বিশ্ব নারী দিবসের আয়োজন
আপন তারিক, বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৩ ১৫:৪৭ পিএম
আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৩ ১৫:৫৩ পিএম
ব্যর্থদের গল্প কেউ শুনতে চায় না। জয়ীদের দলেই যত ভিড়! অনেকটা ওপার বাংলার তুমুল জনপ্রিয় শিল্পী নচিকেতার গানটার মতো, ‘জিতে গেলে হিপ হিপ হুররে শুনবে তুমি, হেরে গেলেই শেইম শেইম...!’ ইয়ামিন রূপার জীবনের গল্পটা তেমনই। মনে হতে পারে ইয়ামিন তো ‘ব্যর্থ’দেরই একজন! যে কি না, সাফল্যের আকাশ ছুঁতে পারেননি!
কিন্তু তার জীবনের পুরোটা পথে চোখ রাখলে তেমন ভাবনা মুহূর্তেই উবে যাবে! মনে হবে অর্জনের পাল্লা যা-ই থাকুক না কেন তিনিও সফল একজন। হার না মানা এক নারী।
রূপা নারী ক্রিকেটার। অবশ্য তারকা দ্যুতি নেই বলে ক্রীড়াঙ্গনেরই অনেকের কাছে নামটা অচেনা মনে হতেই পারে! তবে ঘরোয়া ক্রিকেটের খুটিনাটি যাদের জানা আছে তারা নিশ্চিত করেই নামটার সঙ্গে পরিচিত। ধানমন্ডির আবাহনী মাঠে যাদের যাতায়াত তারা রূপাকে না চিনে পারেনই না!
রূপা ক্রিকেট কোচও। বয়স ৩২, তার অনেক সতীর্থই এখন ব্যস্ত জাতীয় দলে। তিনি জাতীয় দলে না ঢুকতে পারলেও স্বপ্নটাকে বরং আরও বড় করেছেন। গত দশ বছর ধরে কোচিং চালিয়ে যাচ্ছেন আবাহনী মাঠে। তৈরি করছেন আগামীর ক্রিকেটার। সঙ্গে ওই যে হার না মানা ইস্পাত কঠিন প্রত্যয়, সেটাও ধরে রেখে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের স্বপ্নটাও বাঁচিয়ে রেখে লড়ে যাচ্ছেন ব্যাটে-বলে।
অথচ এটুকু পথ আসতে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। ‘তুমি নারী তুমি কি এটা পারবে, তোমার খেলার দরকার নেই। বিয়ে করে সংসার করো’-চারপাশ থেকে ধেয়ে আসা এমন কথার তোপের মুখে পথচলাটা শুরু হয়েছিল রূপার। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস সামনে রেখে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে তিনি বলছিলেন, ‘যখন স্কুলে পড়ি তখন চাচাত বোনের মাধ্যমে প্রথমে আবাহনীতে ভর্তি হই। সালটা ২০০৫। আমি তখন পুরান ঢাকার বংশালে একটা স্কুলে পড়ি, আমার বাসাও সেখানে। আমি যখন আলতাফ স্যারের ওখানে ভর্তি হই তখন প্রথম প্রথম বোরকা পরে যেতাম। ছোটবেলা থেকে আমার খুব ইচ্ছে ছিল-আমি খেলোয়াড় হব। ফুটবল, ব্যাডমিন্টন প্রায় সব খেলা খেলেছি, ঝোঁকটা বেশি ছিল ক্রিকেটে। আমার সামর্থ্য ছিল না। কখন বাসে গিয়েছি, ঝুলেঝুলে যেতাম-খুব কষ্ট হতো, কখনও হেঁটেও গিয়েছি।’
সেই সময়টাতে পুরান ঢাকা থেকে একটা মেয়ের এভাবে উঠে আসাটা সহজ ছিল না। তখনকার বাস্তবতায় একজন মেয়ে ক্রিকেটার হতে চায় এই ভাবনার সঙ্গে পরিবার ও চারপাশের অনেকে গলা মেলাননি। তাই তো বোরকা পরে নিজেকে লুকিয়ে মাঠে আসতেন রূপা, ‘সেই সময়টা আমার জন্য খুব কষ্টের ছিল। কষ্ট করে যাতায়াত করতাম। রাস্তায় অনেক ছেলে বাজে কথা বলত। মুরব্বিরা টিটকারি করতেন।’
পরিবারের মানুষ বিশেষ করে বাবার সমর্থনটা অবশ্য পেয়েছেন। তারপরও প্রতিবেশীদের আচরণে বিপাকে পড়তেন রূপার বাবা-মা, ‘আমি ক্রিকেট খেলি এই ব্যাপারটায় পরিবার খুব লজ্জাবোধ করত। তাদের অনেকে এসে বলত, ‘তোমার মেয়ে খেলে কেন?’ ‘ও যেটা করছে সেটা তো ঠিক না।’ তখন আমার বাবা আমাকে অনেক সাপোর্ট করত। মা কখনই সাপোর্ট করেননি, বলতেন ‘খেলার দরকার নাই।’ তাদের মানানো খুব কঠিন ছিল। মাঠে যেতে দিতে চাইত না। ড্রেস পরে যাব, মানুষ দেখবে কথা বলবে! পরে বোরকা পরে যেতাম।’
