নজরুল ইসলাম
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৩ ১৯:৩৮ পিএম
আপডেট : ০২ মে ২০২৩ ০০:০৯ এএম
ইমরুল কায়েসের পাশে ব্যাট-ডক্টর হুসাইন মোহাম্মদ আফতাব শাহিন
আপনি অসুস্থ হলে কী করবেন? চিকিৎসকের দ্বারস্থ হবেন। অসুস্থতা গুরুতর হলে যাবেন ভালো কোনো হাসপাতালে। যখন হাতের ব্যাটের ‘শরীর’ খারাপ করে! মানে ব্যাটারের হাতের ব্যাট যখন কথা শুনে না। দেখায় কোনো সমস্যা। আসে না রান। তখনও আপনি ব্যাট নিয়ে যেতে পারবেন চিকিৎসকের কাছে। ‘ব্যাটের চিকিৎসক’- এ-ও কি সম্ভব? অসম্ভব মনে হলেও ব্যাপারটা মোটেই অবাস্তব বা অলীক কিছু নয়!
আরও পড়ুন : পিএসজির দুঃস্বপ্নের হার, বায়ার্ন-লিভারপুলের জয়
বাংলাদেশের রাজশাহীতে বসে আছেন বিখ্যাত একজন ব্যাটের চিকিৎসক- তিনি হুসাইন মোহাম্মদ আফতাব শাহিন। ব্যাটের রোগের যম যিনি। যেকোনো ব্যাটের যেকোনো সমস্যা ঠিক করতে সিদ্ধহস্ত তিনি। এ কারণে তার উপাধি হয়ে গেছে ‘ব্যাট-ডক্টর’। নতুন ব্যাট তৈরিতেও বেশ দক্ষ শাহিন।
শাহিনের কাছে বিশ্বের নামি-দামি তারকা ক্রিকেটাররাও প্রায়ই দ্বারস্থ হন। অবশ্য ব্যাটের সমস্যা নিয়ে। তার ক্লায়েন্টের নাম শুনলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। এক সময় শচীন টেন্ডুলকার, কুমার সাঙ্গাকারা, আজহার মাহমুদ, ডোয়াইন ব্রাভো, শহিদ আফ্রিদির মতো ক্রিকেটাররা তার কাছ থেকে ব্যাট সারিয়ে নিয়েছেন। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার প্রথমসারির ক্রিকেটাররাই মূলত শাহিনের ক্লায়েন্ট। হাল আমলের আন্দ্রে রাসেল, সিকান্দার রাজা, সূর্যকুমার যাদবদের ব্যাটও পেয়েছে শাহিনের হাতের ছোঁয়া। সম্প্রতি ‘ব্যাট-ডক্টর’ মেরামত করেছেন ভারতের বর্তমান ও সাবেক দুই অধিনায়ক বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মার ব্যাট। ঘরের মাঠের ওয়ানডে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে শাহিনের কাছ থেকে ব্যাট রিপেয়ার করিয়ে নিয়েছেন দুজনে। অক্টোবরে ভারতের মাটিতে বসতে যাওয়া বিশ্বকাপে সেই ব্যাট হাতে তাণ্ডবলীলা চালানোর অপেক্ষায় এখন রোহিত-কোহলি।
বাংলাদেশ সফরে এসে ব্যাটে কোনো সমস্যা দেখা দিলে বিদেশি ক্রিকেটাররা দ্বারস্থ হন বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের। তারা জানতে চান- কে পারবে ব্যাটের সমস্যা ঠিক করতে? তখন তারা দিয়ে দেন শাহিনের ঠিকানা। ব্যস- এতটুকুই। বিদেশি ক্রিকেট বোর্ড যোগাযোগ করে শাহিনের সঙ্গে। তার হাতে ব্যাট তুলে দেয় ভুক্তভোগী ব্যাটারের ক্রিকেট সংস্থা। তার কাছেই মেলে সব সমস্যার সমাধান। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্টার ক্রিকেটারদের ব্যাটের রোগ সারিয়েছেন শাহিন। তবে বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মাদের মতো সুপারস্টারদের ব্যাট কখনও নিজে তৈরি করেননি। ব্যাট সারানোই তার আসল কাজ। শুধু বিদেশি নয়- সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবালদের মতো বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটারদের ব্যাটও প্রায় রিপেয়ার করে দেন শাহিন।
বিদেশি ক্রিকেট সুপারস্টারদের ব্যাটের রোগ সারানো নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে শাহিন বলেন, ‘বাংলাদেশ সফরে এসে বিদেশি ক্রিকেটারদের ব্যাটে ক্র্যাক দেখা দিলে তারা জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দেশের ক্রিকেটাররা আমার কথা জানিয়ে দেন। ব্যাটারের সংশ্লিষ্ট ক্রিকেট বোর্ড তখন ব্যাট আমার কাছে পাঠিয়ে দেয়। আমি সেই ব্যাটের সমস্যার সমাধান করে দিই।’
একটি কোম্পানি তৈরি করলেও সব ব্যাট একরকম হয় না। একটি ব্যাট অন্য ব্যাট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ব্যাটের ওজন, হাতলের মাপে থাকে ভিন্নতা। থাকে ভিন্ন ভিন্ন বিশেষত্ব। তাই তারকা ক্রিকেটারদের ব্যাট মেরামত বা তৈরিতে নিতে হয় বাড়তি যত্ন। আর খুঁত ধরতে সিদ্ধহস্ত রোহিত-কোহলি পছন্দ না হলে ব্যাটই ফিরিয়ে দিতে দ্বিতীয়বার ভাবেন না। অন্যথায় পাঠিয়ে দেন শাহিনের কাছে। ক্রিকেটাররা ঠিক যেভাবে চান, শাহিন ঠিক সেভাবেই মেরামত করে দেন। অসাধারণ দক্ষতায় ব্যাটের ওজন, ব্লেডের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতায় সমন্বয় এনে দেন এ ব্যাটবিশেষজ্ঞ।
ব্যাট নিয়ে কাজ করা এখন শাহিনের প্যাসন। তিনি বলেন, ‘২৪ বছর ধরে ব্যাট নিয়ে কাজ করছি। শুরুতে ব্যাটের মোডিফিকেশন ও কাস্টমাইজেশন করা ছিল আমার নেশা। এটাই এখন আমার পেশা। সব সময় চেষ্টা থাকে আগের চেয়ে আরও ভালো এবং নিখুঁত ব্যাট তৈরি করার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাররা আমার ওপর ভরসা রাখেন। এটাই আমার অর্জন।’
ক্রিকেটের প্রতি টান, আকর্ষণ আর ভালোবাসা ছিল সব সময়। তাই তো পড়াশোনা শেষ করে ব্যাট তৈরির ওপর কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন শাহিন। কাজ করতে করতে হয়ে উঠেছেন দক্ষ শিল্পী। ইংল্যান্ড থেকে উইলো কাঠ এনে এখন ঘরে বসে তৈরি করেন ক্রিকেট ব্যাট। এখন নিজেই খুলতে যাচ্ছেন কোম্পানি। এ মিশনে তার সঙ্গে রয়েছেন দুই তারকা ক্রিকেটার মেহেদি হাসান মিরাজ ও ইমরুল কায়েস। তিনজনে মিলে রাজশাহীতে গড়ে তুলছেন ‘এমকেএস স্পোর্টস’ নামের ব্যাট তৈরির কারখানা। নতুন দিগন্তে পা রাখা নিয়ে শাহিন বলেন, ‘রাজশাহীতে আমরা ব্যাট তৈরির কারখানা করছি। আশা করছি আগামী মাসেই এটা চালু হবে।’