নেয়ামত উল্লাহ
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৩ ১২:০৩ পিএম
আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৩ ১১:৪৩ এএম
এই গেল বছরও টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বাংলাদেশের একটা ওপেনিং জুটির হাপিত্যেশ ছিল বেশ। এশিয়া কাপের কথাই মনে করে দেখুন, দুই ম্যাচে দুটো ভিন্ন জুটি দেখেছিল বাংলাদেশ। এরপর থেকে বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত সব মিলিয়ে তিনটি ভিন্ন জুটি খেলানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটা টেকসই জুটির সন্ধানের। অবশেষে ২০২৩-এ এসে যেন সে অন্ধকার সুড়ঙ্গ শেষে আলোর দেখা পাচ্ছে বাংলাদেশ। লিটন দাস আর রনি তালুকদারের ওপেনিং জুটি যেন আভাস দিচ্ছে তেমনই।
আরও পড়ুন : মাইলফলকের ম্যাচে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বাংলাদেশ
শেষ কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি অ্যাপ্রোচটাই বদলে গেছে। সেটার শুরু হয়েছে দুই ওপেনারের হাত ধরে। লিটন দাস আর রনি তালুকদারের এনে দেওয়া ঝড়ো সূচনার ভিতে দাঁড়িয়েই তো বাংলাদেশ খেলছে তাদের ভয়ডরহীন ব্র্যান্ডের ক্রিকেট।
সবশেষ ম্যাচের কথাই ধরুন, বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের সর্বোচ্চ রানের জুটিটা এসেছে তাদের হাত ধরে। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে দুজন মিলে গড়েছেন ১২৪ রানের জুটি। সেটা করতে আবার সময় নিয়েছেন মোটে ৯.২ ওভার। টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে দ্রুততর সেঞ্চুরি জুটিটাও তাদের দখলে চলে গেছে তাতে।
এই রেকর্ডটা অবশ্য তারা আগের ম্যাচেই করে ফেলতে পারতেন। পাওয়ার প্লেতে দুজন মিলে তুলেন ৮১ রান, ওপেনিং জুটিতে মিলল ৯২। তার ঠিক পরের ম্যাচেই সেঞ্চুরি জুটি! কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশের কোনো ওপেনিং জুটিকে এত ধারাবাহিক কবে দেখেছেন আপনি?
উত্তরটা হবে, কখনোই নয়। ২০০৬-এ টি-টোয়েন্টির প্রথম ম্যাচ থেকে এ পর্যন্ত ১৪৯ ম্যাচে বাংলাদেশ খেলিয়েছে ৩৭টি ভিন্ন ভিন্ন জুটি। তাদের কোনো জুটিরই যে গড় ৫০-এর বেশি ছিল না! দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি ছোঁয়া জুটি তো নেই-ই! এই শৃঙ্ঘে লিটন-রনিই প্রথম।
লিটন আর রনি একসঙ্গে ৫ ইনিংস খেলেছেন। ৩১৯ রান তুলেছেন, ৬৩.৮০ গড়ে। জুটির রানরেটটাও ঈর্ষণীয়, ১০.৬৩! টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের ৩০০ রান তোলা জুটি আছে ৪টি, তাদের কোনো জুটির রানরেটই দুই অঙ্ক ছোঁয়নি কখনও।
লিটনের অভিমত, দুজনের এমন জুটিটা একেবারে সহজাতভাবেই হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘সঙ্গী বদল হয়েছে, এরপর হয়ে গেছে। তার সঙ্গে ব্যাট করে মজা পাচ্ছি। যখন ব্যাটিংয়ে নামি, এক-দুইটা বল খেললে একটা অনুভূতি কাজ করে, তো আমাদের দুইজনেরই বিষয়টা কাজ করছিল যে আমরা মারতে পারব। তো ওটাই আমরা কাজে লাগিয়েছি।’
এমন জুটি গড়ার পরে লিটন বর্তমানেই থাকতে চাইলেন। অতীত নিয়ে প্রশ্নে খানিকটা উষ্মা প্রকাশ করলেন, ‘পেছনের কথা কেন টানেন সব সময়। নতুন যে জিনিস ভালো হচ্ছে, সেটা কী ভালো লাগছে না। দুই বছর, এক বছর... অতীত টানার তো কোনো দরকার নেই।’
তবে দলের ওপেনিংয়ে অতীতটা এত তেতো ছিল বলেই তো বর্তমানটা এত মধুর ঠেকছে! বেশিদূর যেতে হবে না, নিকট অতীতের কথাই ভাবুন; শেষ ১২ মাসেই তো বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি জুটি বদলেছে ১১ বার। রনি-লিটনের আগে শেষ এক বছরে টানা পাঁচ ম্যাচে একসঙ্গে ওপেনও করেনি কোনো জুটি, পরিবর্তন করতে হয়েছে তার আগেই।
সেখানে লিটন-রনির জুটিটা দাঁড়িয়ে গেছে। শুরু থেকেই আক্রমণ চলছে দুই প্রান্ত থেকে। লিটনের ব্যাট ছোটা শুরু করলে রনিও বসে থাকছেন না! তারই ফল শুরুর এমন বিধ্বংসী জুটি, যা বাংলাদেশকে দিচ্ছে বাড়তি নির্ভরতা। তাতেই আভাস মিলছে দীর্ঘদিনের ওপেনিং জুটির যে খোঁজ, তার ইতি টানার।
তবে লিটন জানেন, এতে চড়াই উতরাই আসবেই। সে কারণেই তিনি বলছেন, ‘ব্যাক টু ব্যাক প্রতিটা ম্যাচেও আপনি এ সাফল্য পাবেন না যে, যাব আর হিট করব। আপনি প্রতিদিনই গিয়ে টি-টোয়েন্টিতে পাওয়ার প্লেতে ৭০-৮০ করতে পারবেন না। স্ট্রাগল টাইম আসবেই।’
সেই ‘স্ট্রাগল’টা লিটন একা করেছেন অনেক দিন, সেটা সেরে উঠেও এসেছেন। রনি নিজেও তো বড় সংগ্রামের পরই সুযোগ পেয়েছেন দলে। ৮ বছর পর দলে সুযোগ পেয়েই এখন ফল এনে দিচ্ছেন দলকে। জুটির স্ট্রাগলের সময় যে সে অভিজ্ঞতাগুলো কাজে দেবে তাদের, তা আর বলতে। আর সে কারণেই এই জুটিতে আভাস মিলছে লম্বা রেসের ঘোড়া হওয়ার। সেটা হয়ে গেলে যে সুড়ঙ্গের শেষের ঝলমলে আলোর দেখাও পেয়ে যায় বাংলাদেশ!