কলাম
ইয়াসেফ ইমরোজ ইফাজ
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৩ ১৬:৩০ পিএম
আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৩ ১৬:৩২ পিএম
ইয়াসেফ ইমরোজ ইফাজ
বেশিদিন আগের কথা নয়। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ ছিল সেটা। আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট খেলছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে সেটা ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের প্রথম টেস্ট। জানা কথা বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের শক্তির দিকটা হলো স্পিন। সেই যুক্তিতেই বাংলাদেশ এই ম্যাচের কৌশল ঠিক করল। একাদশে কোনো পেসার রাখা হলো না! পুরো স্পিন আক্রমণ দিয়ে বোলিং সাজানো হলো। পেস বোলিং কিছুটা করতে পারেন এমন মাত্র একজনই ছিলেন দলে- সৌম্য সরকার। তবে দলে তার ভূমিকা তো আর বোলার হিসেবে নয়, টপঅর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবেই একাদশে তিনি।
সেই ম্যাচের পরের কাহিনি নিশ্চয়ই জানা আছে আপনাদের। আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেই। বৃষ্টি বাধায় ম্যাচের অনেক সময় নষ্ট হলেও পুরোদস্তুর স্পিন ট্র্যাকে বাংলাদেশ সেই ম্যাচ হেরে যায়। নিয়মিত কোনো পেসার ছাড়া টেস্ট ম্যাচের একাদশ গঠনের বিদঘুটে সেই কৌশল কোনো কাজে লাগেনি সেদিন।
আরও পড়ুন : দুপুর থেকে অনলাইনে মিলবে টি-টোয়েন্টির টিকিট
পেস বোলাররা ক্রিকেটের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্যাট-বলের লড়াইয়ে সেরাদের তালিকা করলে সেখানে বড় অংশে পেসারদের নাম পাবেন। ম্যালকম মার্শাল, মাইকেল হোল্ডিং, জেফ থম্পসন, জোয়েল গার্নার, অ্যালান ডোনাল্ড, ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস, ইমরান খান, শোয়েব আকতার, ব্রেট লি, গ্লেন ম্যাকগ্রা- তালিকা করতে গেলে এমন অনেক দৈর্ঘ্য-প্রস্থে পেসারদের নামও বাড়তে থাকবে।
বডিলাইন সিরিজ সম্পর্কে জানেন নিশ্চয়ই। পাকিস্তানি গ্রেটদের রিভার্স সুইং আবিষ্কারের কথাও শুনেছেন, ব্যাটারদের হাড় ভাঙার গল্প- পেসাররা কতটা মারাত্মক এসব কিছু আপনাকে বোঝাবে।
বলা হয়ে থাকে পেস বোলারদের রুদ্রমূর্তি দেখে শুরুর দিকের ব্যাটাররা ক্রিজে এসে পেটে যেন প্রজাপতির নাচন দেখেন- এমন পেস আক্রমণ দিয়েই দল সাজাতে হবে! সত্তর ও আশির দশকে ম্যাচ জেতার জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ককে বেশি কাজ করতে হতো না। শুধু নতুন বলটা তার পেস বোলারদের দিকে বাড়িয়ে দিতে হতো। ম্যাচ জেতার বাকি কাজ পেসাররাই সেরে ফেলতেন।
