প্রতিদিনের বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২২ ২৩:৩৪ পিএম
আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২২ ২৩:৩৯ পিএম
সমুদ্রে অসুস্থ হয়ে পড়লে নুরুল হাসানকে শুশ্রুষা দিচ্ছেন সতীর্থ মেহেদী হাসান মিরাজ। ছবি- সংগৃহীত
কেউ বমি করছেন, কেউবা পড়ে আছেন ফ্লোরে। এ যেনো এক হাসপাতাল। বাংলাদেশ ক্রিকেটার দলের অধিকাংশ খেলোয়াড় অসুস্থ হয়ে পড়লেন। একসঙ্গে দলের এত ক্রিকেটারকে এর আগে কোনো বিদেশ যাত্রায় এভাবে অসুস্থ হতে দেখা যায়নি। আটলান্টিক মহাসাগরে এবার তারা ভয়াবহ এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।
সেন্ট লুসিয়া থেকে মার্টিনেক হয়ে ডমিনিকা। ভয়ংকর এক সমুদ্রযাত্রা শেষে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দুপুরে ডমিনিকায় গিয়ে পৌঁছান বাংলাদেশ দল। আজ ডমিনিকার উইন্ডসর পার্কে টি–টোয়েন্টি সিরিজ শুরু হচ্ছে। বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টায় স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখোমুখি হবে টাইগাররা। কিন্তু ম্যাচ শুরুর আগে ক্রিকেটাররা ভয়ংকর সমুদ্রযাত্রার ধকল কাটিয়ে উঠতে পারে কি না, সেটাই এখন চিন্তার বিষয়।
সূর্যের আলো ক্যারিবিয়ানে পৌঁছানোর আগেই সেন্ট লুসিয়ার ক্যাস্ট্রিস ফেরিঘাটে পৌঁছান টাইগাররা। নতুন এক অভিজ্ঞতার হাতছানি, প্রথমবারের মতো এক দেশে থেকে আরেক দেশে যেতে হচ্ছে ফেরিতে। সকাল ৭টায় মার্টিনেকের উদ্দেশে রওনা দেয় পার্লে এক্সপ্রেসের ফেরি। সেন্ট লুসিয়া থেকে মার্টিনেক হয়ে ডমিনিকা, এরপর আরো কয়েকটি দ্বীপ—এই পথে নিয়মিতিই যাতায়াত করে এই ফেরি।
এই ফেরিতে চড়েই সেন্ট লুসিয়া থেকে ডমিনিকা গেছে বাংলাদেশ দল। ছবি- সংগৃহীত যাত্রার শুরুতে হালকা মেজাজেই ছিলেন ক্রিকেটাররা। নিজেদের মধ্যে খোশগল্প, আড্ডা, ছবি তোলা চলছিলো; বলা যায় সবাই মিলেই উপভোগই করছিলেন ফেরি যাত্রা। তবে সমুদ্রযাত্রা নিয়ে ভয় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের আগে থেকেই ছিল। কারোরই যে অভিজ্ঞতা ছিল না দীর্ঘ পাঁচ ঘন্টা সমুদ্র পাড়ি দেয়ার। তার ওপর দুই দিন আগের সাইক্লোনের কারণে সমুদ্রে ঢেউয়ের তোড়ও বেশি ছিল। আধ ঘন্টা পার হতে না হতেই পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। সেন্ট লুসিয়া থেকে বের হয়ে ফেরি যখন মাঝ সমুদ্রে নামল তখনই শুরু হয় ঢেউ। ফেরি বেশি বড় ছিল না, ৬–৭ ফুট উচ্চতার ঢেউয়েই উথাল–পাথাল অবস্থা। বিশেষ করে ডলফিন চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার সময় ঢেউটা বেশি অনুভূত হয়েছে।
ঢেউয়ের ধাক্কায় ফেরির বড় বড় দুলুনিতে এরপরই একে একে ‘মোশন সিকনেসে’ আক্রান্ত হতে শুরু করেন ক্রিকেটারেরা। বলা হয় ভয় নাকি দ্রুত ছড়ায়। ওই ফেরিতে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে ভয় কেবল দ্রুত ছড়ায়নি বরং ভয়ের সাথে দ্রুততম সময়ে অসুস্থ হয়েছেন ক্রিকেটাররা। সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা হয়েছে পেসার শরীফুল ইসলাম, উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান নুরুল হাসান এবং ম্যানেজার নাফিস ইকবালের।
দেড় ঘন্টা যাত্রা শেষে মার্টিনেকে পার্লে এক্সপ্রেস। মার্টিনেকে ৪০ মিনিটের যাত্রা বিরতি দেওয়া হয়। সেখানে কয়েকজন ক্রিকেটার লিজিস্টিক ম্যানেজার নাফিস ইকবালের কাছে ভয় আর শঙ্কা নিয়ে জানিয়ে দেন বাদবাকি পথটুকু তারা আর যাবেন না। অনুরোধ করেন তাদের জন্য ভিসার ব্যবস্থা করে সেখানেই থাকার এবং পরবর্তীতে আকাশপথে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ কয়েকবারই হোয়াটসঅ্যাপে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সংযোগ পাননি।