এমন সংগ্রাম শেষে অবশ্য জাতীয় দলের দরজা খোলেনি রূপার। ঢাকার ঘরোয়া ক্রিকেটে খেললেও লাল-সবুজ জার্সিতে দেখা যায়নি তাকে। দুঃখ নিয়ে ইয়ামিন রূপা বলছিলেন, ‘জাতীয় দলে খেলার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। আমি শুরুর দিকে অলরাউন্ডার ছিলাম। আমি অনেকবার ক্যাম্প করেছি। ২০১৪ সালে মেয়েরা যখন বিশ্বকাপে যাবে তখন ২৪ বা ২৫ জনের মধ্যে ছিলাম। দুর্ভাগ্য ইনজুরিতে পড়লাম তখন।’
এভাবে বারবারই ভাগ্য বঞ্চিত করেছে তাকে। অথচ তার সতীর্থ-বন্ধুরা এখনও দাপটে জাতীয় দলে খেলে যাচ্ছেন, ‘আমার সঙ্গে শুরুর দিকে যারা খেলেছিল তাদের প্রায় সবাই জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন। সালমা আপা, পান্না আপা ছিল। এখনের মধ্যে জাহানারা, তাহিমা, সোহেলি ও লতা মণ্ডল, আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল। মন ভেঙে গেলে অনেক কিছু চাইলেও আর করা হয়ে ওঠে না। যখন আমার জাতীয় দলে খেলার সময় তখন আমি ইনজুরি হয়ে পড়েছি।’
তবে হাল ছাড়েননি রূপা। লড়ে যাচ্ছেন এখনও। এখন ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলার পাশাপাশি নিজেকে কোচ হিসেবেও ব্যস্ত রাখছেন, ‘আমি আবাহনী মাঠে একটা একাডেমি চালাই। বাচ্চাদের ৭ থেকে ১৪ বছরের অনুশীলন করাচ্ছি। দশ বছর ধরে কোচিং করাচ্ছি আবার ক্রিকেটও খেলছি। লিগে গত বছর আমি শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রে খেলেছি।’
ক্যারিয়ারের যুগ পেরিয়ে গেলেও লড়াই থামেনি। সংসারেও যে কিছু দেবেন সেই সুযোগও হচ্ছে না। রূপা আক্ষেপ নিয়ে বলছিলেন, ‘যা পাচ্ছি সেটা দিয়ে সংসারে তেমন কিছু দিতে পারছি না। তবে নিজের খরচ নিজেই চালাচ্ছি ছোটবেলা থেকে। পড়াশোনার খরচ চালিয়ে খেলে যাচ্ছি তখন থেকেই। সংগ্রামের মধ্যেই আছি।’
অবশ্য পুরুষদের তুলনায় এই সমাজে নারীদের লড়াইয়ের পথটা আরও বেশি কঠিন। খেলার মাঠে তো সেটা চোখে পড়েই। যেখানে সাম্যতা নেই। নারীরা অনেক জায়গাতেই প্রাপ্য বঞ্চিত। একটা সমাজ আর দেশের জন্য সাম্যতাটা জরুরি বলেই মনে করেন রূপা, ‘দেখুন, নারী-পুরুষ ভেদাভেদ থাকা উচিত না। বিশেষ করে খেলায়। ছেলে-মেয়ে আমরা সবাই একইভাবে লড়ছি। তাহলে ছেলেরা কেন এত প্রাধান্য পাচ্ছে? এখন যারা জাতীয় দলে খেলছে তাদের ম্যাচ ফি কি ছেলেদের মতো দেয়? বেতনটা কি ঠিকঠাকমতো দেয়? আরও বেশি তো পাওয়া উচিত। মেয়েদের কিন্তু আলাদা একটা মাঠ নেই। প্রিমিয়ার লিগ হয় আমাদের, সেটা শুরু হয় মে মাসে। যখন বৃষ্টির সময় এখানে। পথে পথে বাধার প্রাচীর! কিন্তু ওদের তুলনায় কি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের পারফরম্যান্স খারাপ?’
সন্দেহ নেই কঠিন প্রশ্ন। কারণ নারী ক্রিকেটে গত কয়েক বছর ধরেই সাফল্য আসছে। তার বিনিময়ে তারা কতটা পাচ্ছেন সেই প্রশ্নটা রূপার একার নয়। তারপরও নারীরা থামেন না। রূপাও তার স্বপ্নটা হারিয়ে যেতে দেননি। কোথায় এত আত্মবিশ্বাস পান তিনি? রূপা হাসিমুখে বলছিলেন, ‘প্রথমে দরকার পরিবারের সাপোর্ট। একজন নারী যদি তার পরিবারের সমর্থন পায় তবে সে অনেক দূর যাবেই। তুমি নারী তুমি কি এটা পারবে, তোমার খেলার দরকার নেই। এটা বলা উচিত না। পাশে থাকলে মেয়েরা সাহস পাবে। হারিয়ে যাবে না।’
বাবা-মা আর দুই ভাই-এই রূপার পরিবার। সঙ্গে আবাহনী ক্লাবের খুদে ক্রিকেটাররাও তার পরিবারেরই অংশ। তারাই তো স্বপ্নটা প্রতিদিন একটু একটু করে সতেজ রাখছেন। রূপাও সব ভুলে শুধু ক্রিকেটেই মন সঁপেছেন, ‘এখনও স্বপ্ন দেখি ক্রিকেটের সঙ্গেই থাকব। কোচ হতে চাই হয়তো ফিটনেস ট্রেনার হতে চাই। যেভাবেই হোক ক্রিকেটেই থাকতে চাই।’
এভাবেই সব প্রতিবন্ধকতাকে হারিয়ে তিনি বাঁচিয়ে রাখেন তার স্বপ্ন! হার না মানা ইয়ামিন রূপা সত্যিকার অর্থেই নটআউট !