বাংলাদেশের বোলারদের যে গতি তাতে ফাস্ট শব্দটা ব্যবহার না করে পেস বলাটাই যুক্তিযুক্ত। বোলিং গতি প্রতি কিলোমিটারে ১৫০ হলো তাকে ফাস্ট বোলার বলার ব্র্যাকেটে ফেলা যায়। বাংলাদেশে পেস বোলাররা বছরের পর বছর অবহেলিত। ফ্ল্যাট এবং লো বাউন্সের পিচে নিজেদের মাটিতে প্রায় সব ম্যাচেই স্পিনারদের আধিপত্য শতকরা ৮০ ভাগ। বিদেশে সফর মানেই পেসাররা ‘শিক্ষা সফরে’ যাচ্ছেন, ভালো কিছু করার প্রশ্নই আসত না।
তবে আশায় বুক বেঁধেছিলাম। হিথ স্ট্রিকের মতো একজন ঝলক দেখিয়েছিলেন, মাশরাফি অ্যান্ড কোংয়ের মাঝে অঙ্কুরোদগম করেছিল ‘পেসাররাও ম্যাচ জেতাতে পারেন।’ অ্যাডিলেড ওভালে ২০১৫ সালে যেমন বিশ্বকাপ থেকে ইংল্যান্ডকে বাড়ি পাঠিয়েছিলেন রুবেল হোসেন। তবে স্ট্রিক চলে যাওয়ার পর আবারও তলানিতে ঠেকেছিল আত্মবিশ্বাস, নিজেদের হারিয়ে খুঁজছিল বাংলাদেশ।
ওটিস গিবসনের আমলে বাংলাদেশ ক্রিকেট আশ্বাস কিংবা বিশ্বাস খুঁজে পেল। মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে এবাদতের ঐতিহাসিক স্পেলের মাধ্যমে নিজেকে জানান দিয়েছিলেন গিবসন। তিনি বিশ্বাসকে পুনর্প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা তাসকিনের কঠোর পরিশ্রম এবং বল হাতে আধিপত্যের মধ্যে স্পষ্ট। গিবসন যখন দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার কথা শোনান, তখন দলের বিশেষ করে পেস ইউনিটের জন্য অস্বস্তিকর ছিল। বিসিবি তখন নতুন কারও দিকে তাকিয়ে।
এরপর পেস বোলিং কোচ হিসেবে যোগ দিলেন হোয়াইট লাইটিনিং অ্যালান ডোনাল্ড, যিনি শুধু প্রতিপক্ষের জন্য ভয়ানক ছিলেন তা নয়, দলের তারকাদের জন্য ছিলেন অনুপ্রেরণা, আশা এবং কিছু ক্ষুধার্ত বোলারদের মাস্টার হয়ে উঠেছিলেন। তাসকিন আহমেদের নেতৃত্বে এখনকার বাংলাদেশের পেস ইউনিটে শুধু নড়বড়ে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে নয়, বরং বিদেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলের বিপক্ষেও ছিল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, দলকে জিতিয়েছেও। তারা ঘরের মাটিতে এবার প্রতিপক্ষকেও উড়িয়ে দিয়েছে। ইংল্যান্ডকে ধসিয়ে দেওয়ার পর আয়ারল্যান্ডও হাঁটু গেড়েছে বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের সামনে।
আপনি যখন দুর্দান্ত বিশ্বকাপজয়ী স্কোয়াড এবং বিশ্বের সেরা টেস্ট দলের কথা শুনেন, তখন তাদের সবারই বড় নাম আছে বা ছিল- যারা পেস, সুইং এবং বাউন্স দিয়ে ম্যাচের রেজাল্ট বের করতে পারত। তাসকিন, হাসান, মুস্তাফিজ, এবাদত, খালেদ, শরিফুল অ্যান্ড কোংয়ের এমন একটি ইউনিটকে দেখতে প্রায় দুই দশক ধরে অপেক্ষা করছে দেশ।
যদিও কাজ এখনও মাত্র অর্ধেক শেষ। তবে কাজের সূচকটি সঠিক পথে এগোচ্ছে। কিন্তু বিশ্বমানের কিছু পেতে আমাদের অবশ্যই এটিকে ধরে রাখতে হবে। বছরের পর বছর বিসিবির নানা কাণ্ডের দিকে আঙুল তোলা সহজ কিন্তু এর মানে এই নয় যে, ভালো কাজের কৃতিত্ব দেব না। বাংলাদেশ ক্রিকেট দীর্ঘজীবী হোক।
লেখক : অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ক্রিকেট বিশ্লেষক