পরে নাফিস ইকবাল বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি জানান। কিন্তু বাস্তবতা হলো হঠাৎ করে এত স্বল্প সময়ের মধ্যে বিকল্প ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল না। দলের এতজন সদস্যের জন্য একসঙ্গে বিমান টিকেট যেমন পাওয়া সম্ভব নয়, ফ্রেঞ্চ কলোনি মার্টিনেকের ভিসাও তাৎক্ষণিক পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে বাকি পথও ফেরিতেই পাড়ি দিতে হয়েছে ক্রিকেটারদের।
ভাগ্য ভালোই বলতে হবে। অথবা সৃষ্টিকর্তা হয়তো ক্রিকেটারদের আঁকুতি শুনেছেন। পরে সাগর কিছুটা শান্ত হলে ক্রিকেটাররাও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেন অনেকটাই। মার্টিনেকে বিরতির সময় নাফিস ও নুরুল কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠলেও শরীফুল মার্টিনেক থেকে ডমিনিকা আসার পথে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। পলিথিনে মুখ ঢুকিয়ে একাধিকবার বমি করতে দেখা গেছে তাকে। অস্থিরতা কমাতে এক পর্যায়ে তো গায়ের টি–শার্টটাই খুলে ফেলেন তিনি। যাত্রার শুরুতেই বমি করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েন দলের সঙ্গে থাকা ম্যাসিওর সোহেল।
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কারোরই ফেরিতে করে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা আগে ছিল না। ওয়েস্ট ইন্ডিজে এলে অন্য বিদেশী দলগুলোও এভাবে সমুদ্রপথে এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে যায় না। এমনকি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলও এই প্রথম ফেরিতে এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে গেল। সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ে অস্বস্তি দেখা গেছে তাদের মধ্যেও।
সাধারণত দ্বিপক্ষীয় সিরিজে সফর পরিকল্পনা করে স্বাগতিক বোর্ড। সফরকারী বোর্ডের সম্মতিতে সেটি চূড়ান্ত হয়। ক্রিকেটারদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বিসিবির সুযোগ ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের ফেরিযাত্রার প্রস্তাবে রাজী না হয়ে বিমানে ডমিনিকা যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার। সেটি তারা কেন করেনি, সে প্রশ্ন তুলে যাত্রাপথেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ক্রিকেটারদের অনেকেই। এক ক্রিকেটার বলেন, ‘এখানে অসুস্থ হয়ে মরলে তো আমরা মরব, কারো তো কিছু হবে না।’ দলের একজন সিনিয়র ক্রিকেটার বলছিলেন, ‘এত দেশ সফর করলাম, জীবনে এই অভিজ্ঞতা প্রথম। আমরা কেউই এতে অভ্যস্ত নই। এখন যদি ফেরিতেই কেউ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে যায় তাহলে কী হবে, খেলা তো পরের কথা। আমার জীবনের সবচেয়ে বাজে সফর।’
সেন্ট লুসিয়া থেকে ডমিনিকা যাত্রায় সবমিলে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। ভয় নিয়ে পাড় করলেও ভয়ংকর এ যাত্রা শেষ করতে হয়েছে সাহস নিয়েই। সেই সাহসের কেন্দ্রে ছিলেন সাকিব আল হাসান। একমাত্র ক্রিকেটার, ফেরি যাত্রার পুরো সময়ে যিনি স্বাভাবিক ছিলেন। হয়তোবা ভেতরে ভেতরে কিছু হলেও, বাইরে সেটার প্রকাশ ছিলোনা। এনামুল হক, ইবাদত হোসেন আর মোসাদ্দেক হোসেনও মোটামুটি উপভোগই করেছেন যাত্রাটা।