিরাত জাহান স্বপ্না। খানিকটা ইনজুরি নিয়ে খেলা স্বপ্নাকে ম্যাচের ১২ মিনিটে মাঠ থেকে উঠে যেতে হয়।
স্বপ্না বেরিয়ে যাওয়ার ছয় মিনিট পর বাংলাদেশ ব্যবধান দ্বিগুণ করে। এবার গোলদাতা অধিনায়ক সাবিনা।
মিডফিল্ড থেকে বল পেয়ে ডান প্রান্ত দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন। গোলরক্ষককে একা পেয়ে কোনাকুনি শটে গোল করেন।
৩০ মিনিটে ফরোয়ার্ড কৃষ্ণা রানী সরকার হেডে গোল করে স্কোরলাইন ৩-০ করেন। বাম প্রান্ত থেকে করা ক্রসে বক্সের মধ্যে আনমার্কড থাকা কৃষ্ণার হেডে গোল করতে কোনো সমস্যাই হয়নি। পাঁচ মিনিট পর ব্যবধান আরও বাড়ান বদলি ফুটবলার ঋতুপর্ণা চাকমা। ৪-০ গোলের লিড নিয়ে বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। বিরতির নয় মিনিট পর অধিনায়ক সাবিনা খাতুন নিজের দ্বিতীয় গোল করেন। সংঘবদ্ধ আক্রমণে বক্সের মধ্যে ফাঁকা জায়গায় বল নিয়ে ঠান্ডা মাথায় প্লেসিং করেন এই ফরোয়ার্ড। তিন মিনিট পর বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া সাবিনার ফ্রি কিক গোলরক্ষকের হাত থেকে ফসকে গেলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মাসুরা পারভীন টোকা দিয়ে বল জালে পাঠান।
শেষ সময়ে তহুরা খাতুন ব্যবধানটা ৭-০ করেন। এরপর একেবারে শেষ মুহূর্তে গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন সাবিনা। তাতে বাংলাদেশ ৮-০ গোলের বিশাল জয় নিয়েই ফাইনাল নিশ্চিত করে ফেলে।
কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে মেয়েদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে গত সোমবার বিকাল সোয়া ৫টায় স্বাগতিক নেপালের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। ২-০ গোলে এগিয়ে বিরতিতে যায় সাবিনারা। দ্বিতীয়ার্ধে নেমে লিডে ফেরার প্রাণান্তকর চেষ্টা করে নেপাল। তবে কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা মিলছিল না। ৫১ মিনিটে রাশমি কুমারি ঘিসিং সহজ সুযোগ পেলেও কাজে লাগাতে পারেননি। বাম কর্নার থেকে আসা বলে মাথা ছোঁয়ালেও বল গোলপোস্টের দেখা পায়নি।
এরপর ৫৫ মিনিটে সুযোগ পায় বাংলাদেশ। কিন্তু কাজে লাগাতে পারেনি।
পুরো টুর্নামেন্টে রূপনা চাকমা দারুণ খেলেছেন। নেপালের কয়েকটি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দেন তিনি।
বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে ব্যথা পাওয়ার পরও যেভাবে দৃঢ়তার সঙ্গে গোলবার সামলেছেন তা আলাদা করে প্রশংসার দাবি রাখে।
ম্যাচজুড়ে গোলপোস্ট সামলে রাখলেও ৬৯ মিনিটে তার হাত ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশের জালে বল জড়ায় নেপাল। অবশ্য এর কয়েক মিনিট পরেই নিজের দ্বিতীয় গোল করেন কৃষ্ণা রানী সরকার। বাংলাদেশ এগিয়ে যায় ৩-১ গোলে। এই ফল নিয়েই শেষ হয় ম্যাচ।
ম্যাচের শুরুতে মাত্র ১৩ মিনিটে শামসুন্নাহারের দুর্দান্ত গোলে লিড নেয় বাংলাদেশ। এরপর লড়াইয়ে ফেরার চেষ্টা করে নেপাল। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ হলেও এগিয়ে ছিল বাংলাদেশের মেয়েরাই। তবে ম্যাচের ২৫ মিনিটের পর নেপাল চাপে ফেলে টাইগ্রেসদের। কিন্তু সুবিধা করতে পারেনি তারা। ম্যাচের ৪১ মিনিটে শ্রীমতী কৃষ্ণা রানী সরকার করেন দলের দ্বিতীয় গোল।
সাবিনারা প্রথমার্ধের খেলা শেষ করেন ২-০ গোলে এগিয়ে থেকে।
অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড সিরাত জাহান স্বপ্নাকে নামানো হবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা ছিল। শঙ্কা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে নামানো হয় প্রথম একাদশে। কিন্তু কাদায় পড়ে ১০ মিনিটের মাথায় আবার ব্যথা পান। এরপর তাকে তুলে নেওয়া হয়। মাঠে নামানো হয় শামসুন্নাহার জুনিয়রকে। দলের প্রথম সাফল্য আসে তার পা থেকেই।
নারী ফুটবল দলের প্রধান কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন সেমিফাইনালের একাদশ অপরিবর্তিত রেখেই ফাইনালের দল সাজান।
যথারীতি গোলপোস্টে রূপনা চাকমা। তার সামনে চার ডিফেন্ডার আঁখি খাতুন, শিউলি আজিম, শামসুন্নাহার ও মাসুরা পারভীন। মাঝ মাঠে মনিকা চাকমা ও মারিয়া মান্ডা। আক্রমণভাগে সাবিনা খাতুন, সানজিদা আক্তার, কৃষ্ণা রানী সরকার ও সিরাত জাহান স্বপ্না।
টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই দুর্দান্ত ফর্মে ছিল বাংলার মেয়েরা। চার ম্যাচ থেকে আদায় করে নিয়েছে ২০ গোল। বিপরীতে কোনো গোলই হজম করেনি সাবিনা, স্বপ্না, কৃষ্ণারা।
সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবারের মতো নতুন চ্যাম্পিয়ন পেল টুর্নামেন্টটি। চলতি আসর নিয়ে ষষ্ঠবারের মতো মাঠে গড়ায় এ টুর্নামেন্ট। আগের পাঁচবার শিরোপার মালা গলায় পরেছিল ভারতের নারীরা।
এবার ছিটকে পড়ে ভারত। আগের পাঁচ আসরের মধ্যে চারবার রানার্স আপ হয়েছিল নেপাল। অন্য একবার রানার্স আপ হয়ে থেমেছিল বাংলাদেশ। ভারতের পর জয়ের মালা উঠল সাবিনাদের গলায়।
প্রবা/জিজি/ এসআর