হেলাল নিরব
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৩ ১৮:৫৬ পিএম
আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৩ ১৯:৩২ পিএম
নিজেকে বাঁচানোর জন্য দৌড়াতেন মোহাম্মদ ফারাহ (মো. ফারাহ)। সেই দৌড় তাকে করেছে বিখ্যাত। সোমালিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের হুসেইন আবদি কাহিনের নামের পাশে এখন উচ্চারিত হয় সম্মানসূচক ‘স্যার’ ডাক। অথচ একপাল গরুর রাখাল হয়ে কাটিয়ে দিতে পারতেন জীবন, হতে পারতেন সোমালিয়ার আর দশটা ছেলের মতো। কিন্তু কাহিন কি স্যার মো. ফারাহ হতে পারতেন? তিন যুগের বেশি সময়ের বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়া ফারাহর মনে এখনও আক্ষেপ, যে নাম এত ভারী সেই নামকেই অস্বীকার করে বসলেন কদিন আগে- ‘ভুল পরিচয়ে বড় হয়েছি আমি।’
ভাগ্যের ফেরে বাবা-মাকে ছেড়ে ঝাঁ চকচকে ইংল্যান্ডে আসতে চাননি ফারাহ। এখনও শিকড়ের টানই তাকে দাপিয়ে বেড়ায়। অথচ তার ঝুলিতে আছে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতি, মিলেছে ‘নাইটহুড’ উপাধি। তবে কাহিন থেকে স্যার মো. ফারাহ হওয়ার গল্পটাও বেশ কঠিন। সেই গল্পে আছে ভয়ভীতি, আছে ক্ষুধার জ্বালা কিংবা টিকে থাকার ব্যাকুলতা। মো. ফারাহ শুধু টিকেই থাকেননি; হয়েছেন বিশ্বসেরা, জিতেছেন ইংল্যান্ডের সেরা পুরস্কার। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ৫০০ মুসলিমের তালিকায়ও থাকছেন। ইংল্যান্ডের মতো জায়গায় তিনি আছেন অন্যতম মুসলিম হয়ে। কিন্তু দীর্ঘ সময় এই ফারাহ নিজের কাহিন পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিলেন। সেখানেও ছিল ভয়। ব্রিটিশ নাগরিকত্ব হারানোর ভয়। বিবিসির এক ডকুমেন্টারিতে স্বীকার করেন স্বর্ণজয়ী এই অলিম্পিয়ান। একজন ব্রিটিশও এখন গর্ব করে বলতে বাধ্য, মুসলিম মো. ফারাহ আমার দেশের লোক। অথচ তাকেও কি না খাবারের খোঁটা শুনতে হয়েছে, পরিচয় লুকিয়ে বাঁচতে হয়েছে।
‘নারী আমাকে শাসাতেন, যদি মুখে খাবার পেতে চাও, যদি কখনও নিজের পরিবারকে আবার দেখতে চাও, তাহলে কিছু প্রকাশ করো না’
পাচার চক্রের শিকার হয়ে যে বাড়িতে উঠেছিলেন, সেখানে কতদিন না খেয়েই কাটাতে হয়েছে তাকে। কাঁদতে হয়েছে বাথরুমে মুখ লুকিয়ে। ভয় দাপিয়ে বেড়িয়েছে ফারাহকে। সেই ভয়ে দৌড়েছেন, দৌড়েই হয়েছেন বিশ্বসেরা। অলিম্পিকে ৪টি ও বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে ৬টি সোনা জিতেছেন দূরপাল্লার দৌড়ে, গড়েছেন ইতিহাস।
জীবন বাঁচাতে দৌড়াতেন, সেই দৌড় এনে দিয়েছে খ্যাতি
মুসলিমদের অন্যতম আদর্শের মো. ফারাহকে নিয়ে বছরখানেক আগে তথ্যচিত্র প্রকাশ করে বিবিসি। সেখানেই উঠে এসেছে কিংবদন্তির জীবনের ‘অন্ধকারময় অতীত’। ততদিন পর্যন্ত সবাই জানত বাবা-মায়ের সঙ্গে সোমালিয়া থেকে পালিয়ে ইংল্যান্ডে এসেছিলেন ফারাহ। কিন্তু আসল সত্যিটা হলো পালিয়ে নয়, শিশু পাচারের শিকার হয়ে এসেছিলেন। ‘দ্য রিয়েল মো. ফারাহ’ নামক তথ্যচিত্রে অকপটে জানিয়েছেন ফারাহ। পাচার হওয়ার পথে গৃহস্থালিতে ভৃত্যের কাজ, নিয়োগদাতার পরিবারের শিশুর দেখভালও করতে হয়েছে। মো. ফারাহ বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে এগুলো আড়াল করে রেখেছিলাম। কিন্তু এটা চিরদিন আড়াল করে রাখা যায় না।’
৪০-বর্ষী অ্যাথলেট ছিলেন সোমালিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া সোমালিল্যান্ডের বাসিন্দা। যখন তার বয়স চার বছর, তখন সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান তার বাবা আবদি। মো. ফারাহর বয়স যখন আট কিংবা নয়, তখন পরিবারের সঙ্গে আসেন জিবুতিতে। সেখান থেকেই হন পাচারের শিকার। যে নারী ফারাহকে পাচার করেছিলেন, তিনিই বদলে দিয়েছিলেন নাম। যুক্তরাজ্যে গিয়ে নতুন নামে পরিচিত হওয়ার ‘শিক্ষাও’ দিয়েছিলেন। এরপর নানান চড়াই-উতরাই। এখন বিশ্বসেরা।
ফারাহ স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘নারী আমাকে শাসাতেন, যদি মুখে খাবার পেতে চাও, যদি কখনও নিজের পরিবারকে আবার দেখতে চাও, তাহলে কিছু প্রকাশ করো না।’ ছোট্ট কাহিনের কিচ্ছু করার ছিল না, কাঁদতেন আর অপেক্ষা করতেন সুদিন ফেরার।
সেই সুদিন ফিরেছে। কিচ্ছু না থেকে সবকিছু হয়েছেন মো. ফারাহ। ভয় কাটিয়ে নিজের নামও প্রকাশ করেছেন। বিশ্বজয়ের পথে ছুটে চলে শিকড় থেকে শিখর ছুঁয়েছেন কাহিন ওরফে মো. ফারাহ।